অমন দৌড়চ্ছিস কেন?
মিটিনে যাই—
কিসের মিটিং রে?
ঢাকা থনে বড় মাইনষেরা আইছে, তেনারা কী হগল কইব। যাই–বলে আর দাঁড়াল না গয়জদ্দি, আবার ছুটল।
একটু চুপ করে থেকে হেমনাথ বিনুকে বললেন, মিটিংয়ে যাবি নাকি দাদাভাই?
চল। ঢাকার লোকেরা কী বলছে, শুনেই আসি।
২.৫১-৫৬ তামাকহাটা মরিচহাটা আনাজহাটা
২.৫১
তামাকহাটা মরিচহাটা আনাজহাটা পেছনে রেখে বড় বড় পা ফেলে বিষহরিতলার কাছে এসে পড়ল বিনুরা।
আশ্চর্য, লারমোর চেয়ার টেবিল পেতে যথারীতি রোগী দেখতে বসেছেন। এক পাশে ওষুধের মস্ত বাক্স। আরেক পাশে সুজনগঞ্জ হাটের অনেকগুলো অসুস্থ রুগণ মানুষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে। সামনের বিশাল মাঠ জুড়ে যে অত বড় একটা মিটিং চলছে, অসংখ্য হাটুরে মানুষ যে ভিড় জমিয়েছে, সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই লারমোরের। নিজের কাজের মধ্যে তিনি ধ্যানস্থ হয়ে আছেন। সমস্ত পৃথিবী জুড়ে যে এত অস্থিরতা, এত উত্তেজনা, কলকাতা-বিহার-নোনায়াখালি রক্তের নদী হয়ে যে দুলছে– লারমোরের দিকে তাকালে সে কথা কে বিশ্বাস করবে!
পেট টিপে টিপে একটা রোগীকে পরীক্ষা করছিলেন লারমোর। হেমনাথ ডাকলেন, লালমোহন—
লারমোর মুখ তুললেন। খুশি গলায় বললেন, আরে হেম যে, কখন এলে হাটে?
এই সবে। নৌকো থেকে নেমে সোজা আসছি।
বসবে তো? না হাট টাট সেরে আসবে?
বসবও না, হাটও সারব না–
তবে কী করবে?
সামনের বিশাল জনতার দিকে আঙুল বাড়িয়ে হেমনাথ বললেন, ওখানে মিটিং হচ্ছে, দেখতে পাচ্ছ?
হ্যাঁ। লারমোর ঈষৎ মাথা হেলিয়ে বললেন, অনেকক্ষণ থেকেই দেখছি। শুনলাম ঢাকা থেকে কারা এসে বক্তৃতা দিচ্ছে।
আমিও তাই শুনলাম। আর শুনেই এদিকে এলাম–
মিটিংয়ে যাবে নাকি?
হ্যাঁ। তুমিও চল–
আমার যাবার সময় কোথায়? দেখছ না, ওরা বসে আছে। এখন উঠে গেলে ওরা আমাকে খেয়ে ফেলবে। লারমোর তার রোগীদের দেখিয়ে দিলেন।
হেমনাথ বললেন, তুমি তা হলে যাবে না?
না। ওসব কচকচি আমার খুব খারাপ লাগে। নিজের কাজ আর এই সব রোগা, অসুস্থ মানুষ ছাড়া অন্য কিছু ভাল লাগে না। ঢাকার লোকেরা এসে কী-ই বা বলবে! তাতে এখানকার মানুষের উপকার কিছু হবে?
হেমনাথ হাসতে লাগলেন, তার মানে এদের ছেড়ে কোথাও যেতে চাও না তুমি?
না।
তবে তুমি এদের নিয়েই থাকো। আমরা মিটিংয়ে যাই যাও—
মিটিং শুনে এখানে আসবে তো?
আসব।
হঠাৎ কী মনে পড়ে যেতে লারমোর বললেন, হাট থেকে তুমি কখন বাড়ি ফিরবে হেম?
হেমনাথ বললেন, বিকেল নাগাদ—
আমিও তোমার সঙ্গে যাব।
সে কি, আজ এত তাড়াতাড়ি? তুমি তো হাট ভাঙবার পর সেই রাত্রিবেলা রাজদিয়ায় ফের।
আজ শরীরটা খুব ভাল লাগছে না।
হেমনাথকে উদ্বিগ্ন দেখাল, কী হয়েছে?
