খবর পেয়ে মোতাহার হোসেন ছুটে এলেন। রাস্তা থেকে বাগানে পা দিয়েই চেঁচিয়ে ডাকতে লাগলেন, হেমদাদা—হেমদাদা–
হেমনাথ বাড়িতেই ছিলেন। দেশভাগ নিয়ে বিনুর সঙ্গে আলোচনা করছিলেন। চমকে বাইরের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, কে, মোতাহার?
হ্যাঁ।
আয়, আয়–
মোতাহার সাহেব ঘরে এসে তক্তপোষে বসলেন। তাকে খুবই বিমর্ষ দেখাচ্ছে। বললেন, খবর শুনেছেন?
কোন খবরের কথা তিনি বলছেন, হেমনাথ বুঝতে পারলেন। বললেন, শুনেছি। তোর ছাত্রের সঙ্গে তাই নিয়েই আলোচনা করছিলাম।
মোতাহার সাহেব বললেন, শেষ পর্যন্ত মুসলিম লিগ আর জিন্নারই তা হলে জয় হল!
আস্তে আস্তে মাথা নাড়লেন হেমনাথ, তাই তো দেখছি।
কিন্তু—
জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন হেমনাথ, কী?
প্রথমটা উত্তর দিলেন না মোতাহার সাহেব, অন্যমনস্কের মতো জানালার বাইরে ধু ধু ধানখেতের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর মুখ ফিরিয়ে হঠাৎ অত্যন্ত উত্তেজিত সুরে বলতে লাগলেন, এত মানুষ জেল খাটল, হাজার হাজার সোনার ছেলে প্রাণ দিল! না হেমা, এ আমরা চাই নি, এ আমরা চাই নি।
মোতাহার সাহেবের উত্তেজনা, অস্থিরতা ক্রমশ বাড়তেই লাগল। তিনি বলতে লাগলেন, কোন থিওরির ওপর দেশটা ভাগ হতে চলেছে, ভাবলে মাথা খারাপ হয়ে যায়।
বুঝতে না পেরে হেমনাথ শুধোলেন, কোন থিওরির কথা বলছিস মোতাহার?
জিন্নার টু নেশন থিওরি। প্রবল আক্ষেপের গলায় মোতাহার সাহেব বলতে লাগলেন, সারা জীবন একতার কথা বলে শেষে কিনা দ্বি-জাতি তত্ত্বের বিষ গিলতে হল!
হেমনাথ চুপ।
মোতাহার সাহেব থামেন নি, দেশভাগই যদি মেনে নেওয়া হল, আগে মানলেই হত। এত রক্তারক্তি, এত দাঙ্গা, এত হত্যা-ধর্ষণ-আগুন, কোনওটাই ঘটত না।
তা ঠিক।
নেতারা খেয়ালের বশে যা করলেন তার পরিণাম ভাল হবে না। দেশভাগের পেছনে কী আছে, লক্ষ করেছেন হেমদাদা?
কী আছে?
ঘৃণা বিদ্বেষ অবিশ্বাস আর শত্রুতা।
আস্তে করে মাথা নাড়লেন হেমনাথ।
মোতাহার সাহেব বলতে লাগলেন, দেশ যদি সত্যি সত্যিই ভাগ হয়, হিন্দু-মুসলমানকে চিরকাল ওই তিনটে জিনিসের জের টেনে চলতে হবে। আর সব চাইতে ক্ষতি হবে বাঙালি জাতির। এ জাতি আর কোনও দিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর মোতাহার সাহেবই আবার শুরু করলেন, আপনার কী মনে হয় হেমদাদা?
কী ব্যাপারে?
দেশভাগ কি শেষ পর্যন্ত হবে?
তার মানে–হেমনাথ অবাক, সব স্থির হয়ে গেছে। একটা সেটেলড় ফ্যাক্টকে আনসেটেলড্ করা যাবে কী করে?
হেমনাথের কথা বুঝিবা শুনতে পেলেন না মোতাহার সাহেব। তার বুকের ভেতর এই মুহূর্তে কোন হাওয়া বইছে, কে জানে। দুরমনস্কের মতো তিনি বললেন, আমার কি মনে হয় জানেন হেমদাদা?
কী?
পার্টিশান আটকে যাবে।
কে আটকাবে?
