তবে?
হিন্দুগো কথা কই।
আমি বুঝি হিন্দু না?
রজবালি বলল, আপনের লগে কার তুলুনা! আপনে হিন্দুও না, মুসলমানও না। আপনে হগলের হ্যামকা–তার কণ্ঠস্বর আবেগে কাঁপতে লাগল।
আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর হেমনাথ বললেন, এখন যাই রে রজবালি।
অহনই যাইবেন?
সুর্য উঠে গিয়েছিল। সকালের নরম সোনালি রোদ নদীর ঢেউয়ে টলমল করছে। ঝাঁকে ঝাঁকে শঙ্খচিল উড়ছিল। মাসটা যদিও শ্রাবণ, আজকের আকাশ আশ্চর্য উজ্জ্বল, পালিশ-করা নীল আয়নার মতো তার গা থেকে দীপ্তি বেরুচ্ছে। আর আছে ভারহীন ভবঘুরে মেঘ। উলটোপালটা পুবের বাতাস তাদের তাড়িয়ে তাড়িয়ে একবার এদিকে, আবার ওদিকে নিয়ে যাচ্ছে।
হেমনাথ বললেন, সেই কখন বেরিয়েছি! কত বেলা হয়ে গেল।
রজবালি বলল, অ্যামন দিনে হুদা মুখে যাইতে পারবেন না। আইজ ইট্টু মেঠাই মুখে দিতে হইব।
এখন মিষ্টিটিষ্টি খেতে পারব না বাপু।
তয় বাইন্দা দেই, বাড়ি নিয়া যাইবেন।
হেমনাথ হাসতে হাসতে বললেন, ছাড়বি না যখন, তখন দে। বাড়িই নিয়ে যাই।
দেখা গেল, হেমনাথদের শুধু নয়, যারাই লিগ অফিসের কাছে আসছে মিষ্টিমুখ না করে কেউ ছাড়া পাচ্ছে না।
রজবালি নিজের হাতে মিষ্টির একটা হাঁড়ি এনে হেমনাথকে দিল। তারপর বলল, বিকালবেলা কোটের (কোর্টের) মাঠে আইসেন।
রাজদিয়ায় ফৌজদারি আর দেওয়ানি আদালত দুটো পাশাপাশি। তার সামনে মস্ত মাঠ। হেমনাথ শুধোলেন, সেখানে কী?
মিটিন হইব। ঢাকার থিকা বড় ন্যাতারা আইসা বতিতা করব। আইসেন কিলাম।
আসব।
বাড়ি আসতেই স্নেহলতা জানালেন, মীরপাড়া-মৃধাপাড়া সর্দারপাড়া, রাজদিয়ায় যত মুসলমান বাড়ি আছে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে সব জায়গা থেকে মিষ্টি পাঠিয়েছে।
.
বিকেলবেলা আদালত পাড়ার মাঠে এসে দেখা গেল, লোকে লোকারণ্য। রাজদিয়ারই শুধু না, চারদিকের গ্রামগঞ্জ থেকে মানুষ ভেঙে পড়েছে।
রজবালি কোথায় ছিল, ছুটে এল। যেখানে শহরের গণ্যমান্য শ্রদ্ধেয় মানুষরা বসে আছেন, তাঁদের পাশে দুটো চেয়ারে হেমনাথ আর বিনুকে নিয়ে বসাল।
ঢাকা থেকে নেতারা এসেছিলেন। তারা পাকিস্তান দিবসের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করলেন। তারপর স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যাক্তিদের কিছু বলতে অনুরোধ করা হল।
যদিও মুসলিম লিগ এই সভা আয়োজন করেছে, তবু হঠাৎ রজবালি শিকদার বক্তা হিসেবে। হেমনাথের নাম প্রস্তাব করে বসল। অগত্যা হেমনাথকে পাকিস্তান সম্বন্ধে দু’চার কথা বলতে হল।
সভা শেষ হতে সন্ধে হয় গেল। তারপর শুরু হল আতসবাজির খেলা। কতরকম যে বাজি আনা হয়েছে হিসেব নেই। কোনওটা আকাশে গিয়ে আলোর ময়ূর হয়ে যাচ্ছে, কোনওটা চিল, কোনওটা বাঘ, কোনওটা আবার সিংহ। একেকটা হাউই উড়ে গিয়ে আগুনের ফুলকি দিয়ে লিখে দিচ্ছে পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ কিংবা কায়েদে আজম, জিন্দাবাদ। তলায় হাজার কন্ঠে উল্লসিত জয়ধ্বনি উঠছে?
