কাদের আর বিধবা পরানের মা (দু’জনেই লারমোরের আশ্রিত) অবোধ শিশুর মতো কাঁদছে। কাঁদছে আর ভাঙা গলায় বলছে, সাহেবের যদিন ভালমোন্দ কিছু হয়, আমরা কই যামু? আমাগো কী হইব? কে দেখব আমাগো? চোখের জলে তাদের বুক ভেসে যাচ্ছিল।
খবর পেয়ে স্নেহলতাও ছুটে এসেছেন। শিবানী আসতে চেয়েছিলেন। বাড়ি একেবারে ফাঁকা থাকবে বলে আসেন নি। এসেই লারমোরের শিয়রের কাছে বিষণ্ণ প্রতিমার মতো বসেছেন স্নেহলতা।
এদিকে এই বিপদের সময় হেমনাথ কিন্তু একেবারে দিশেহারা হয়ে পড়েন নি। রাজদিয়ায় ফিরেই ডাক্তার আনতে মজিদ মিঞাকে কমলাঘাটে পাঠিয়ে দিয়েছেন। কমলাঘাটের বন্দরে বড় ডাক্তার আছে।
সন্ধের পর ডাক্তার নিয়ে তখনও মজিদ মিঞা ফেরে নি, লারমোরের জ্ঞান ফিরল। চোখ মেলে ক্ষীণ দুর্বল স্বরে তিনি ডাকতে লাগলেন, হেম–হেম কোথায়?
হেমনাথ লারমোরের পায়ের দিকে বসে ছিলেন। তাড়াতাড়ি উঠে এসে বললেন, এই যে ভাই, এই তো আমি–
আমি আর বাঁচব না—
ছি, ও কথা বলতে নেই। তোমার অনেক কাজ, বাঁচতে তোমাকে হবেই। হেমনাথের কণ্ঠস্বর অসহ্য আবেগে কাঁপছিল।
লারমোর বিচিত্র হাসলেন, তারপর অত্যন্ত চঞ্চল হয়ে উঠলেন, বাঁচতে আমি চাই না হেম, চাই। ওরা আমাকে বিদেশি বলল! আমি বিদেশি! আমি বিদেশি!
হেমনাথ বললেন, কে বললে তুমি বিদেশি?
তাঁর কথা বোধ হয় শুনতে পেলেন না লারমোর। আপন মনে বলে যেতে লাগলেন, কবে এ দেশে এসেছিলাম, মনেও পড়েও না। জীবনের সবটুকুই এখানে কাটিয়ে দিলাম। এখানকার অন্ন-বস্ত্র ভাষা সমস্ত মাথায় তুলে নিয়েছি। এখানকার মানুষকে বুকে জায়গা দিয়েছি। তবু আমি বিদেশি, আমি বিদেশি–
হেমনাথ তার বুকে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলতে লাগলেন, কেন তুমি কষ্ট পাচ্ছ লালমোহন? একটা উন্মাদ কী বলেছে, মনে করে রেখো না। তুমি যদি বিদেশিই হবে, এত লোক তোমাকে দেখতে এসেছে! ওই দিকে তাকাও’লারমোরের খবর পেয়ে যারা ছুটে এসেছিল, উদ্বিগ্ন মুখে এখনও তারা গির্জায় ভিড় করে আছে। হেমনাথ তাদের দিকে আঙুল বাড়িয়ে দিলেন।
লারমোরের দুরন্ত অভিমান একটুও শান্ত হল না। ক্লান্ত সুরে তিনি বলতে লাগলেন, একজন বললেও তো বিদেশি বলেছে-বলতে বলতে শিশুর মতো ফুঁপিয়ে উঠলেন। তার চোখের কোল বেয়ে মুক্তোর দানার মতো ফোঁটায় ফোঁটায় জল ঝরতে লাগল।
বিনু কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। লারমোরের দিকে তাকিয়ে অপার বিস্ময়ে তার মন ভরে যাচ্ছিল। এমনিতে এই মানুষটি ধীর, স্থির, সংযত। জগতে ঈশ্বরের দূত হয়েই তিনি যেন নেমে এসেছেন। কিন্তু বিদেশি, এই একটি মাত্র কথায় কী নিদারুণ অস্থিরই না হয়ে উঠেছেন। মানুষের হৃদয়ে কোথায় যে দুর্বল আবেগ নিহিত থাকে!