দেশের মানুষ। নেতাদের এই হঠকারিতা তারা কিছুতেই, কোনও মতেই মেনে নেবে না। আপনি দেখে নেবেন। মোতাহার সাহেবের চোখ জ্বলতে লাগল। হাত মুষ্টিবদ্ধ, চোয়াল কঠিন।
এমনিতেই মোতাহার সাহেব মানুষটি বেশ গম্ভীর। তাঁর চোখ এত উজ্জ্বল আর তীক্ষ্ণ যে, সেদিকে তাকিয়ে থাকা যায় না। দেখলেই ত্ম লাগে, আবার ভক্তিও হয়।
কিন্তু খুব কাছাকাছি এলে টের পাওয়া যায়, গাম্ভীর্যটা তার ছদ্মবেশ। কঠিন মাটির ঠিক তলাতেই সুশীতল জল রয়েছে, সামান্য খুঁড়লেই ফিনকি দিয়ে ফোয়ারা বেরিয়ে আসবে।
বাইরে কঠিন ভেতরে সরস, এই মানুষটি আজ কিন্তু বড়ই অস্থির, উদভ্রান্ত, চঞ্চল। মাটি খুঁড়লে আজ আর ফোয়ারা বেরুবে না, পুঞ্জীভূত ক্ষোভ আগুনের হলকা হয়ে বেরিয়ে আসবে।
.
শেষ পর্যন্ত দেশজোড়া রক্তাক্ত সুতিকাগারে সেই দিনটি ভুমিষ্ঠ হল। পনেরই আগস্ট, উনিশ শ’ সাতচল্লিশ। খন্ডিত দেশের ওপর দিয়ে স্বাধীনতার রথ এল ঘর্ঘরিয়ে।
মোতাহার সাহেব দেশবাসীর ওপর ভরসা রেখেছিলেন, তারা দেশভাগ বন্ধ করবে। জননীর মতো গরীয়সী এই জন্মভূমির দেহে ছুরি বসাতে দেবে না। কিন্তু সব বৃথা। হায় রে দুরাশা!
এই মুহূর্তে দেশের সব মানুষই প্রায় অন্ধ, আচ্ছন্ন। দু’হাত দুরের জিনিস দেখবার মতো দৃষ্টিটুকু পর্যন্ত তাদের নেই। জননীদেহ কেটে কুটে ভাগাভাগি করে নেওয়া ছাড়া তারা আর কিছু ভাবতেই পারছে না।
মোতাহার সাহেবের মতো যে দু চারজন আছেন, যাঁদের দৃষ্টি আপন সময়ের সমস্ত অন্ধকার এবং কুয়াশা সরিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছয়, তারাই শুধু অসীম দুঃখে দুরন্ত অভিমানে মূক হয়ে গেছেন। এ তাঁরা চান নি।
.
২.৫৩
পনেরই আগস্ট ভোর হবার কয়েক ঘন্টা আগে পাকিস্তান ডে’ ঘোষণা করা হয়েছিল।
চোদ্দই আগস্টের মাঝরাত থেকেই রাজদিয়ার চোখে আর ঘুম নেই। ঢাকা থেকে কত ব্যান্ড পার্টি যে আনা হয়েছে। এই নগণ্য শহরের সব রাস্তা ঘুরে ঘুরে তারা বাজিয়ে চলেছে।
রাজদিয়ার চোখ থেকে ঘুম তো গেছেই, ঘরে আর কেউ নেই। বাজনার শব্দে সবাই বেরিয়ে এসেছে। ঝিনুক আর বিনুকে নিয়ে হেমনাথও বাগান পেরিয়ে ক’বার যে রাস্তায় এলেন তার হিসেব নেই।
এক সময় ভোর হল।
এবার ব্যান্ড পার্টির সঙ্গে বেরুল মিছিল। মিছিল কি দু’চারটে? ধবধবে পোশাক-পরা ছোট ছোট শিশুদের মিছিল, কিশোর-কিশোরীদের মিছিল, যুবক-যুবতীদের মিছিল। প্রতিটি মিছিল চাঁদ-তারা আঁকা সবুজ পতাকা আর জিন্নার ছবি দিয়ে সুসজ্জিত।
মিছিলগুলো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে ধ্বনি দিচ্ছে:
