দূর সমুদ্রকল্লোল এই রাজদিয়ায় এসেও ধাক্কা দিল। বিনুরা কলেজে স্ট্রাইক করল। দশটা প্রাইমারি স্কুল, ছেলেদের হাইস্কুল এবং মেয়েদের হাইস্কুলেও স্ট্রাইক হয়ে গেল। তারপর ছাত্রছাত্রীরা ত্রিবর্ণ পতাকা হাতে নিয়ে মিছিল বার করল। সারা শহর ঘুরতে ঘুরতে তারা স্লোগান দিতে লাগল।
আজদ হিন্দ ফৌজের বীর সৈনিকদের–
মুক্তি চাই, মুক্তি চাই।
জয় হিন্দ–
বন্দে মাতরম—
নেতাজীকি—
জয়।
ভারত মাতাকি—
জয়।
শাহনওয়াজ-ধীলন-সায়গলকি—
জয়।
একে একে এল রসিদ আলি ডে, বোম্বাইতে নৌবিদ্রোহ। সারা দেশ ঝড়ের দোলায় দুলতে লাগল।
আজাদ হিন্দ সৈনিকদের মুক্তির জন্য আন্দোলন, নৌবিদ্রোহ, রসিদ আলি ডে–বিদ্যুৎচমকের মতো দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল।
.
এদিকে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আর ঠেকিয়ে রাখা যাচ্ছিল না। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষে গ্রেট ব্রিটেনের শ্রমিক সরকার ঘোষণা করলেন, একটি ক্যাবিনেট মিশন এদেশে পাঠাবেন। উদ্দেশ্য, কিভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করা যায় তার সূত্র উদ্ভাবন করা।
উনিশ শ’ ছেচল্লিশের তেইশে মার্চ ক্যাবিনেট মিশন ভারতে এসে পৌঁছল। দলে তিনজন সদস্য লর্ড পেথিক লরেন্স, স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস এবং মিস্টার এ. ভি. আলেকজান্ডার।
ক্যাবিনেট মিশন ভারতবর্ষে এসেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে কংগ্রেস আর মুসলিম লিগের সঙ্গে আলোচনা শুরু করল।
লাহোর প্রস্তাবের পর মুসলিম লিগ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, ভারতবর্ষের দেহ ছিন্ন করে একটি সার্বভৌম মুসলিম রাষ্ট্র গড়তেই হবে। লিগ নেতাদের ভয়, দেশ, স্বাধীন হলে সংখ্যালঘু মুসলমানদের নিরাপত্তা থাকবে না, হিন্দু রাজ’ তাদের ধ্বংস করে দেবে।
কিন্তু ক্যাবিনেট মিশনের সদ্যসরা পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিলেন, দেশগে তাঁদের বিন্দুমাত্র সায় নেই। তখন মোটামুটি স্থির হয়, সংখ্যলঘুদের নিরাপত্তা এবং সুশাসনের জন্য ফেডারেল গমেন্ট তৈরি করা হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকবে-প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক নীতি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার দায়িত্ব। এ, বি এবং সি–দেশকে তিনটি অংশে ভাগ করে যত বেশি বিষয়ে সম্ভব আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হবে।
বি বিভাগে থাকবে পাঞ্জাব, সিন্ধু, উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ এবং ব্রিটিশ বেলুচিস্তান। এই অংশটিতে নিরঙ্কুশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা। সি’ বিভাগে থাকবে বাংলা ও আসাম। এখানেও মুসলমানরা সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়। আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন হাতে পেলে মুসলমানদের সন্দেহ ও উৎকণ্ঠা অদ্ভুত থাকার কথা নয়। তবে জাতীয় ঐক্যের দিকে দৃষ্টি রাখতেই হবে।
