বাইরে অল্প অল্প বৃষ্টি পড়ছিল। হঠাৎ ঝুমঝুম আওয়াজে বিনুরা মুখ তুলে তাকাল।
চোখের সামনে থেকে কাগজ নামিয়ে হেমনাথ বললেন, এই বৃষ্টিতে আবার কে এল?
ততক্ষণে বিনু দেখতে পেয়েছে। উঠোনের মাঝখানে ঝিনুকদের ফিটনটা এইমাত্র এসে থামল।
বিনু বলল, মনে হচ্ছে, ভবতোষ মামা এসেছেন–
সত্যি, ভবতোষই। একটু পর তিনি ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালেন।
ভবতোষের দিকে তাকিয়ে সবাই চমকে উঠল। চুল এলোমেলো, চোখ দুটো লাল টকটকে এবং ফুলে ফুলে অস্বাভাবিক বড় হয়ে গেছে। মনে হয়, যে কোনও সময় সে দু’টো ফেটে ফিকি দিয়ে রক্ত ছুটবে। চোখের কোলে গাঢ় কালির ছাপ, কণ্ঠার হাড় ফুঁড়ে বেরিয়েছে। জামার বোম নেই, বুকটাও হাট করে খোলা, কেঁচার দিকটা অনেকখানি খুলে মাটিতে লুটোচ্ছে।
কেউ কিছু বলবার আগেই ভাঙা ভাঙা, ঝাঁপসা গলায় ভবতোষ বললেন, কাকাবাবু, আপনার বৌমা সেই লোকটার সঙ্গে পালিয়ে গেছে তার চোখ থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল পড়তে লাগল।
হেমনাথ চকিত হলেন, সে কী! বৌমা তাঁর বাপের বাড়ি ছিল না?
হ্যাঁ। ওখান থেকেই গেছে। আচ্ছা আমি যাই–বলেই প্রায় ছুটতে ছুটতে ফিটনটায় গিয়ে উঠলেন। হেমনাথ বিমূঢ়ের মতো একটুক্ষণ বসে থাকলেন। তারপর লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ডাকতে লাগলেন, ভব—ভব–
ভবতোষ সাড়া দিলেন না। ঝুমঝুম আওয়াজ কানে ভেসে এল। অর্থাৎ ফিটনটা চলতে শুরু করেছে।
কী করবেন, হেমনাথ যেন ভেবে পেলেন না। হঠাৎ তার চোখ এসে পড়ল বিনুর ওপর। দ্রুত শ্বাসটানার মতো করে বললেন, যা তো দাদা, ভব’র সঙ্গে যা। ছেলেটা আবার ঝোঁকের মাথায় এক কান্ড না করে বসে। সব সময় ওর কাছে থাকবি। যদি তেমন বুঝিস, আজ রাত্তিরে আর ফিরতে হবে না।
বিনু ছুটে গিয়ে যখন ফিটনটা ধরল, সেটা বাগান পেরিয়ে রাস্তার ওপর চলে এসেছে।
ভবতোষ বললেন, এই বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে তুমি আবার এলে কেন?
বিনু ভয়ে ভয়ে বলল, দাদু পাঠিয়ে দিলেন।
শব্দ করে অদ্ভুত হাসলেন ভবতোষ, কাকাবাবুর ভয়, আমি বুঝি আত্মহত্যা করব। তা বোধহয় করব না। আচ্ছা, এসেছ যখন, ওঠ–
বিনু গাড়িতে উঠল।
তারপর চমকপ্রদ ব্যাপারটা ঘটল। পথে যত বাড়ি পড়ল সব জায়গায় গাড়ি থামিয়ে জড়িত ভাঙা গলায় স্ত্রীর চলে যাবার কথা বলতে লাগলেন ভবতোষ। মানুষের বেদনা প্রকাশের রূপ কী বিচিত্র!
সারা রাজদিয়ায় ঘুরে ভবতোষ যখন তার বাড়ি ফিরলেন তখন অনেক রাত। বাকি রাতটুকু কেউ আর ঘুমলো না। বিনুকে সামনে বসিয়ে সামনে স্ত্রীর কথা বলে যেতে লাগলেন ভবতোষ। সমস্ত শুনে বিনু যা বুঝল, সংক্ষেপে এইরকম।
বিয়ের আগেই ঝিনুকের মায়ের সঙ্গে একজনের ভালবাসা ছিল। তা সত্ত্বেও তার বাপ-মা একরকম জোর করেই ভবতোষের সঙ্গে তার বিয়ে দিয়েছেন। এ বিয়ে মেনে নিতে পারেন নি ঝিনুকের মা, সংসারে নিয়ত ঝগড়াঝাটি, অশান্তি লেগেই ছিল। পরিণামে একদিন তিনি বাপের বাড়ি ফিরে গেলেন। আজ সকালে খবর এসেছে, ভালবাসার সেই লোকটির সঙ্গে তিনি চলে গেছেন।
সমস্ত রাত ভবতোষের কাছে কাটিয়ে সকালবেলা বাড়ি ফিরল বিনু। ফিরেই দেখল, একা একা বসে ঝিনুক কাঁদছে।
থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল বিনু। ঝিনুককে দেখতে দেখতে মমতায় তার মন ভরে যেতে লাগল। অনেকক্ষণ পর আস্তে আস্তে ঝিনুকের পাশে গিয়ে বসল সে। খুব কোমল গলায় বলল, কেঁদো না ঝিনুক, কেঁদো না–
দু’হাতে মুখ ঢেকে ঝিনুক ফেঁপাতে লাগল, আমার মা চলে গেছে।
বিনু বলল, আমার কথা একবার ভাবো তো, আমারও মা নেই।
মুখ থেকে হাত সরিয়ে জলভরা গভীর চোখে বিনুর দিকে তাকাল ঝিনুক।
.
২.৪৯
সুধা সুনীতি ফেরানো যাক, টার টানে সবাই
আরও একটা বছর ঘুরে গেল। এর মধ্যে বিনু ম্যাট্রিক পাস করে রাজদিয়া কলেজে ভর্তি হয়ে গেছে। ঝিনুক ক্লাস নাইনে পড়ছে।
সুরমার মৃত্যুর পর অনেক দিন এই বাড়ির ওপর দিয়ে উদাস হাওয়া বয়ে যাচ্ছিল। তখন বিনুর মনে হত, পৃথিবীর আহ্নিক গতি, বার্ষিক গতি বুঝি চিরদিনের জন্য থেমে গেছে। মনে হত, চোখের সামনের দৃশ্যময় জগতের কোথাও উজ্জ্বল রং নেই। সব দীপ্তিহীন, ধূসর হয়ে গেছে।
ধীরে ধীরে দুঃখের তীব্রতা কমে এসেছে। শোকটা এখন আর অনুভূতিতে নেই, স্মৃতি হয়ে গেছে।
সুধা নেই, সুনীতি নেই, সুরমা মৃত। একদিন এই বড়িটা ঘিরে সব সময় যেন উৎসব লেগে থাকত। হিরণ আসত, আনন্দ আসত, রুমা ঝুমারা আসত। জাপানি বোমার ভয়ে যারা দেশে পালিয়ে এসেছিল, তারা আসত। গান-বাজনা-নাটক এবং হুল্লোড়ে বাড়িটা গমগম করত।
ভরা কোটালের পর প্রবল ভাটার টানে সবাই অদৃশ্য হয়ে গেছে। বাড়িটা আজকাল আশ্চর্য নিঝুম।
যেদিকেই চোখ ফেরানো যাক, শুধুই শূন্যতা।
সুধা সুনীতি সেই যে কলকাতায় চলে গিয়েছিল, তারপর আর রাজদিয়ায় আসে নি। মাঝে মাঝে এক আধখানা-চিঠি লিখে সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখছে শুধু।
সুধা সুনীতির কথা থাক, নতুন সংসার পেয়ে তারা বিভোর হয়ে আছে। এখান থেকে যাবার পর ঝুমাটা খুব চিঠি লিখত বিনুকে সপ্তাহে দু’টো করে। কবে থেকে চিঠি আসা কমতে কমতে একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে, বিনু লক্ষ করেনি।
সময়টা জ্যৈষ্ঠের শেষাশেষি। বাগামৈর আমগাছগুলো কবেই নিঃস্ব হয়ে গেছে, ডালে ডালে পাতা ছাড়া আর কিছুই নেই। কালোজাম, গোলাপজাম, রোয়াইল আর লটকা–ফলের গাছগুলোরও এক অবস্থা। শুধু আষাঢ়ে আমগাছগুলো সারা গায়ে কিছু কিছু ফল সাজিয়ে রেখেছে। তবে বেতঝোঁপের দিকে তাকালে চোখ জুড়িয়ে যায়, হালকা বাদামী রঙের গোল গোল থোকা থোকা বেতফলে ঝোঁপগুলো ছেয়ে আছে।
