পুকুর তোলপাড় করে মাছেরা লাফালাফি করছিল। যুগল বলল, শুনতে আছেন ছুটোবাবু?
বিনু যুগলের কাছে আরেকটু ঘন হয়ে এল। ক্ষীণ সুরে বলল, কিসের আওয়াজ?
বিনুর স্বরটা খেয়াল করে নি, যুগলের ধ্যান-জ্ঞান তখন পুকুরের দিকে। লোভী, ফিসফিস গলায় যে বলল, মাছ ছুটোবাবু, মাছ। মনে লয়, সাই (প্রকান্ড) বোয়াল কি কাতল (কাতলা)। দুইটাই রাইক্ষইসা মাছ। ইট্র খাড়ন। অহনই শালারা বরি গিলা ফেলাইব।
চারদিক নিঝুম, জনহীন। অবশ্য ঝোঁপঝাড়ে আর নিবিড় বনানীর ফাঁকে ঝিঁঝিদের জলসা বসেছে। একটানা ঝিল্লিস্বর শুনতে শুনতে দু’জনে পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে রইল।
যুগল আবার কী বলতে যাচ্ছিল, সেই সময় দেখা গেল দূরের ধানখেত চিরে আলোর ক’টি বিন্দু দুলতে দুলতে এগিয়ে আসছে।
বিনু জিজ্ঞেস করল, ওগুলো কিসের আলো যুগল?
যুগল একদৃষ্টে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, নাও মনে লয় (হয়)।
যুগলের অনুমানই ঠিক। আরেকটু কাছাকাছি আসতে টের পাওয়া গেল, নৌকোই। বৈঠা টানার ছপছপ আওয়াজ আসতে লাগল।
হঠাৎ দুটো হাত চোঙার মতো মুখের কাছে ধরে যুগল চেঁচিয়ে উঠল, কুন গেরামের নাও? স্বরটা শরতের বাতাসে দোল খেতে খেতে দিগন্তে মিলিয়ে গেল।
একটু পর দূর থেকে সাড়া এল, কেতুগুঞ্জের নাও—
নাও যায় কই?
হ্যামকত্তার বাড়ি।
যুগল ব্যস্ত হয়ে উঠল। বিনুকে বলল, বড়কত্তা ফিরা আইল বুঝিন।
বিনু বুঝতে পেরেছিল। তবু বলল, দাদু?
হ।
দেখতে দেখতে ছইওলা বড় একখানা নৌকো ঘাটে এসে লগি পুঁতল। ছইয়ের তলায় দুটো হেরিকেন জ্বলছিল। আলো নিয়ে প্রথমে দু’জন মাঝি নামল। তাদের পিছু পিছু হেমনাথ, হেমনাথের পেছনে আলো হাতে আরও দু’টো মাঝি। হেরিকেন ছাড়াও হাতে কলাপাতা দিয়ে মুখ-বাঁধা বড় বড় গোটা তিনেক হাঁড়ি আর প্রকাণ্ড এক রুই মাছ ঝুলছে।
ঘাট থেকে ওপরে উঠতেই সামনের মাঝি দুটোকে চিনতে পারল বিনু। ও বেলা এরাই এসে হেমনাথকে কেতুগঞ্জে নিয়ে গিয়েছিল। পেছনের দু’জন অবশ্য অচেনা। খুব সাধারণ মাঝি বা চাষী শ্রেণীর লোক বলে তাদের মনে হল না। দু’জনেই প্রৌঢ়, মুসলমান। পরনে পাজামা আর ফুল শার্ট। মচমচ আওয়াজে টের পাওয়া যাচ্ছে তাদের পায়ে কাঁচা চামড়ার নাগরা। হেরিকেনের আলোয় তাদের সোনার বোম আর আংটি ঝিলিক দিয়ে যাচ্ছে, মাথায় সাদা টুপি, গালে চাপদাড়ি। দূর থেকেও আতরের ভুরভুর উগ্র গন্ধ ভেসে আসছে। গ্রাম্য হলেও দুজনের চেহারায় বেশ সম্ভ্রান্ত ছাপ আছে।
কাছাকাছি আসার আগেই যুগল ফিসফিসিয়ে বলল, আমি যাই। বড়কারা আইছে। ঠাউরমারে খবরটা দেই গিয়া— বলে আর দাঁড়াল না, ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে চলে গেল।
একটু পর হেমনাথরা কাছে এসে পড়লেন। বিনুকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি অবাক। থমকে দাঁড়িয়ে বলেন, এ কি দাদাভাই, এই রাত্রিবেলা একা একা তুমি পুকুরপাড়ে এসেছ?
