তিন বছর আগের মতো কাউফলের গাছগুলোতে ফুল ধরেছে, বউনাগাছের শরীর ফুলে ভরে গেছে। কালো কালো মসৃণ মুত্রার মাথায় অসংখ্য সাদা ফুলের সুগন্ধে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। যেখানেই চোখ ফেরানো যাক-ধানের খেতে, শাপলাবনে, বেতঝোপে কি খাল-বিল-নদীতেসব দিকেই জল বাংলার এই অপরূপ বসুন্ধরা আগের মতোই রমণীয়। র্যাডক্লিফ রোয়েদাদের ছুরি ভারতবর্ষকে দু’খানা করে কেটে ফেলার পরও রাজদিয়ার কিন্তু তেমন কোনও পরিবর্তন নেই। তার আহ্নিক গতি, বার্ষিক গতি প্রায় একই নিয়মে চলেছে।
তবে দূর-দূরান্ত থেকে খবর আসছিল, পাকিস্তান হবার পরই এদেশে ভাঙন শুরু হয়ে গেছে। সাতপুরুষের ঘর-ভদ্রাসন ছেড়ে দলে দলে মানুষ আসাম আর আগরতলায় চলে যাচ্ছে। বেশির ভাগ যাচ্ছে কলকাতার দিকে। নোয়াখালি বরিশাল ফরিদপুর কুমিল্লা, এমনকি ঢাকা জেলার নানা গ্রাম গঞ্জ থেকেও ওই একই খবর আসছিল।
মোতাহার হোসেন সাহেব মাঝে মাঝে আসেন। বিষণ্ণ সুরে বলেন, খবর পাচ্ছেন হেমনাথ দাদা?
আস্তে আস্তে মাথা নাড়েন হেমনাথ। ঝাঁপসা গলায় বলেন, পাচ্ছি।
আপনি তো বলেছিলেন, পাকিস্তান হয়ে গেলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু এ কী হচ্ছে?
হেমনাথ উত্তর দেন না, বিমর্ষ মুখে চুপচাপ বসে থাকেন।
উত্তেজিতভাবে এবার মোতাহার সাহেব বলতে থাকেন, সমাধানই যদি হয়ে যাবে, হাজার হাজার মানুষ ইস্ট পাকিস্তান ছেড়ে চলে যাচ্ছে কেন?
এবারও হেমনাথ নীরব।
.
এর ভেতর একটা ব্যাপার ঘটে গেল।
একদিন দুপুরবেলা বিনুরা সবে খেয়ে উঠেছে, বাগানের দিক থেকে খুব চেনা একটা গলা ভেসে এল বড়কত্তা, বড়কত্তা–
হেমনাথ চেঁচিয়ে বললেন, কে রে?
আমি যুগইলা–বলতে বলতে সত্যিসত্যিই যুগল সামনে এসে দাঁড়াল।
যুগলের গলা পেয়ে স্নেহলতা আর শিবানীও বেরিয়ে এসেছিলেন।
দশ বছর আগে নতুন বৌকে নিয়ে সেই যে ভাটির দেশে দ্বিরাগমনে গিয়েছিল যুগল, তারপর এই প্রথম তাকে দেখা গেল।
প্রায় তেমনই আছে যুগল, তেমনি হিলহিলে বেতের মতো পাতলা চেহারা, তেমনি খাড়া খাড়া চুল। তবে এই মুহূর্তে তাকে অত্যন্ত উদভ্রান্ত আর অস্থির দেখাচ্ছে। রীতিমতো আতঙ্কগ্রস্ত সে।
এতকাল পর যুগলকে দেখে সবাই ভারি খুশি। স্নেহলতা শিবানী তো চেঁচামেচিই জুড়ে দিলেন, বোস যুগল, বোস–
যুগল বসল না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কথা বলতে লাগল, অহন বসুম না ঠাউরমা। আপনেগো লগে দেখা কইরাই যামু গা।
যাবি যাবি। কতকাল তোকে দেখি না। সেই যে শ্বশুরবাড়ি চলে গেলি, ভুলেও আর এদিক মাড়াস না। শ্বশুর-শাশুড়ি পেয়ে আমাদের একেবারে ভুলেই গেছিস। সে যাক গে, এখন এলি কোত্থেকে?
