হিরণ বলল, ও কি এখন চলে যাবে?
হ্যাঁ।
ভবতোষ ইতিমধ্যে ফিটনে উঠে বসেছেন। ঝিনুককে তার পাশে বসিয়ে দিতে দিতে হিরণ বলল, সারাদিন তো রইলাম, ভবদা’র গাড়িতে আমি বরং চলেই যাই ঠাকুমা।
উঁহু–
কেন, আর কোনও কাজ আছে?
কাজ নেই। তবে তোমার যাবার হুকুমও নেই।
দাদু না এলে ছাড়া পাব না?
না।
অগত্যা।
ফিটন চলতে শুরু করল। দেখতে দেখতে উঠোন বাগান পেরিয়ে ঝিনুকরা রাস্তায় গিয়ে উঠল। আর অবনীমোহনরা ধীরে ধীরে ফিরে এলেন।
ঘরে এসে স্নেহলতা বললেন, ভবতোষের বৌর মতো মেয়েছেলে জীবনে আর দেখিনি। সংসারটা একবারে ছারখার করে দিলে।
সুরমা বললেন, কী এমন হয়েছে যে, স্বামীর সঙ্গে ঘর করবে না!
সন্ধে হয়ে এল, এসময় ওই অলক্ষ্মীর কথা থাক।
ভবতোষরা চলে গেছেন, এ বাড়ির ওপর গাঢ় বিষাদ এখনও অনড় হয়ে আছে। বিনু কাতোর কথা শুনছিল না, জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। সেই সকাল থেকে দাদুর ভাগ নিয়ে, মাছের ভাগ নিয়ে, কলা আর রসগোল্লার ভাগ নিয়ে সমানে হিংসা করেছে ঝিনুক। তবু হিংসুটি মেয়েটার জন্য বিনুর মন খুব খারাপ হয়ে গেল।
একটু পর সন্ধে নেমে এল।
মাঝে মাঝে ঝিরঝিরে এক-আধ পশলা বৃষ্টি ছাড়া শরতের দিনটা ছিল বেশ নির্মল। তার গায়ে ছিল নরম সোনালি আভা মাখানো। দেখতে দেখতে জলে কালি গুলে দেবার মতো হাওয়ায় হাওয়ায়। কেউ বুঝি কালচে রং মিশিয়ে দিতে লাগল। এই রং মেশানোর খেলাটা চলল অনেকক্ষণ। তারপর অন্ধকার গাঢ় হয়ে ঝপ করে একসময় রাত্রি নেমে গেল।
কলকাতার ফেনায়িত কলরব থেকে এত দূরে বিজলি আলোর দাক্ষিণ্য এসে পৌঁছয়নি। জানালার বাইরে যতদূর চোখ যায়, গাছপালা ঝাঁপসা দেখাচ্ছে। তৃতীয় ঋতুর এলোমেলো বাতাসে সুপারি বন অল্প অল্প দোল খাচ্ছে, আম বাগানটাকে কেমন ভুতুড়ে মনে হয়। পুকুরটাকে আর চেনাই যায়। না। তার ওপারে ধানখেতে মিটমিটিয়ে জোনাকি জ্বলছে আর নিবছে, নিবছে আর জ্বলছে। দিগন্ত পর্যন্ত ধানের মাঠটা যেন একখানা জামদানি শাড়ি, জোনাকিরা তার গায়ে আলোর চুমকি।
স্নেহলতা ইতিমধ্যে ঘরে ঘরে হেরিকেন জ্বালিয়ে দিয়ে গেছেন। তা ছাড়া কাঠের তিনতলা পিলসুজে রেড়ির তেলের আলোও জ্বলছে। তবু ঘরগুলো পুরোপুরি আলোকিত নয়, এ কোণে ও কোণে অন্ধকার যেন জুজুবুড়ি হয়ে বসে আছে।
সেই পুবদুয়ারী ঘরখানায় অবনীমোহন সুধা সুনীতি আর বিনু এখনও বসে আছে। স্নেহলতা শিবানী রান্নাঘরে, রাতের জন্য আনাজ টানাজ কুটছেন। সুরমা কাছাকাছি বসে এ গল্প সে গল্প করছেন। এতকাল পর মামী মাসিকে পেয়ে কথা আর তার ফুরোচ্ছে না।
জানালার বাইরে চোখ মেলেই ছিল বিনু। ধানখেতে জোনাকির নাচানাচি ওড়াওড়ি ছাড়াও মাঝে মাঝে আরও কিছু আলো ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছিল। ওগুলো কিসের আলো বুঝতে পারছিল না সে।