পাকিস্তান—
জিন্দাবাদ।
কায়েদে আজম—
জিন্দাবাদ।
বাজি পোড়ানো দেখে হেমনাথরা যখন বাড়ি ফিরলেন, মাঝ রাত পার হয়ে গেছে।
.
২.৫৪
সাতচল্লিশে দেশভাগ হল। তারপর দেখতে দেখতে আরও তিনটে বছর কেটে গেল।
এর মধ্যে বি. এ পাস করেছে বিনু। ঝিনুক ম্যাট্রিক পাস করে রাজদিয়া কলেজে ভর্তি হয়ে গেছে।
ওদিকে যুদ্ধের সময় ঝোঁকের বশে যে অবনীমোহন কন্ট্রাক্টরি নিয়ে আসাম চলে গিয়েছিলেন, সেখানেও বেশিদিন থাকেন নি। যুদ্ধ থামবার সঙ্গে সঙ্গে তার শখ মিটে গিয়েছিল। আসলে যুদ্ধ শেষ। ঠিকাদারিরও প্রয়োজন মিটে গেছে। কন্ট্রাক্টরি ছেড়েছুঁড়ে অবনীমোহন কলকাতায় চলে গিয়েছিলেন, সেখানে ব্যবসা শুরু করেছেন।
কলকাতায় গিয়েই বিনুকে পাঠিয়ে দেবার জন্য হেমনাথকে চিঠি দিয়েছিলেন অবনীমোহন। বিনু যায় নি। তারপর ছেচল্লিশের দাঙ্গার সময় কিংবা দেশভাগের সময়ও যাবার কথা লিখেছিলেন। তখনও বিনু যায় নি। দেশভাগের সময় অবশ্য জমিজমা বিক্রি করে হেমনাথকেও চলে যেতে লিখেছিলেন অবনীমোহন। সুধা সুনীতি কলকাতাতেই আছে। তারাও ওই একই কথা লিখত। এখনও নিয়মিত লিখে যাচ্ছে।
পাকিস্তান দিবসকে ঘিরে রাজদিয়ায় যে উদ্দীপনা দেখা দিয়েছিল, ভাটার টানের মতো ধীরে ধীরে তা স্তিমিত হয়ে গেছে। এখানকার জীবন আবার পুরনো ঢিমে তালে বাজতে শুরু করেছে।
তিন বছর আগের মতোই চৈত্র বৈশাখের রোদে মাটি ফেটে চৌচির হয়েছে, দিগন্তে আগুনের হলকা নেচে নেচে গেছে। গ্রীষ্মের পর শ্যামল বেশে এসেছে বর্ষা। মাঠ ভাসিয়ে, ধানখেত পাটখেত ডুবিয়ে চারদিক একাকার করে দিয়েছে। তারপর আকাশে মাটিতে পরিচিত ছবি এঁকে একে একে দেখা দিয়েছে শরৎ-হেমন্ত-শীত-বসন্ত। রাজদিয়ার মানুষ তিন বছর আগের মতো পাট বুনেছে, ধান কেটেছে, খেতে নিড়ান দিয়েছে, নৌকো বেয়েছে। মটর কলাইর খেতে ছেই’ সেদ্ধ করে খেয়েছে,গলুয়ায় (মেলায়) গিয়ে বউর জন্য আলতা কিনেছে, ফুলেল তেল কিনেছে। মাঠ পাড়ি দিয়ে গেছে সুজনগঞ্জের হাটে, কিংবা ম্যালেরিয়ায় ভুগে ভুগে অস্থির হয়ে উঠেছে। তিন বছর আগের মতোই তারা ভাসান গান গেয়েছে, সারি জারি আর রয়ানিতে চারদিক মুখর করে তুলেছে।
তিন বছর আগের মতোই ভেসালের বাঁশে শঙ্খচিল বসেছে। ধানখেতের আলে আলে জলসেঁচি শাকের অরণ্য উদ্দাম হয়ে উঠেছে। বিলগুলো পানকলস আর জলসিঙাড়ায় ছেয়ে গেছে। পৌষ মাঘ মাসে শীতের দেশ থেকে এসেছে যাযাবর পাখিরা, গরম পড়তে না পড়তেই তারা ফিরে গেছে। কাঁচের মতো স্বচ্ছ জলের তলায় টাটকিনি আর ভাগনা, গজার আর বজুরা, কাঁচকি আর বাজালি মাছেরা ডিম পেড়ে রুপোলি ফসলে জল-বাংলাকে পরিপূর্ণ করে তুলেছে।
