এই অজানা ভুবনে, অচেনা মানুষের ভিড়ে প্রায় গোটা একটা দিন কেটে গেল, দুই ভাইবোনের লড়াই এখনও জমে নি। নতুন পরিবেশটা একটু সইয়ে নেবার শুধু অপেক্ষা।
সুধার চোখমুখ লাল হয়ে উঠেছিল। নেহাত হিরণ রয়েছে, নইলে এতক্ষণে তার নখে বিনুর গালের ছাল উড়ে যেত। সে-ও অবশ্য অক্ষত থাকত না, এক খামচা চুলের স্বত্ব তাকেও ছাড়তে হত।
চকিতে হিরণকে একবার দেখে নিল সুধা। হিরণের শক্তবদ্ধ চাপা ঠোঁটের ফাঁকে যা আবছাভাব ফুটে আছে তার নাম হাসি কিনা, বুঝতে পারা গেল না। দ্রুত চোখ ফিরিয়ে সে চেঁচিয়ে উঠল, দেখছ বাবা, দেখছ–কিরকম অসভ্য হয়ে উঠেছে বিনুটা।
অবনীমোহন হাসতে লাগলেন।
সুধা ঝঙ্কার দিয়ে উঠল, তুমি হাসছ বাবা!
অবনীমোহন বললেন, হাসব না তো কী করব?
সুধা গলার স্বর আরেক পর্দা তুলল, আদর দিয়ে দিয়ে তুমি ওটাকে একটা আস্ত বাঁদর করে তুলছ।
আদর তো আমি তোকেও দিই। বিনু বাঁদর হলে তুই কী?
সুধা চেঁচিয়ে উঠল, বাবা!
ছেলেমেয়েদের পেছনে লাগার স্বভাব অবনীমোহনের। তিনি সমানে হাসতে লাগলেন। হিরণের ঠোঁটদুটো আরও শক্ত হয়ে গেছে, ভেতরে কিছু একটা চলছিল। বুদবুদের মতো ফুটি ফুটি করেও বেরিয়ে আসতে পারছে না।
বিনু আর দাঁড়াল না, পায়ে পায়ে দরজার দিকে এগুতে লাগল। সুধা বলল, ওকে তুমি বারণ কর বাবা, কিছুতেই বাইরে যেতে পারবে না। সুধার যেন জেদই চেপে গেছে। সে-ও যে বিনুর। অভিভাবক, তার ইচ্ছাকে অগ্রাহ্য করে বিনুর কোথাও যাবার সে উপায় নেই, হিরণের সামনে সেটাই প্রমাণ করতে চাইছিল সুধা।
অবনীমোহন হাসি থামিয়ে শান্ত গলায় বোঝাতে লাগলেন, এখানে আমাদের মাঝখানে বেচারি মুখ বুজে বসে ছিল। যাক না যুগলের সঙ্গে
অবনীমোহন শেষ করতে পারলেন না, সুধা হঠাৎ প্রবল বেগে হাত-পা এবং মাথা ঝাঁকাতে শুরু করল। তবে সে আর কিছু বলার আগেই লাফ দিয়ে বিনু বাইরে বেরিয়ে গেল।
বারান্দায় এসে কাউকে দেখতে পাওয়া গেল না। তবে কি যুগল চলে গেছে? আস্তে আস্তে বিনু ডাকল, যুগল–যুগল–
ঘরের ভেতর ঝড়ের আভাস পেয়ে উঠোনে নেমে গিয়েছিল যুগল। অন্ধকার কুঁড়ে সে কাছে এসে দাঁড়াল, এই যে ছুটোবাবু–
ওখানে কী করছিলে?
উত্তর না দিয়ে হি হি করে হাসতে লাগল যুগল। হাসতে হাসতেই বলল, ঘরের ভিতরে যা হইতে আছিল, উইখানে খাড়ইয়া থাকতে সাহস হয় নাই। ছুটোদিদি বুঝিন আপনেরে আসতে দিতে চায় না?
হুঁ, আমাকে ও আটকাবে! বীরের মতো ভঙ্গি করে বিনু বলল, কী জন্যে ডাকছিলে বল–
আসেন আমার লগে (সঙ্গে)।
কোথায়?
গ্যালেই দেখতে পাইবেন।
নিঃশব্দে অন্ধের মতো যুগলকে অনুসরণ করতে লাগল বিনু। উঠোন পেরিয়ে তারা প্রথমে এল রান্নাঘরে। দরজার বাইরে থেকে যুগল ডাকল, ঠাউরমা–
স্নেহলতা সাড়া দিলেন, কে, যুগল?
