মিলিটরি ব্যারাকগুলো আলোর মালা দিয়ে সাজানো হয়েছে। রঙিন কাগজ দিয়ে বড় বড় তোরণ তৈরি করা হয়েছে। সেগুলো থেকে লাল-নীল কাগজের ঠোঙায় অসংখ্য লণ্ঠন ঝুলছে। আর উড়ছে পতাকা–মিত্রশক্তির সবগুলো দেশের পতাকা রাজদিয়ার আকাশে সগর্বে মাথা তুলে আছে।
যুদ্ধজয়ের আনন্দে সারাদিনই ব্যারাকগুলোতে হুল্লোড় চলছে। নাচ গান আর অবিরাম জ্যাজ বাজনার শব্দে রাজদিয়ার স্নায়ু বুঝি ছিঁড়েই পড়বে। নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-মানিকগঞ্জ থেকে কত যুবতী মেয়ে যে আনা হয়েছে তার লেখাজোখা নেই। তা ছাড়া, মদের ঢল বয়ে যাচ্ছে। মিলিটারি ব্যারাকের একটি প্রাণীও এখন সুস্থ বা স্বাভাবিক নেই। দিবারাত্রি নেশার ঘোরে আচ্ছন্ন।
মাসখানেক প্রমত্ত উৎসব চলল। তারপর একদিন রাজদিয়াবাসীরা দেখতে পেল, ধূসর রঙের সেই বড় স্টিমারটা এসে জেটিঘাটে ভিড়েছে। বিশাল জলপোকার মতো এই স্টিমারে করেই নিগ্রো আর আমেরিকান টমিরা রাজদিয়ায় এসেছিল। তাদের লরি-ট্রাক-কামান-বন্দুক গোলাগুলি এবং অসংখ্য সাজ সরঞ্জাম এসেছিল।
যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। রাজদিয়াবাসীরা এবার দেখল, জিপ-ট্রাকের চাকাটাকা খুলে এবং বড় বড় লোহার পেটিতে অস্ত্রশস্ত্র বোঝাই করে স্টিমারে তোলা হচ্ছে। একদল টমিও স্টিমারে উঠল।
সকালের দিকে স্টিমারটা এসেছিল, বিকেলে চলে গেল।
এরপর থেকে একদিন পর পর সকালবেলা স্টিমারটা রাজদিয়ায় আসতে লাগল। এবং যুদ্ধের সরঞ্জাম আর একদল করে টমি নিয়ে চলে যেতে লাগল। দশ দিনের ভেতর চারদিক ফাঁকা হয়ে গেল। যুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে প্রাগৈতিহাসিক যুগের অতিকায় প্রাণীর কঙ্কালের মতো রাজদিয়া জুড়ে পড়ে থাকল কতকগুলো শূন্য ব্যারাক এবং লম্বা পিচের রাস্তা।
যুদ্ধের মাঝামাঝি দু’তিনটে বছর রাজদিয়ার জীবন খুব চড়া তারে বাজছিল, আবার পুরনো স্তিমিত ঢিমে তালের দিনযাপনের মধ্যে ফিরে গেল সেটা।
.
