দিনের বেলায় একটা দৃশ্য প্রায়ই চোখে পড়ে বিনুর। সুরমাকে যেখানে পোড়ানো হয়েছে তার পাশেই উঁচু বাজে-পোড়া সুপুরি গাছটার মাথায় সমস্ত দিন একটা শঙ্খচিল ডানা মুড়ে বসে থাকে, সন্ধে হলেই পাখিটা উড়ে যায়।
শুধু দিনের বেলাতেই না, রাত্তিরেও ওই পৈঠেটিতে বসে থাকে বিনু। তার চোখের সামনে একটি দুটি করে তারা ফুটতে ফুটতে সমস্ত আকাশ ছেয়ে যায়। একসময় চাঁদও ওঠে।
রাজদিয়ায় আসায় পর হেমনাথ তাকে নক্ষত্র চিনিয়েছিলেন। ওই তারটা অরুন্ধতী, ওইটা লুব্ধক, ওইটা শতভিষা। ছেলেবেলায় মায়ের কছে বিনু শুনেছিল, মানুষ মরে গেলে নাকি আকাশের তারা হয়ে যায়। ওই সূদুর জোতিষ্কলোকের কোন তারাটি তার মা, কে জানে।
প্রায় রোজই ঝিনুক তার পাশে এসে নিঃশব্দে বসে পড়ে। কখন যে মেয়েটা আসে, টেরও পাওয়া যায় না। হঠাৎ একসময় আধফোঁটা ঝাঁপসা গলায় সে ডেকে ওঠে, বিনুদা
বিনু মুখ ফেরায় না। উদাস গলায় বলে, কী বলছ?
পিসিমার জন্যে তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে, না?
বিনু চুপ।
ঝিনুক আবার বলল, জানো বিনুদা, মায়ের জন্যে আমারও খুব কষ্ট হয়।
হঠাৎ বিনু ভাবে, ঝিনুকের সঙ্গে এক জায়গায় তার ভারি মিল। মেয়েটাকে বড় আপনজন মনে হয়।
.
২.৪৮
সুরমার মৃত্যুর কারণে অনেক দিন স্কুল কামাই হয়েছে। প্রায় মাসখানেক পর আজ স্কুলে গেল বিনু।
সেটেলমেন্ট অফিসের কাছে আসতে ঝুমার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। আচমকা বিনুর মনে পড়ল, মায়ের মৃত্যুর পর রাজদিয়ার সব মানুষ তাদের বাড়ি গেছে। শুধু ঝুমা বাদ।
ঝুমা বলল, তুমি খুব রোগা হয়ে গেছ বিনুদা।
আবছা কী উত্তর দিয়ে বিনু বলল, মা স্বর্গে গেল। তুমি তো আমাদের বাড়ি একদিনও এলে না?
দুই হাত এবং মাথা জোরে জোরে নেড়ে ঝুমা বলল, তোমাদের বাড়ি গেলেই তো কান্নাকাটি, ও সব আমার ভাল লাগে না।
পলকে মুখোন মলিন হয়ে গেল বিনুর। মনে হল, ঝুমা বড় দূরের মানুষ।
সুরমার মৃত্যুর মাস দুই পর সুনীতিকে নিয়ে আনন্দ কলকাতায় চলে গেল। তাদের সঙ্গে শিশিররাও গেলেন। কলকাতার অবস্থা নাকি এখন ভাল। জাপানি বোমার ভয়ে যারা পালিয়ে গিয়েছিল তারা সব ফিরে যেতে শুরু করেছে সেখানে।
যাবার আগের দিন সুনীতিরা দেখা করতে এসেছিল। ঝুমাও এসেছিল ওদের সঙ্গে।
আড়ালে ডেকে নিয়ে ঝুমা বিনুকে বলেছে, আমরা যাচ্ছি। কলকাতায় গিয়ে চিঠি দেব। তুমিও কিন্তু চিঠি লিখবে।
আস্তে ঘাড় কাত করেছে বিনু।
সুনীতিরা চলে যাবার পর দু’টো সপ্তাহও কাটল না। একদিন সকালবেলা হিরণ এসে হাজির।
হেমনাথ বাড়িতেই ছিলেন। বললেন, কী ব্যাপার হিরণচন্দ্র?