হ।
কিছু বলবি?
আপনের কাছে হেইদিন যে বড় বরিটা (বড়শি) দিছিলাম, হেইটা দ্যান। পুকৈরে শৌল আর বোয়াল যা ঘাই মারতে আছে–
বরি’ কী, বুঝতে পারল না বিনু।
স্নেহলতা শুধোলেন, আবার বুঝি মাছের পেছন লাগতে যাচ্ছিস?
যুগল ঘাড় চুলকোতে লাগল।
স্নেহলতা আবার জিজ্ঞেস করলেন, পাট তোলা হয়ে গেছে?
হ।
হাতের ভর দিয়ে উঠে পড়লেন স্নেহলতা। তারপর সামনের দেয়ালের উঁচু তাক থেকে প্রকান্ড একটা বড়শি বার করে বললেন, এই নে–
রান্নাঘরের ভেতর থেকে হেরিকেনের আলো বাইরে এসে পড়ছিল। বড়শি দিতে গিয়ে বিনুকে দেখতে পেলেন স্নেহলতা। বললেন, একি, দাদাভাইকেও জুটিয়ে নিয়েছিস দেখছি!
এক ফাঁড়া কাটিয়ে এসেছে, আবার যদি বাধা পড়ে সেই ভয়ে তাড়াতাড়ি বিনু বলে উঠল, বাবাকে বলে এসেছি।
সুরমা ভেতর থেকে বললেন, ওর সঙ্গে ঘুরছ, ঘোরো। অন্ধকারে বেশি হুটোপুটি করো না।
বিনু তক্ষুনি ঘাড় কাত করল, আচ্ছা।
খানিক পর বিনুকে সঙ্গে নিয়ে উঠোন বাগান পেরিয়ে পুকুরের কাছে চলে এল যুগল। অন্ধকারে বিনুর ভয় ভয় করছিল, কিন্তু সে কথা তো আর যুগলকে বলা যায় না।
ঘরে বসে দেখতে পাওয়া যায় নি, পুকুরপাড়ে এসে বিনু দেখতে পেল, শরতের উজ্জ্বল নীলাকাশে সরু একফালি চাঁদ। চঞ্চল ভারহীন মেঘ তার মুখে বার বার পর্দা টেনে পরক্ষণেই নিরুদ্দেশে পাড়ি দিচ্ছে।
চাঁদ আছে ঠিকই, কিন্তু আলো নেই। আলো বলতে দূরের ধানখেতে রাশি রাশি জোনাকি। আলোর ছুঁচের মতো অন্ধকারকে তারা অবিরাম বিধে যাচ্ছে।
সঙ্গে করে একটা লম্বা দড়ি নিয়ে এসেছিল যুগল। অন্ধকারেই দড়ির একটা মাথায় বড়শিটা পরিয়ে একটা জ্যান্ত টাকি মাছ গেঁথে দিয়ে বলল, ছুটোবাবু, আমি উই গাছটায় উইঠা বরি’টা। বাইন্ধা দিমু। তলে একা একা খাড়ইয়া থাকতে ডর লাগব না তো?
শুনেই বুকের ভেতরটা গুরু গুরু করে উঠল। এখানে একলা দাঁড়িয়ে থাকতে হলে নির্ঘাত দম আটকেই সে মরে যাবে। কিন্তু তা বলা গেল না। তার বদলে বীরত্ব ফলাতে হল, একটুও ভয় লাগবে না। বলল বটে, স্বরটা কিন্তু কেমন কাঁপা কাঁপা শোনাল।
পুকুরের গা ঘেঁষেই একটা ঝুপসি আমগাছ। তার গোটা দুই ডাল জলের ওপর ঝুঁকে পড়েছে। চোখের পলকে তর তর করে উঠে গিয়ে টাকি মাছের টোপসুদ্ধ বড়শিটা জলে নামিয়ে দিল যুগল, তারপর দড়ির অন্য প্রান্তটা ডালে বেঁধে দিয়ে তক্ষুনি নেমে এল।
যতক্ষণ যুগল গাছে ছিল, দমবন্ধ করে দাঁড়িয়ে থেকেছে বিনু। যুগল নেমে এলে ধীরে ধীরে বুকের ভেতর থেকে আবদ্ধ বাতাস বার করে দিল সে।
