গরম শেষ হয়ে এল। এর মধ্যেই আকাশ জুড়ে কালো কালো ভবঘুরে মেঘেরা হানা দিতে শুরু করেছে। কদিন আর? আষাঢ় মাস পড়লেই মেঘের টুকরোগুলো ঘন হয়ে, জমাট বেঁধে, চরাচর ছেয়ে ফেলবে। তারপর শুরু হবে বর্ষা। আকাশ থেকে লক্ষ কোটি বৃষ্টির ধারা সারাদিন ধরে, সারারাত ধরে শুধু নামতেই থাকবে।
চৈত্র বৈশাখে যে মাঠ ফেটে চৌচির হয়ে গেছে, নতুন বর্ষা তাদের জুড়িয়ে দেবে। তপ্ত, তৃষিত বসুন্ধরা স্নিগ্ধ সরস হতে থাকবে। চারদিকে বর্ষা তার সজল ছায়া ফেলতে শুরু করেছে।
.
একদিন দুপুরে অবনীমোহন কোথায় যেন গিয়েছিলেন। সন্ধেবেলা ফিরে এসে হেমনাথকে বললেন, মামাবাবু একটা কথা বলছিলাম–
হেমনাথ আর বিনু পুবের ঘরে বসে ছিল। স্নেহলতা এইমাত্র এ ঘরে আলো জ্বালিয়ে দিয়ে গেছেন।
জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন হেমনাথ, কী কথা অবনী?
বিছুক্ষণ ইতস্তত করে অবনীমোহন বললেন, আমি আসাম যাব।
হঠাৎ আসাম! হেমনাথ অবাক।
হেমনাথ বলতে লাগলেন, ক’দিনের মধ্যে বৃষ্টি নেমে যাবে। জমিতে হাল-লাঙল নামাতে হবে। এ সময় তুমি আসাম যেতে চাইছ?
আজ্ঞে হ্যাঁ, মানে–
কী?
এ বছর আমি চাষ করব না।
তবে জমির কী হবে?
ভাবছি বর্গাদারদের কাছে ভাগচাষে দিয়ে দেব।
কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর হেমানথ বললেন, আসাম থেকে ফিরছ কবে?
কিছু ঠিক নেই।
ওখানে যাবার কী কারণ ঘটল, বুঝতে পারছি না তো!
আমি একটা কনট্রাক্ট পেয়েছি।
কিসের কনট্রাক্ট?
মিলিটারির।
মিলিটারির?
হ্যাঁ—
কই, আমাকে আগে কিছু বলনি তো—
আজই পেলাম, আগে বলব কী করে? অবনীমোহন হাসলেন।
হেমনাথ বললেন, কনট্রাক্ট তো নিয়েছ। আসামে গিয়ে কী করতে হবে?
মিলিটারিদের জন্যে রাস্তাঘাট আর পাহাড়ের ওপর ব্যারাক, ট্যারাক তৈরি করতে হবে।
তোমার ওসব কাজের অভিজ্ঞতা আছে?
বিন্দুমাত্র না।
তা হলে?
করতে করতেই অভিজ্ঞতা হয়ে যাবে।
হেমনাথ বিমূঢ়ের মতো তাকিয়ে থাকলেন।
অবনীমোহন বলতে লাগলেন, রাজদিয়ায় আসবার আগে চাষবাদের কিছু কি জানতাম? করতে করতেই শিখে গেলাম।
হেমনাথ এবারও কী উত্তর দেবেন, ভেবে পেলেন না।
অবনীমোহনের দিকে পলকহীন তাকিয়ে ছিল বিনু। বাবাকে সে চেনে। তার মধ্যে কোথায় যেন একটা চঞ্চল যাযাবরের বাস, দুটো দিনও সেটা তাকে স্থির থাকতে দেয় না, নিয়ত ছুটিয়ে নিয়ে বেড়ায়।
যৌবনের শুরু থেকে কত কী-ই তো করছেন অবনীমোহন। অধ্যাপনা-ব্যবসা-চাকরি–একটা ধরেছেন, আরেকটা ছেড়েছেন। নির্ভর করার মতো কিছু হাতে পেলে মানুষ সেটা ঘিরেই জীবনকে সাজিয়ে তোলে। অবনীমোহনের স্বভাব আলাদা। অনিশ্চয়তার ভেতর ছুটে বেড়ানোতেই তার যত আনন্দ।
এই প্রৌঢ় বয়সে বসুন্ধরার এক কোণে অনেকখানি ভূমি পেয়েছেন তিনি, চারদিক শস্যে-স্বর্ণে পরিপুর্ণ। কোথায় পা পেতে বসে বাকি জীবন কাটিয়ে দেবেন, তা নয়। রক্তের ভেতরে সেই যাবারটা তাকে চঞ্চল করে তুলেছে।
তিন চার বছরের মতো রাজদিয়া তাকে মুগ্ধ, সম্মোহিত করে রেখেছিল। জল-বাংলার এই সরস শ্যামল জায়গাটার আর সাধ্য নেই অবনীমোহনকে ধরে রাখে। তার সম্মোহনের শক্তি ব্যর্থ হয়ে যেতে শুরু করেছে।
দিনকয়েক পর অবনীমোহন আসাম চলে গেলেন।
.