জোনাকি আর মাঝে মাঝে ধানখেতে আলোর ওই বিন্দু ক’টি ছাড়া চারধারে শুধু অন্ধকার গাঢ়, অথৈ, অতল আঁধার।
পূর্ব বাংলার এই সুদূর প্রান্তে এত অন্ধকার জমা হয়ে থাকবে আর সন্ধে নামতে না নামতেই ঝুপ ঝুপ করে চারদিক থেকে ঘিরে ধরবে, কে ভাবতে পেরেছিল। কলকাতায় রাত্রি টেরই পাওয়া যায় না। সন্ধে হবার সঙ্গে সঙ্গে আলোর ফোয়ারা ছুটে যায়। আলোকিত নিশীথের যে স্বপ্নময়তা–চিরদিন তাতেই অভ্যস্ত বিনু। কিন্তু এখানকার রাত্রি প্রতি মুহূর্তে বুঝিয়ে দিচ্ছে, সে আছে। সে আছে আকাশ বাতাস জল স্থল, সব কিছুর ওপর ব্যাপ্ত হয়ে। শুধু অচেতন জড় পৃথিবীর ওপর নয়, বুঝিবা জীব জগতের অস্তিত্বের ভেতর, তার গভীর মর্মমূল পর্যন্ত এই রাত্রি ছাড়িয়ে আছে। পূর্ব বাংলার অন্ধকার কোনওদিন ফুরোবে না। আজকের রাত শেষ হয়ে দিনের আলো আবার দেখা দেবে, এমন ভরসা মনের কোথাও খুঁজে পেল না বিনু।
খুব কাছ থেকে কে যেন ফিসফিসিয়ে ডাকল, ছুটোবাবু—
বিনু চমকে উঠল। ভয়ও পেয়ে গেল খুব। চেঁচিয়েই উঠত, তার আগেই দেখতে পেল, জানালার ঠিক ওধারে একটু কোণের দিকে ভূতের মতো যে দাঁড়িয়ে আছে সে যুগল।
চোখাচোখি হতেই যুগল আগের সুরেই বলল, আসেন—
কোথায় যাব?
আসেন না—
বাইরে বড় অন্ধকার।
আন্ধারে ডর লাগে নিকি? কেমন করে যেন হাসল যুগল।
ভয়ের কথায় পৌরুষে খোঁচা লাগল। গম্ভীর গলায় বিনু বলল, মোটেও না।
তয় আইসা পড়েন।
অবনীমোহনরা কথা বলছিলেন। ওবেলার মতো চুপিসারে বেরিয়ে যাচ্ছিল বিনু, হঠাৎ সুধার চোখে পড়ে গেল।
সুধা বলল, এই কোথায় যাচ্ছিস রে?
বিনু বলল, বাইরে।
অবনীমোহন হিরণের সঙ্গে কথা বলতে বলতে মুখ ফেরালেন, বাইরে কী?
একটু চুপ করে থেকে বিনু বলল, যুগল ডাকছে।
যুগলের সঙ্গে খুব খাতির দেখছি। আচ্ছা যা—
বিনু ছুট লাগাতে যাচ্ছিল, সুধা বাধা দিল, না, যেতে হবে না। ওই ঘুরঘুট্টি অন্ধকারে গিয়ে এক কান্ড করে বসো, আর আমরা তোমাকে নিয়ে পাগল হয়ে যাই–
বাধা পেয়ে বিনু খেপে গেল। চোখ দিয়ে আগুনের হলকা ছুটতে লাগল যেন। স্টিমারঘাটে পারে নি, এখন তার পুরোপুরি শোধটুকু তুলে নিল। জিভ ভেংচে টেনে টেনে বলল, পাগল হয়ে যা-ই! চুপ কর বাঁদরী। তোর বেশি ওস্তাদি করত হবে না।
সুধা আর বিনুর মধ্যে সম্পর্কটা নিয়ত শত্রুতার, চোখাচোখি হলেই তাদের যুদ্ধ। মাঝে মাঝে সন্ধি অবশ্য হয়, কিন্তু তা সাময়িক। দু’চার ঘন্টার বেশি তার আয়ু নয়। তারপরেই সব চুক্তি, সব শর্ত ছুঁড়ে দিয়ে তারা পরস্পরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। বারুদ সব সময় কামানে পোরাই আছে, যে কোনও কারণে যে কোনও সময় যুদ্ধ ঘোষণা হয়ে যেতে পারে।