মুসলিম লিগ শেষ পর্যন্ত এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল। কংগ্রেসেরও এতে আপত্তি ছিল না। সফলকাম ক্যাবিনেট মিশন দেশে ফিরে গেল।
ক্যাবিনেট মিশন চলে যাবার পর কদিন আর। আবার পুরনো সংশয়, ঘৃণা এবং পারস্পরিক বিদ্বেষে আকাশ বিষাক্ত হয়ে উঠল। মুসলিম লিগ সিদ্ধান্ত নিল কনস্টিটিউয়েন্ট আসেমব্লিতে যোগ দেবে না বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতিনিধিত্ব করবে না। জিন্না ছেচল্লিশের ষোলই আগস্ট প্রত্যক্ষ সংগ্রাম’-এর ডাক দিলেন।
ছেচল্লিশের ষোলই আগস্ট ইতিহাসের এক অন্ধকার দিন। সারা দেশ জুড়ে আত্মঘাতী দাঙ্গা শুরু হয়ে গেল। কোথায় কলকাতা, কোথায় বিহার, কোথায় নোয়াখালি-সমস্ত ভারতবর্ষ রক্তের সমুদ্র হয়ে দুলতে লাগল। কে বলবে মাত্র কদিন আগে নৌ-বিদ্রোহ ঘটে গেছে, কে বলবে রসিদ আলি ডে কিংবা আজাদ হিন্দ ফৌজের বীর সোনানীদের মুক্তির জন্য জাঙ্খির্মনির্বিশেষে মানুষ সেদিন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আন্দোলন করেছিল।
খবরের কাগজ খুললে এখন শুধু আগুন-হত্যা-ধর্ষণ। ভারতবর্ষ যেন এক দুঃস্বপ্নের ঘোরে বর্বর যুগের কোনও আদিম অন্ধকারে ফিরে গেছে।
আসমুদ্র হিমাচল একখানা আগুনের চাকা যেন ঘুরে চলেছে। এই ছোট্ট রাজদিয়াতেও তার আঁচ এসে লাগল।
মিলিটারি ব্যারাকে সাপ্লাই দেবার জন্য রজবালি শিকদার মন্তাজ মিঞার যে বাড়িটা ভাড়া নিয়ে গুদাম করেছিল, এখন সেটাই মুসলিম লিগের অফিস। তার থেকে খানিকটা এগিয়ে গেলে হাইস্কুলের গা ঘেঁষে কংগ্রেসের অফিস।
আজকাল রোজই হয় মুসলিম লিগ, না হয় কংগ্রেস রাজদিয়ায় মিটিং করছে। মিটিংয়ের পর দু’ দলই মিছিল বার করে।
সবুজ পতাকা উড়িয়ে লিগের সমর্থকরা শ্লোগান দেয় :
লড়কে লেঙ্গে—
পাকিস্থান।
কায়েদে আজম—
জিন্দাবাদ।
কংগ্রেসের মিটিংয়ে মোতাহার হোসেন সাহেব আবেগপূর্ণ ভাষায় বক্তৃতা দেন, আমরা হিন্দু মুসলমান যুগ যুগ ধরে পাশাপাশি বাস করছি। বাস করবও। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এ দেশকে কোনও দিনই ভাগ করতে দেওয়া হবে না। এক বছর, দু’বছর, দশ হাজার বছর পরও এ দেশ একই থাকবে।
সারা দেশ যখন অস্থির উন্মাদ, তখন মোতাহার সাহেবের কথা কার কানে ঢুকবে? দেশজোড়া উন্মত্তরা জল-বাংলার এই স্নিগ্ধ শ্যামল ভুবনেও একদিন রক্তের সমুদ্রকে টেনে নিয়ে এল।
ঘটনাটা এইরকম।
সেদিন হেমনাথের সঙ্গে সুজনগঞ্জের হাটে গিয়েছিল বিনু। নৌকো থেকে নেমে ওপরে উঠতেই তারা শুনতে পেল, বিষহরিতলার ওধারে বিশাল মাঠখানায় মিটিং চলছে। হাটের বেশির ভাগ লোক ওখানে ভিড় জমিয়েছে।
কিছুটা আপন মনে হেমনাথ বললেন, আজকে আবার কিসের মিটিং?
বিনু বলল, কী জানি–
বেগুন ব্যাপারি গয়জদ্দি পাশ দিয়ে ছুটে যাচ্ছিল, হেমনাথ ডাকলেন। গয়জদ্দি দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল, কী ক’ন হামকত্তা?