একটা কথা ছিল দাদু—
নির্ভয়ে বলে ফেল।
খানিক ইতস্তত করে ঘাড় চুলকোতে চুলকোতে হিরণ বলল, আমি কলকাতায় একটা ভাল চাকরি পাচ্ছি দাদু–
হেমনাথের ভুরু কুঁচকে গেল, কিসের চাকরি?
ওয়ারের। অফিসার র্যাঙ্কের চাকরি। নেব? হিরণের চোখ চকচক করতে লাগল।
হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে উঠলেন হেমনাথ, ওয়ারের চাকরি নিবি বলেই কি তোকে লেখাপড়া শিখিয়েছিলাম? তুই চলে গেলে কলেজের কী হবে? ছি ছি, লোভটাই বড় হল!
হিরণের মুখ কালো হয়ে গেল।
এর পর অনেকক্ষণ গুম হয়ে বসে থাকলেন হেমনাথ। বুঝলেন, হিরণকে আটকাবার চেষ্টা বৃথা। যুদ্ধের চাকরি তার অসীম শক্তি দিয়ে হিরণকে রাজদিয়া থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যাবেই। এক সময় গম্ভীর গলায় হেমনাথ বললেন, ইচ্ছা যখন হয়েছে, যাও। তবে এতে আমার ভীষণ আপত্তি-হেমনাথকে খুবই ক্লান্ত দেখাচ্ছে। খুবই হতাশ আর করুণ।
দিনকয়েক পর সুধাকে নিয়ে কলকাতায় চলে গেল হিরণ।
.
দেখতে দেখতে আরও ক’মাস কেটে গেল।
সুরমা নেই। সুধা সুনীতি চলে গেছে। হেমনাথের বাড়িটা এখন নিঝুম। কিছুদিন আগেও হই চই, হুল্লোড় এবং জীবনের নানা প্রাণবন্ত খেলায় এ বাড়িতে সব সময় উৎসব লেগে থাকত। এখন বাড়িটা ঘিরে অপার শূন্যতা নেমে এসেছে যেন।
মাঝে মাঝে শিবানী আর স্নেহলতা সুরমার জন্য বিনিয়ে বিনিয়ে কাঁদেন। অবনীমোহন আর হেমনাথ উদাস চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে বসে থাকেন।
এখন বর্ষা।
মেঘ-বৃষ্টি-বাজ আর ঘন ঘন বিদ্যুৎচমক–চতুরঙ্গে আকাশ সারাদিন সেজেই আছে। ক’বছর ধরেই বিনু দেখেছে, বর্ষা নামলেই পুকুরের ওপারের মাঠ ভেসে যায়। তার মাঝখানে কৃষাণ-গ্রামগুলো দ্বীপের মতো কোনওরকমে মাথা তুলে থাকে। মাটির তলায় কোথায় যে শাপলা শালুক আর পদ্মের বীজ লুকিয়ে থাকে, কে বলবে। জল পড়লেই লাফ দিয়ে তারা বেরিয়ে আসে। সাদা সাদা শাপলা ফুলে, থালার মতো বড় বড় গোল পদ্মপাতায় আর লাল টুকটুকে শালুকে জলপূর্ণ চরাচর ছেয়ে যায়। গাঢ় সবুজ রঙের ধান আর পাটের চারাগুলো বর্ষায় জলের ওপর দিয়ে মাথা তুলে থাকে। মাঝে মাঝে এক আধটা নিঃসঙ্গ বউন্যা গাছ, কোথাও বা হিজলের সারি।
এবারও তার ব্যতিক্রম নেই। উত্তরে-দক্ষিণে-পুবে-পশ্চিমে, যেদিকেই তাকানো যাক, চোখ জুড়ে বর্ষার সেই পরিচিত জলছবি।
সেদিন সন্ধেবেলা বিনু আর ঝিনুক পুবের ঘরে পড়তে বসেছিল। সামনে আড়াই-তলা পিলসুজে রেড়ির তেলের প্রদীপ জ্বলছে। অবনীমোহন এবং হেমনাথও এ ঘরেই ছিলেন। আজকের স্টিমারে যে খবরের কাগজখানা এসেছে, দু’জনে ভাগাভাগি করে পড়ছেন। সুরমার মৃত্যুর পর কাগজ নিয়ে আজকাল আর এ বাড়িতে আসর বসে না।