২.৫০
যুদ্ধের শেষ দিকে বিস্ময়কর একটা খবর এসেছিল–সুভাষচন্দ্রের খবর।
বিনুর মনে পড়ে, তারা রাজদিয়া আসার কিছুদিন পর সুভাষচন্দ্র কলকাতার বাড়িতে অন্তরীণ হয়ে ছিলেন। সেই অবস্থাতেই একদিন তাকে পাওয়া গেল না। সমস্ত দেশ স্তম্ভিত বিস্ময়ে শুনল, ইংরেজদের সতর্ক বিনিদ্র পাহারার মধ্যে দিয়ে তার রহস্যময় অন্তর্ধান হয়েছে। কিভাবে, কোথায়, কোন দুর্গম দেশে তিনি অদৃশ্য হয়েছেন, কেউ জানতেও পারল না। সারা দেশের কাছে সুভাষচন্দ্র এক চমকপ্রদ লিজেন্ডের নায়ক হয়ে থাকলেন।
তার ক’বছর পর যুদ্ধের যখন শেষ অঙ্ক, শেষ দৃশ্য, সেই সময় উত্তর-পুর্ব সীমান্তের ওপার থেকে টুকরো টুকরো যেসব খবর আসতে লাগল তাতে শৃঙ্খলিত দেশের হৃৎপিন্ড বিপুল আশায় দুলতে লাগল।
রূপকথার চাইতেও সে এক অবিশ্বাস্য ইতিহাস। কলকাতা থেকে অন্তর্হিত হয়ে প্রথমে আফগানিস্তান, সেখান থেকে বার্লিন, তারপর টোকিও গেলেন সুভাষচন্দ্র। পদানত দেশ তাঁকে যেন অস্থির উন্মাদ করে তুলেছে।
বীর নায়ক রাসবিহারী তখন আজাদ হিন্দ সঙঘ সৃষ্টি করেছেন। সুভাষচন্দ্র তাতে প্রাণসঞ্চার করে নেতৃত্ব গ্রহণ করলেন। আজাদ হিন্দ সঙঘ হল আজাদ হিন্দ ফৌজ। ইতিহাসের সে এক পরম শুভক্ষণ। একই পতাকাতলে ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সকল প্রান্ত এসে হাত মেলাল। সুভাষচন্দ্র সেদিন থেকেই নেতাজী।
তারপর শুরু হল শৃঙ্খলমুক্তির অভিযান। জীবন-মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করে ঊর্ধ্বশ্বাসে একাগ্র চিত্তে সে এক দুরূহ ব্রতপালন। দেখতে দেখতে সিঙ্গাপুরে জাতীয় পতাকা উড়ল। তারপর বর্মা পেরিয়ে ইম্ফল পেছনে ফেলে ঝড়ের গতিতে কোহিমা পর্যন্ত চলে এল আজাদ হিন্দ ফৌজ।
ওই কোহিমা পর্যন্তই। এদিকে জাপানের তখন করুণ অবস্থা। রসদ নেই, খাদ্য নেই। ফলে সুভাষচন্দ্রের বড় সাধের দিল্লি চল’ স্বপ্ন হয়েই রইল।
আজাদ হিন্দ ফৌজের মরণপণ অভিযান পরাভূত, বিধ্বস্ত হয়ে যায়। ‘জীবন-মৃত্যু’কে যাঁরা তুচ্ছ করেছিলেন সেই ভয়লেশহীন বীর সন্তানেরা বন্দি হয়ে একে একে দিল্লির লালকেল্লায় কারারুদ্ধ হয়েছেন। ধীলন শাহনওয়াজ সায়গল–পরাধীন জাতির ইতিহাসে নামগুলো সোনার অক্ষরে লিখে রাখবার মতো।
বিনুর মনে আছে, দিনকয়েক আগে খবরের কাগজে পড়েছিল, আজাদ হিন্দ ফৌজের অভিযুক্ত সেনানীদের বিচারের জন্য সামরিক ট্রাইবুনাল গঠন করা হয়েছে এবং বন্দিরা আপিল করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
ট্রাইবুনাল গঠনের পর তিন সপ্তাহ বিচার স্থগিত ছিল। আজ লালকেল্লায় তার প্রহসন শুরু হবে। একরকম আনায়াসেই এই বিচারের রায় আগে থাকতে বলে দেওয়া যায়।
সমস্ত দেশের প্রাণপুরুষ এই বীর সেনানায়কদের জন্য উদ্বেল হয়ে উঠেছে। আসমুদ্র হিমাচল বিশাল ভারতবর্ষের এমন কেউ নেই, মনে মনে লালকেল্লার সেই মানুষ ক’টির পাশে গিয়ে দাঁড়ায়নি। সামরিক ট্রাইবুনালের সমানে বীর সন্তানদের মুক্তির জন্য সওয়াল করতে ছুটে গেছেন ভুলাভাই দেশাই। দীর্ঘ দু’যুগ পর ব্যারিস্টার বেশে জহরলাল আজ ভুলাভাইর পাশে গিয়ে দাঁড়াবেন।
কোথায় কলকাতা, কোথায় বোম্বাই, কোথায় দিল্লি সমস্ত ভারতবর্ষ আজ অস্থির, উদ্বেলিত। বিচারের আগের মুহূর্তে দেশের আত্মা যেন বজ্রকণ্ঠে দাবি জানাচ্ছে, স্বাধীনতার সৈনিকদের সসম্মানে মুক্তি চাই।