তেমন কিছু না। লারমোর হাসলেন, এই একটু জ্বর জ্বর মতো। আচ্ছা তোমরা মিটিংয়ে যাও। এরপর গেলে হয়তো কিছুই শুনতে পাবে না।
শেষ পর্যন্ত সামনের ওই বিশাল মাঠে, বিপুল জনতা যেখানে উদগ্রীব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, হেমনাথদের যাওয়া হল না। লারমোরের অস্থায়ী হাসপাতাল থেকে সবে দু’পা এগিয়েছেন, মিটিং ভেঙে গেল। তারপরেই জলোচ্ছ্বাসের দিশেহারা ঢলের মতো জনতা ছুটল হাটের দিকে।
মিটিং থেকে যারা ফিরছে তারা সবাই প্রচন্ড উত্তেজিত। সমানে তারা চিৎকার করছিল, মার কাফেরগো–
মার সুমুন্দির পুতেগো—
মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছিল, লড়কে লেঙ্গে—
পাকিস্থান–
হেমনাথ আর বিনু দাঁড়িয়ে পড়েছিল।
আগে ওই মাঠে অনেক বার হাটুরে মানুষদের ভিড় করতে দেখেছে বিনু। হরিন্দ যখন দেশ দেশান্তরের খবর এনে ওখানে কেঁড়া দিত, একটা মানুষও আর হাটের চালার তলায় থাকত না। যুদ্ধের সময় সেনাদলে রিকুমেন্টের জন্য এস.ডি.ও কি ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব কিংবা মিলিটারি অফিসাররা যখন আসতেন তখনও মরিচহাটা, তামাকহাটা ফাঁকা করে সবাই ওখানে ছুটে যেত। কিন্তু এমন উত্তেজনা নিয়ে উদভ্রান্তের মতো কেউ ফিরত না।
জনতা উন্মত্তের মতো ছুটে যাচ্ছে। ঢাকার লোকগুলো তাদের কী বলেছে, কে জানে। বিনুরা বিমূঢ়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকল।
কিছুক্ষণের ভেতর দেখা গেল, হাটের একটা চালাও আর আস্ত নেই। বাঁশের খুঁটিগুলো জনতার হাতে হাতে মারণাস্ত্র হয়ে ঘুরছে।
দেখতে দেখতে দাঙ্গা শুরু হয়ে গেল। সমস্ত সুজনগঞ্জের হাট জুড়ে কয়েক হাজার লাঠি আকাশের দিকে উঠেই নেমে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে উঠছে চিৎকার, আর্তনাদ। লোকের পায়ে পায়ে হাটের ধুলো মাথার ওপর উঠে মেঘের মতো জমতে শুরু করেছে।
অনেকক্ষণ পর আপন মনে হেমনাথ বললেন, কী সর্বনাশ!
বিনু খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল। নিজের চোখে আগে আর কখনও দাঙ্গা দেখে নি সে। ভীরু গলায় ডাকল, দাদু–
কী বলছিস? অন্যমনস্কের মতো সাড়া দিলেন হেমনাথ।
আমরা কেমন করে বাড়ি যাব?
হেমনাথ বুঝিবা তার কথা শুনতে পেলেন না। বলতে লাগলেন, অন্য অন্য জায়গায় দাঙ্গা হয়েছে। কিন্তু এ পাপ তো এখানে ছিল না–
বিনু কী বলতে যাচ্ছিল, পেছন থেকে লারমোরের গলা ভেসে এল, হেম–হেম—
হেমনাথ ঘুরে দাঁড়ালেন, বিনুও ঘুরল। চোখাচোখি হতেই লারমোর বললেন, এখানে এস—
হেমনাথরা লারমোরের কাছে চলে এলেন।
উদ্বিগ্ন সুরে লারমোর বললেন, কান্ডটা দেখেছ!
হুঁ–গম্ভীরভাবে মাথা নাড়লেন হেমনাথ।
এই সময় হাটের দিক থেকে ছুটতে ছুটতে মজিদ মিঞা এসে হাজির। তাকে পাগলের মতো দেখাচ্ছে। অস্থির গলায় সে বলতে লাগল, এ কী হইল ঠাউরভাই, এ কী হইল!