হেমনাথ বলতে লাগলেন, কেঁদো না–শান্ত হও—
একটুক্ষণ চুপ করে থাকার পর খুব ক্লান্ত সুরে লারমোর বললেন, আমার বড় ঘুম পাচ্ছে হেম–
বেশ তো, ঘুমোও না—
একটা কাজ করবে হেম?
কী?
হল-ঘরে যেশাসের পায়ের কাছে আমাকে নিয়ে যাবে? ওখানে গেলে আমি একটু শান্তি পেতাম। ধরাধরি করে হেমনাথরা খাটসুদ্ধ লারমোরকে হল-ঘরে নিয়ে এলেন। পূর্ব দিকের দেওয়ালে যেখানে জোতির্ময় মানবপুত্রের বিশাল ছবিটা টাঙানো রয়েছে, তার তলায় তাকে রাখলেন।
লারমোর বললেন, এবার একটু ঘুমোই হেম। ধীরে ধীরে তাঁর চোখ এবং কণ্ঠস্বর বুজে এল।
অনেক রাত্রে কমলাঘাট থেকে বড় ডাক্তার নিয়ে ফিরল মজিদ মিঞা। ডাক্তার লারমোরের গায়ে হাত দিয়েই চমকে উঠলেন। ভাল করে পরীক্ষা করে গম্ভীর গলায় জানালেন, লারমোরের চোখে চিরনিদ্রা নেমে এসেছে। মানুষের সাধ্য নেই এ ঘুম ভাঙায়।
একধারে দাঁড়িয়ে বিনু দেখল, ক্রুশবিদ্ধ যিশুমূর্তির তলায় এ কালের লাঞ্ছিত রক্তাক্ত অপমানিত আরেক ক্রাইস্ট।
খুব অল্পদিনের ভেতর পর পর দু’টো মৃত্যু দেখল বিনু। সুরমার এবং লারমোরের। সুরমার মৃত্যু বিনুর ব্যাক্তিগত ক্ষতি। কিন্তু এ মানুষটি কোত্থেকে এসে জল-বাংলার প্রতিটি বৃক্ষলতা, পশুপাখি, তৃণদল এবং মানুষের হৃদয়ে নিজের সিংহাসন পেতেছিলেন। সমস্ত শূন্য করে তিনি আজ চলে গেলেন।
গির্জার একধারে লারমোরের সমাধি দেওয়া হল। সেই জায়গাটায় একটি বেদি তৈরি করে দিয়েছেন হেমনাথ। সেটার গায়ে শ্বেত পাথরের ফলক রয়েছে। তাতে লেখা?
ডেভিড লারমোর,
জন্ম–১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দ, ১৯ শে মে।
মহাপ্রয়াণ–১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দ, ২২ শে ডিসেম্বর।
মানবতার প্রতীক, আর্তজনের বন্ধু, মহাপ্রাণ এই মানুষটি এখানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন।
.
২.৫২
লারমোরের মৃত্যুর পর আশা করা গিয়েছিল, মানুষের মনে শুভবোধ জাগবে। কিন্তু কিছুই হল না। উত্তেজনা, অশান্তি, আতঙ্ক বেড়েই চলল। প্রায় রোজই খবর আসে মুসলিম লিগ এ গ্রামে ও গ্রামে এ গঞ্জে সে গঞ্জে এবং নদীর চরগুলোতে মিটিং করে বেড়াচ্ছে। চারদিকে দাঙ্গাও চলছে। হত্যা আর্তনাদ হল্লা আগুন, ইত্যাদি ছাপিয়ে বহুকণ্ঠের চিৎকার শোনা যায়, লড়কে লেঙ্গে
পাকিস্থান পালটা উত্তরও ভেসে আসে, বন্দে মাতরম–
তারপর ক’মাস আর। ভারতবর্ষের ভাগ্য একদিন স্থির হয়ে গেল। কত কালের সুপ্রাচীন এই দেশ। সাতচল্লিশের পনেরই আগস্ট তাকে কেটে দু’টুকরো করে ফেলা হবে। এক ভাগ হবে পাকিস্তান। আরেক ভাগ আবহমান কালের পুরনো নামটাই ধরে রাখবেভারত।
