হেমনাথ কী বলবেন, ঠিক করে উঠতে পারলেন না। অত্যন্ত বিচলিত আর চঞ্চল হয়ে উঠেছেন। তিনি।
মজিদ মিঞা আবার বলল, এট্টা কিছু বিহিত করেন ঠাউরভাই। আপনের চৌখের সামনে অ্যামন খাওয়াখাওয়ি মারামারি হইব। কুনখানে কার দুষে (দোষে) দাঙ্গা হইছে হেয়াতে আমাগো কী? আমরা চিরকাল য্যামন একলগে আছি, ত্যামনই থাকতে চাই। আপনে অগো থামান ঠাউরভাই। তমস্ত জীবন। যা দেখি নাই, এই শ্যাষ বস্যে (বয়সে) হেই খুনাখুনি দেখতে হইব? তার থিকা আমার মরণ ভাল।
হেমনাথ কিছু বলবার আগেই লারমোর চেঁচিয়ে উঠলেন, এ দাঙ্গা চলতে পারে না। যেভাবেই হোক থামাতে হবে। চল’ বলেই হাটের মাঝখানে যেখানে তান্ডব চলছে, সেদিকে ছুটলেন।
মজিদ মিঞা বিনু এবং হেমনাথ লারমোর পিছু পিছু ছুটলেন। সব চাইতে প্রথমে পড়ে আনাজহাটা। সেখানে এসে দেখা গেল, অনেকগুলো লোকের হাত-পা ভেঙে গেছে, মাথা ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছে। রাশি রাশি ঝিঙে-পটল-বেগুন চারধারে ছত্রখান হয়ে আছে। আহত লোবগুলো যন্ত্রণায় ক্ষতস্থান চেপে ধরে কাঁদছিল, ককাচ্ছিল, গোঙানির মতো শব্দ করে চিৎকার করছিল।
ডান দিকে মরিচহাটা, বাঁ ধারে মাছের বাজার। দু’জায়গাতইে সমানে লাঠি চলছে আর বৃষ্টি ধারার মতো ঢিল পড়ছে। সেই সঙ্গে ক্রুদ্ধ, হিংস্র, মারমুখী জনতা চেঁচাচ্ছিল?
মার শালারে—
মার বউয়ার ভাইরে–
মাইরা মাইরা কাফেরের পুতেরে শ্যাষ কইরা দে—
লড়কে লেঙ্গে—
পাকিস্থান—
কালী মাঈকি জয়–
হঠাৎ গলায় সবটুকু শক্তি ঢেলে সুজনগঞ্জের হাটটাকে চমকে দিয়ে চিৎকার করে উঠলেন লারমোর, থামা, থামা–তোরা মারামারি থামা–
মজিদ মিঞাও চেঁচাচ্ছিল, আহাম্মকের ছাওরা, অ্যামন খুনাখুনি করিস না তরা। আল্লার কিরা।
চিৎকার করতে করতে একবার মরিচহাটা, একবার মাছের বাজার, একবার গো-হাটার দিকে ছুটছিলেন লারমোর। তার পেছনে ছিল বিরা।
উন্মত্ত জনতা মজিদ মিঞা বা লারমোরের কথা কানেই তুলছিল না। হিংস্র এক ডাকিনী তাদের যেন মন্ত্র পড়ে ছেড়ে দিয়েছে। সমানে লাঠি চালিয়ে যাচ্ছিল, ঝক ঝক ঢিল ছুঁড়ছিল। তাদের চোখে হত্যা যেন ঝিলিক দিয়ে দিয়ে যাচ্ছে।
ছোটাছুটি করতে করতে তামাকহাটায় এসে হঠাৎ লারমারের চোখে পড়ল, একটা রুগ্ণ লোকের মাথার ওপর তিন চারটে লাঠি উদ্যত হয়ে আছে, পলক পড়বার আগেই নেমে আসবে।
লারমোর লাফ দিয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। বললেন, মারিস না ওকে, মারিস না। ওই লাঠির একটা বাড়ি পড়লে ও মরে যাবে।
যারা মারবার জন্য লাঠি তুলেছিল তাদের ভেতর থেকে একজন খ্যাল খ্যাল করে হেসে উঠল, ভালাই তো, বেশি কষ্ট করতে হইব না। এক বাড়িতে যমের দুয়ারে পাঠাইয়া দিতে পারুম। তুমি যাও সাহেব
না, কিছুতেই না–মা-পাখি যেমন করে তার বাচ্চাকে ডানা দিয়ে ঘিরে রাখে তেমনি করে দু’হাত দিয়ে রুণ লোকটাকে আগলে রাখলেন লারমোর।
সেই লোকটা আবার বলল, সর সাহেব, শালারে নিকাশ কইরা দেই—
না। কদিন আগে কালাজ্বরে ও মরতে বসেছিল। কত কষ্ট করে ওকে মরার হাত থেকে ফিরিয়েছি। আমার চোখের সামনে ওকে কিছুতেই মারতে দেব না।
ভালো চাও তো সইরা যাও সাহেব—
না। লারমোর অনড় হয়ে রইলেন। তাঁর চোখে কঠিন প্রতিজ্ঞা জ্বলছে যেন।
সেই লোকটা উগ্র গলায় আবার বলল, শালা বিদ্যাশি, এইখানে আইসা মাদবরী (মাতব্বরী) ফলাও–
লারমোর চমকে উঠলেন, আমি বিদেশি!
