কায়েদে আজম—
জিন্দাবাদ—
পাকিস্থান—
জিন্দাবাদ–
যেভাবে আর যে মূল্যেই হোক, স্বাধীনতা এসেছে। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা হয়েছে। যুবক-যুবতী, কিশোর-কিশোরীদের কণ্ঠস্বর আর ব্যান্ড পার্টির বাজনা আকাশে বাতাসে বিচিত্র উন্মাদনা ছড়িয়ে দিচ্ছিল। হেমনাথ আর বাড়ি বসে থাকতে পারলেন না। বিনুকে সঙ্গে নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লেন।
মিছিলের পর মিছিল পাশ দিয়ে বেরিয়ে যেতে লাগল। হাঁটতে হাঁটতে এবং শোভাযাত্রা দেখতে দেখতে এক সময় সারি সারি মিষ্টির দোকান, স্টিমারঘাট, বরফ কল পেরিয়ে হেমনাথরা স্কুলবাড়ির কাছে চলে এলেন।
মিষ্টির দোকান, স্টিমারঘাট, বরফ কল কিংবা রাজদিয়ার যত বাড়িঘর– সব কিছুর মাথায় সবুজ পতাকা উড়ছে। স্টিমারঘাটটাকে ফুল-পাতা আর রঙিন কাগজ দিয়ে চমৎকার করে সাজানো হয়েছে। তা ছাড়া, রাস্তায় কুড়ি পঁচিশ হাত দুরে দূরে একটা করে তোরণ চোখে পড়ে। মাঝে মাঝে উঁচু উঁচু মঞ্চ বানিয়ে নহবত বসানো হয়েছে। সেখানে সানাই বাজছে।
আজকের এই দিনটা যে আর সব দিনের চাইতে আলাদা, রাস্তায় পা দিয়েই তা টের পাওয়া যায়। এই রাজদিয়ার ওপর দিয়ে হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ দিন এসেছে, গেছে। কিন্তু এমন দিন আর কখনও আসেনি। উদাসীনভাবে অন্যমনস্কের মতো একে যেন হাত পেতে নেওয়া যায় না, বিপুল সমারোহে একে বরণ করে নিতে হয়।
স্কুলবাড়ির কাছাকাছি আসতেই হঠাৎ কে যেন ডেকে উঠল, হেমদাদা—হেমদাদা–
বিনুরা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। এদিক ওদিক তাকাতেই ডান ধারে তারা মোতাহার হোসেন সাহেবকে দেখতে পেল।
স্কুলবাড়ির ঠিক গায়েই কংগ্রেস অফিস। তার দরজায় মোতাহার সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। চোখাচোখি হতেই হাতছানি দিলেন। মোতাহার সাহেব এবং তার দু’একজন সঙ্গী ছাড়া কংগ্রেস অফিস এখন একেবারে ফাঁকা।
বিনুরা পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল।
মোতাহার সাহেব বললেন, আজ এত সকালে বেরিয়ে পড়েছেন হেমদাদা?
হেমনাথ হাসলেন, ব্যান্ড পার্টির আওয়াজে আর মিছিলের চিৎকারে ঘরে থাকা গেল না যে।
আপনাকে যেন ভারি খুশি দেখাচ্ছে—
উত্তরটা এড়িয়ে গিয়ে হেমনাথ বললেন, রাজদিয়ার সব লোক বেরিয়ে পড়েছে। আমি আর কী করে ঘরে বসে থাকি বল?
অত্যন্ত ক্ষুব্ধ গলায় মোতাহার সাহেব বলতে লাগলেন, এত বড় একটা ট্র্যাজেডি ঘটে গেল, যার পরিণাম কী হবে কেউ বলতে পারে না, আর আপনি মিছিল দেখবার জন্যে, আনন্দ করবার জন্যে বেরিয়ে পড়েছেন। আপনার কাছে এ কিন্তু আশা করিনি হেমদাদা–
একটু চুপ করে থেকে হেমনাথ বললেন, যা হবার তো হয়েই গেছে। তার জন্যে মনে দুঃখ রেখে কী লাভ? হয়তো এতে ভালই হবে। দেশ জুড়ে যে রক্তারক্তি আর হত্যা চলছিল তা চিরদিনের মতো বন্ধ হয়ে যাবে। যা এসেছে তাকে প্রসন্ন মনেই গ্রহণ কর মোতাহার।
মোতাহার সাহেব খুব একটা সান্ত্বনা পেয়েছেন, এমন মনে হল না। ক্ষোভ বিষাদ দুঃখ, সব একাকার হয়ে তার মুখখানাকে মলিন করে রাখল।
বিনু অবাক হয়ে হেমনাথকে দেখছিল। আজই শুধু না, রাজদিয়ায় আসার পর থেকেই দাদুকে দেখছে সে। ভালমন্দ শুভাশুভ, যা-ই সামনে এসে দাঁড়াক তাকে তিনি সানন্দে, পরম উদারতার সঙ্গে বুকে তুলে নিতে পারেন। তার চরিত্রের মূলমন্ত্র এখানেই।
হেমনাথ বললেন, এখন চলি রে মোতাহার—
মোতাহার হোসেন উত্তর দিলেন না।
হেমনাথ আবার বললেন, আমাদের সঙ্গে তুই যাবি?
নীরস সুরে মোতাহার সাহেব জানালেন, যাবেন না।
আবার বড় রাস্তায় এসে পড়ল বিনুরা। পুব দিকে খানিকটা গেলেই সেটেলমেন্ট অফিসের পাশে মুসলিম লিগের অফিস। লিগের অফিসটাকে আজ আর চেনাই যায় না। ফুলে-পাতায়, রঙিন কাগজে আর অসংখ্য সবুজ পতাকায় তার চেহারা বদলে গেছে। কত মানুষ যে সেখানে ভিড় জমিয়েছে, লেখাজোখা নেই। লিগের অফিসটা ঘিরে এই মুহূর্তে বিরাট উৎসব চলছে।
হঠাৎ কংগ্রেস অফিসটার কথা মনে পড়ে গেল বিনুর। একটু আগেই সেখান থেকে তারা এসেছে। মুসলিম লিগের এই উৎসবমুখর জমকালো বাড়িটার তুলনায় সেটার দৃশ্য বড় করুণ এবং নিষ্প্রভ। অথচ কদিন আগেও কংগ্রেস অফিসে ভিড় লেগে থাকত। রাতারাতি সব বদলে গেছে।
লিগ অফিসের কাছে আসতেই রজবালি শিকদার ছুটে এল। তার দেখাদেখি আরও অনেকে। ইদানীং রজবালি এ অঞ্চলে লিগের বড় নেতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসেই রজবালি হেমনাথকে বুকে জড়িয়ে ধরে। সে বলল, আপনে আইছেন হ্যামকত্তা! দেখেও সে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না।
সহজ গলায় হেমনাথ বললেন, হ্যাঁ, এলাম। পাটিশানের পর এ দেশ যদি পাকিস্তান হয়ে থাকে, আমরা তা হলে পাকিস্তানী। এমন দিনে আমরা আসব না?
অভিভূত স্বরে রজবালি শিকদার বলল, নিয্যস নিয্যস—
কে একজন চেঁচিয়ে উঠল, আরে কেউগা আছস, গুলাপ জল লইয়া আয়, হ্যামকত্তারে দে–
একজন ছুটে গিয়ে রুপোর পিচকিরিতে গোলাপ জল এনে বিনুদের মাথায় ছিটিয়ে দিল। শুধু বিনুরাই নয়, হিন্দু-মুসলমান যারাই লিগ অফিসের কাছে আসছে তাদেরই বুকে জড়িয়ে ধরা হচ্ছে, গোলাপ জলে সিক্ত করে দেওয়া হচ্ছে।
লিগ অফিসের একজন বলল, পাকিস্থান হইয়া গ্যাছে। যা চাইছিলাম তা পাইছি। আইজ থিকা আপনাগো লগে আমাগো কাইজা বন্ধ।
হেমনাথ হাসতে হাসতে বললেন, আমার সঙ্গে কিন্তু কখনও কারোর ঝগড়া নেই।
তাড়াতাড়ি জিভ কেটে লোকটা বলল, আপনের কথা কই না হ্যামকত্তা–