বিনু বলল, একা আসি নি, যুগল আমাকে নিয়ে এসেছে।
হেমনাথ রেগে গেলেন, কোথায় সেই হারামজাদা? তোমাকে একলা ফেলে গেল কোন চুলোয়?
তুমি এসেছ। দিদাকে সেই খবরটা দেবার জন্যে এই মাত্তর বাড়ি গেল।
হেমনাথ আবার কী বলতে যাচ্ছিলেন, পেছন থেকে সেই বয়স্ক মুসলমান দু’জন সামনে এগিয়ে এল। একজন শুধলো, এ ক্যাঠা ঠাউরভাই (ঠাকুর ভাই অর্থাৎ দাদা)?
হেমনাথ বললেন, নাতি। ওরাই আজ সকালে কলকাতা থেকে এসেছে।
প্রায় ছুটেই বিনুর সামনে চলে এল প্রৌঢ়টি বাজপাখির মতো ছোঁ মেরে নিমেষে তাকে বুকের ভেতর তুলে নিল। বাড়ি পর্যন্ত তার বুকের ভেতর বন্দি হয়েই আসতে হল বিনুকে।
বিনু অবশ্য উসখুস করেছে, হাত ছাড়িয়ে নামবার চেষ্টা করেছে। প্রৌঢ় ছাড়ে নি, ঠোঁট টিপে টিপে দুষ্টুমির হাসি হাসছে আর বলছে, ছাড়ুম না, কিছুতেই ছাড়ুম না। বক্ষের পিঞ্জরে ধইরা রাখুম।
১.০৬ বাড়ির ভেতরে এসে
বাড়ির ভেতরে এসে দেখা গেল, সাড়া পড়ে গেছে। একেবারে প্রথম যে ঘরখানা সেটা দক্ষিণ দুয়ারী, সেখানে ঢালা ফরাস পাতা। চারখানা হেরিকেন চারদিকে বসানো। ঘরখানা আলোয় ভরে গেছে। একধারে সারি সারি ফরসি সাজানো, জল বদলে এখন তামাক সাজছে যুগল। তার সামনে নারকেল ছোবড়া, তামাকের ডিবে, দেশলাই, কুপি–নানাবিধ সরঞ্জাম।
হেমনাথ সঙ্গীদের নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। মাঝি দু’জন মুখ-বাঁধা হাঁড়িগুলো আর মাছটা নামিয়ে তলায় যুগলের কাছে ঘন হয়ে বসল। প্রৌঢ় দু’জন বসল ফরাসের ওপর। বিনু এখনও ছাড়া পায় নি, সেই প্রৌঢ়টির কোলের ভেতর বসে থাকতে হয়েছে তাকে।
হেমনাথ বসলেন না। বললেন, তোরা তামাক টামাক খা মজিদ, আমি জামাইদের খবর দিই।
বিনু দেখতে পেল, যে প্রৌঢ়টি তাকে কোলে নিয়ে বসে আছে সে-ই উত্তর দিল, ঠিক আছে ঠাউরভাই।
এই তা হলে মজিদ মিঞা। কেতুগঞ্জে এঁর বাড়িতেই দাদু ও বেলা গিয়েছিলেন।
হেমনাথ আর কিছু বললেন না, ভেতর-বাড়ির দিকে চলে গেলেন।
খানিক পর অবনীমোহন সুরমা সুধা সুনীতি–সবাইকে নিয়ে ফিরে এলেন হেমনাথ। স্নেহলতা আর শিবানী আসেন নি, রান্নাঘরে নানা কাজে তারা ব্যস্ত।
সবার সঙ্গে আগন্তুকদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হল। মজিদ মিঞা ছাড়া আরেকজন যে প্রৌঢ় এসেছে তার নাম হাসেম আলি-মজিদ মিঞার বোনাই সে।
অবনীমোহনদের দেখে কী করবে যেন ভেবে পেল না মজিদ মিঞা। মুঠোয় বুঝি আকাশের চাঁদই পেয়ে গেছে। অবনীমোহনের একখানা হাত ধরে উচ্ছ্বসিত স্বরে সে বলতে লাগল, আপনেরা আইছেন, আমাগো কি যে সৈভাগ্যি!