ভাটির দ্যাশ থিকা।
শ্বশুরবাড়ি থেকে?
হ।
ছেলেপুলে হয়েছে?
হ।
ক’টা?
দুই পোলা।
একা একা এলি যে, বউ ছেলেদের সঙ্গে আনলি না কেন?
একটু চুপ করে থেকে আবছা গলায় যুগল বলল, অরা আসছে—
স্নেহলতা শিবানী হেমনাথ, তিনজনেই একসঙ্গে বলে উঠলেন, কোথায় রে, কোথায়?
ইস্টিমারঘাটায়—
স্টিমারঘাটে বসিয়ে এসেছিস যে, তোরা আস্পর্ধা তো কম নয়! ঘরের বৌকে রাজদিয়া পর্যন্ত এনে বাড়িতে তুললি না!
মুখখানা কাঁচুমাচু করে যুগল বলতে লাগল, গুসা কইরেন না। তাগো আননের সোময় আছিল না, আনলেই দেরি হইয়া যাইত। আইজের ইস্টিমার ধরতে পারতাম না। দ্যাশ ছাইড়া জম্মের মতো যাওনের আগে আপনেগো লগে দেখা কইরা গ্যালাম।
হেমনাথ উৎকণ্ঠিত হলেন, কোথায় চলছিস দেশ ছেড়ে?
কইলকাতা।
কলকাতায় কেন?
ভাটির দ্যাশে আর থাকন গেল না বড়কত্তা। আগুন দিয়া গেরামকে গেরাম পোড়াইয়া দিছে, চৌখের সুমুখ থিকা ফসল কাইটা লইয়া যায়। অ্যাত অত্যাচার সইয়া থাকন যায় না। হেইর লেইগা যাইতে আছি গো।
একটু চুপ। পলকে সমস্ত আবহাওয়াটা বদলে গেল। চারদিক থেকে বিচিত্র এক বিষণ্ণতা সবাইকে ঘিরে ধরতে লাগল।
একসময় হেমনাথ বলে উঠলেন, কলকাতায় কোনও দিন যাস নি। অচেনা জায়গায় গিয়ে কী করবি, কোথায় থাকবি, কী খাবি–তার কি কিছু ঠিক আছে! বরং এক কাজ কর, বৌ ছেলেদের নিয়ে এখানেই চলে আয়। রাজদিয়াতে কোনও গোলমাল নেই।
খানিক ভেবে যুগল বলল, না বড়কত্তা, কইলকাতাতেই যামু। রাইজদাতে গন্ডগোল নাই বুঝলাম, কিন্তুক হইতে কতক্ষণ? কতখানে যে খুন জখম আরম্ভ হইয়া গ্যাছে! হেয়া ছাড়া
কী?
আমার হউর (শ্বশুর), তিন খুড়া হউর, দুই পিসাত ভায়রা আর তাগো গুষ্টি আমার লগে যাইতে আছে। তাগো ফেলাইয়া আমি ক্যামনে আসি? এত মাইনষের জাগা দ্যাওন তো সোজা না বড়কত্তা–
মনে মনে হেমনাথ ভেবে দেখলেন, কথাটা ঠিকই বলেছে যুগল। শ্বশুরবাড়ির আত্মীয় স্বজনদের ফেলে একা একা সে এখানে আসতে পারে না। আবার সবাই এলে এতগুলো মানুষকে আশ্রয় দেওয়া তাঁর পক্ষে অসম্ভব।
হেমনাথ এবার অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলেন, ভাটির দেশ থেকে কি অনেক লোক চলে যাচ্ছে?
মেলা বড়কত্তা, মেলা। যা দশ বিশ ঘর আছে, হেরাও থাকব না। দুই চাইর দিনের ভিতরে সাফ হইয়া যাইব। একটু থেমে যুগল আবার বলল, যদিন পারেন আপনেরাও যাইয়েন গা।
হেমনাথ উত্তর দিলেন না।
যুগল এবার বলল, আর খাড়ইতে পারুম না। ইস্টিমার ছাড়নের সোময় হইয়া আইল। যাই গা ঠাউরমা, যাই বড়কত্তা, চলোম ছুটোবাবু- হেমনাথ শিবানী আর স্নেহলতাকে প্রণাম করে একটু পর চলে গেল যুগল।