অবনীমোহন চলে যাবার পর সময় যেন ঝড়ের গতিতে ছুটতে লাগল। যুদ্ধের প্রথম দিকে দুর্ধর্ষ জার্মান বাহিনী সমস্ত পৃথিবীকে পায়ের নিচে নামিয়ে এনেছিল। এখন তারা পিছু হটছে। দিকে দিকে শোনা যাচ্ছে মিত্রশক্তির জয়ধ্বনি।
একদিন খরর এল, লাল ফৌজ বার্লিনে ঢুকে পড়েছে এবং জার্মানি আত্মসমর্পণ করেছে। পূর্ব গোলার্ধে এখনও আসর জমজমাট। হঠাৎ আরেক দিন খবর এল, হিরোসিমা নাগাসাকিতে পরমাণু বোমা পড়েছে। এবং এই দুটি বোমাই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ওপর যবনিকা টেনে দিল।
অবনীমোহন সেই যে খবরের কাগজ আনার ব্যবস্থা করে গিয়েছিলেন, এখনও তা চলছে। তিন মাস পর পর হেমনাথ টাকা পাঠিয়ে দেন, ডাকে খবরের কাগজ চলে আসে।
একদিন বিনু দেখল, প্রথম পাতা জুড়ে বড় বড় অক্ষরে খবর বেরিয়েছে? বিশ্বযুদ্ধের অবসান :
মিত্রপক্ষের নিকট জাপানের আত্মসমপর্ণ ও জাপ সম্রাটের ঘোষণা।
পটাসডাম ঘোষণার সমস্ত শর্ত স্বীকার। মিকাডো কর্তৃক পারমাণবিক বোমার ধ্বংসলীলার কথা উল্লেখ।
প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান ও মিস্টার এটলির বিবৃতি। প্রশান্ত মহাসাগরীয় মিত্রপক্ষ বাহিনীর প্রতি যুদ্ধ বন্ধ করার আদেশ।
নিউইয়র্ক, ১৫ই আগষ্ট-সম্রাট হিরোহিতো অদ্য বেতারে সরাসরি জাপ জাতির উদ্দেশে এই বক্তৃতায় বলেন যে, পটাসডাম চরমপত্র গ্রহণ করা হইয়াছে। জাতির উদ্দেশে সম্রাটের সরাসরি বক্তৃতা এই প্রথম।
একধারে ছোট হরফে আরেকটা খবর রয়েছে।
পরাজিত জাপানের প্রতি মিত্রপক্ষের প্রথম আদেশ জারি। জেনারেল ম্যাক আর্থারের প্রতি দূত প্রেরণের নির্দেশ। সামরিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলি মিত্রবাহিনী কর্তৃক দখলের আয়োজন।
তার তলায় আরেকটা খবর।
জাপানি সমর সচিবের আত্মহত্যা। যুদ্ধে পরাজয়ের জের।
লন্ডন, ১৫ই আগষ্ট–জাপানি নিউজ এজেন্সির খবরে প্রকাশ যে, জাপানের সমর সচিব কোরেচিকা আনামি গতরাত্রে তার সরকারি বাসভবনে আত্মহত্যা করেছেন।
কোথায় গ্রেট ব্রিটেন, কোথায় আমেরিকা, কোথায় নরওয়ে, কোথায়ই বা ফ্রান্স আর রাশিয়া। মিত্রবাহিনী জেতার ফলে সে সব জায়গায় নাকি উৎসবের স্রোত বয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধজয়ের ঢেউ অখ্যাত নগণ্য রাজদিয়াতেও এসে পড়ল।