নিয্যস।
কথাটা যেন বিশ্বাস করতে পারলেন না লারমোর। আবার প্রতিধ্বনি করলেন, আমি বিদেশি, আমি বিদেশি–
তয় কি তুমি এই দ্যাশের নাতিন জামাই? দেখছ নিজের গায়ের রংখান?
সেই লোকটার সঙ্গীগুলো অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছিল। তাদের একজন বলল, প্যাচাল না পাইড়া সইরা যাও সাহেব
স্থির অগ্নিশিখার মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন লারমোর। বললেন, না–
তয় মর শালা—
কেউ কিছু বুঝবার আগেই একটা লাঠি এসে পড়ল লারমোরের মাথায়। চড়াৎ করে শব্দ হল একটা। তারপরেই রক্তের ফোয়ারা ছুটল। মাথায় হাত দিয়ে পলকে লুটিয়ে পড়লেন লারমোর।
বিনু চিৎকার করে উঠল, লালমোহন দাদুকে মেরে ফেলল, মেরে ফেলল–
মজিদ মিঞা কপালে চাপড় মারতে মারতে আর্ত, আকুল গলায় বলতে লাগল, হায় হায়, এই কি সর্বনাশ করলি ডাকাইতরা!
হেমনাথ কিছুই বললেন না। ধীরে ধীরে বসে লারমোরের বোগা, দুর্বল দেহখানা কোলে তুলে নিলেন। হেমনাথের শরীর আশ্চর্য কঠিন, শুধু ঠোঁট দুটো থর থর করছে।
এই সময় ওদিক থেকে কারা যেন সন্ত্রস্ত গলায় চেঁচিয়ে উঠল, পুলিশ আসছে, পুলিশ আসছে—
নিমেষে সামনের সেই হিংস্র, উত্তজিত হত্যাকারীর দল অদৃশ্য হয়ে গেল। শুধু তারাই না, যারা দাঙ্গা করছিল, সুজনগঞ্জ হাটের সীমানার ভেতর তাদের কারোকেই আর দেখা গেল না।
আঘাত লাগার ফলে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন লারমার। দিনের আলো থাকতে থাকতেই অজ্ঞান অবস্থায় তাকে নিয়ে হেমনাথরা রাজদিয়ায় ফিরলেন। একেবারে সোজা গির্জায় নিয়ে তুললেন।
লরমোর আজকের দাঙ্গায় শিকার হয়েছেন, এই খবরটা কেমন করে যেন দিগ্বিদিকে রটে গিয়েছিল। রাজদিয়ার কুমোরপাড়া কামারপাড়া যুগীপাড়া মৃধাপাড়া নিকারীপাড়া সর্দারপাড়া–শুধু কি রাজদিয়া, চারপাশের গ্রামগঞ্জগুলো শূন্য করে কত মানুষ যে লারমোরকে দেখতে এল! বিষণ্ণ করুণ মুখে তারা আজকের এই নিদারুণ ঘটনাকে ধিক্কার দিতে লাগল, আ রে সব্বনাইশারা, তরা মারণের লেইগা মানুষ বিচরাইয়া (খুঁজে) পালি না? লালমোহন সাহেব যে আমাগো বাপের লাখান ভালবাসছে। হে যে আমাগো বাপ–
