সমস্ত বাড়িখানা জুড়ে কান্না ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। সুধা সুনীতি সুরমার অসাড় বুকে মুখ গুঁজে অবোধ শিশুর মতো কাঁদছিল, তুমি আমাদের ফেলে কোথায় গেলে মা!
সুরমার শিয়রের কাছে বসে ছিলেন স্নেহলতা আর শিবানী। সজল চোখে ভাঙা ভাঙা গলায় তারা বলছেন, আমাদের দাবি বলেই কি এতদিন পর রাজদিয়ায় এসেছিলি মা!
একধারে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল ঝিনুক। আরেক ধারে হেমনাথ এবং অবনীমোহন ঘন ঘন হাতের পিঠে চোখ মুছছিলেন। তাঁদের চোখ ফোলা ফোলা, আরক্ত, জলপূর্ণ।
এত কান্নার মাঝখানে বিনু কিন্তু একটুও কাঁদতে পারছিল না। বুকের ভেতর পাষাণভারের মতো কী যেন চেপে আছে। চোখ ফেটে যাচ্ছে, কিন্তু এক ফোঁটা জলও বেরুচ্ছে না। এত লোকজন, এত কান্না, শোকোচ্ছাস কিছুই যেন শুনতে পাচ্ছিল না সে। কিছুই দেখতে বা বুঝতে পারছিল না। বিনুর সমস্ত অনুভূতি বুঝিবা অসাড় হয়ে গেছে।
দেখতে দেখতে বিকেল হয়ে গেল।
ওদিকে কারা যেন কুড়োল দিয়ে বাগানের বুড়ো একটা আমগাছ কেটে ছোট ছোট খন্ড করে ফেলল। তারপর পুকুরের ওপারে উঁচুমতো জায়গাটায় চিতা সাজাল।
এদিকে স্নেহলতা সিঁদুরে-চন্দনে এবং রাশি রাশি ফুলে সুরমাকে সাজিয়ে দিলেন। তারপর কারা যেন হরিধ্বনি দিয়ে তাকে কাঁধে তুলে পুকুরপাড়ের দিকে নিয়ে গেল। হেমনাথ বিনুর একটা হাত শক্ত করে ধরে শবযাত্রীদের সঙ্গে সঙ্গে চললেন। সুধা-সুনীতি-স্নেহলতা-শিবানী-অবনীমোহন-কেউ বাড়িতে থাকল না। সবাই চলেছে আর অভিভূতের মতো বুক ফাটিয়ে কাঁদছে।
বিনুর মনে হল, সে যেন মাটির ওপর দিয়ে হাঁটছে না; হাওয়ার ভেতরে ভারহীন হালকা শরীর নিয়ে ভাসতে ভাসতে যাচ্ছে।
চিতায় তুলবার আগে সুরমাকে স্নান করিয়ে নতুন কাপড় পরানো হল, পুরুত জোরে জোরে মন্ত্র পড়ে যাচ্ছিল। শব্দগুলো কানে আসছিল ঠিকই, কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছিল না বিনু।
একটু পর সুরমাকে চিতায় তোলা হল। এবার মুখাগ্নির পালা। বিনুকেই তা করতে হবে। কে যেন সাদা ধবধবে একগোছ পাটশালার মাথায় আগুন ধরিয়ে তার হাতে দিল। হেমনাথ তাকে ধরে চিতার চারধারে প্রদক্ষিণ করাতে লাগলেন। পুরুতটা মন্ত্র পড়তে পড়তে আগে আগে চলতে লাগল। বিনুর মনে হতে লাগল, তার চারপাশে সমস্ত চরাচর যেন দুলছে।
চিতাটাকে ক’বার প্রদক্ষিণ করেছে, বিনু মনে করতে পারল না। একসময় পুরুতের কথায় মন্ত্রচালিতের মতো সুরমার মুখে পাট কাঠির আগুন ছোঁয়াল।
শবযাত্রীরা চারদিক থেকে চিৎকার করে বলতে লাগল, বল হরি–
হরি বোল—
তারপরেই চিতার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল।
কতক্ষণ আর? চৈত্র মাসের রাত গাঢ় হবার আগেই সুরমার রুগ্ণ শীর্ণ দেহ চিতাধূমে বিলীন হয়ে গেল।
আগুন নিবে গেলে চিতা ধুয়ে শবযাত্রীরা পুকুরঘাটে স্নান করল। বিনুকেও স্নান করানো হল, তারপর নতুন কোরা কাপড়ের তেউনি পরানো হল তাকে, গলায় লোহার চাবি-বাঁধা ধড়া ঝুলিয়ে দেওয়া হল, হাতে দেওয়া হল একটুকরো কম্বলের আসন।
পরদিন থেকে শুরু হল হবিষ্যি। ঘরের এক কোণে নিজের হাতে নতুন মালসায় আলো চালের একসেদ্ধ ভাত রাঁধে বিনু। কাছে বসে সজল চোখে দেখিয়ে দেন স্নেহলতা। রাতে একটু দুধ আর ফলটল খেয়ে খালি মেঝেতে এক টুকরো নতুন কাপড় পেতে শুয়ে পড়ে।
রাজদিয়ার সব বাড়ি থেকে হবিষ্যির উপকরণ পাঠাচ্ছে–আলো চাল, কাঁচা দুধ, সর বাটা ঘি, আলু, কাঁচকলা ইত্যাদি।
দেখতে দেখতে শ্রাদ্ধ চুকে গেল। শ্রাদ্ধের পরদিন মৎস্যমুখী। রাজদিয়ার হেন মানুষ নেই যে সুরমার শ্রাদ্ধে না এসে পেরেছে।
বিনুদের সংসারে এই প্রথম মৃত্যু। একটি মৃত্যুই বিনুর চোখে জগতের রূপ একেবারে বদলে দিয়ে গেছে।
এখন, এই চৈত্র মাসে হিজলগাছগুলো ফুলে ফুলে ছেয়ে যেতে শুরু করেছে। কাউগাছের ডালে ডালে গুটি ধরেছে। মান্দার আর শিমুল গাছগুলো সারা গায়ে থোকা থোকা আগুনের মতো লাল টুকটুকে ফুল ফুটিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বাগানের আমগাছগুলোতে গাঢ় সবুজ রঙের আম লম্বা বোঁটায় সারাদিন দোল খাচ্ছে। পরিষ্কার করে মুছে দেওয়া আয়নার মতো আকাশটা ঝকমকে। সকালে-দুপুরে বিকেলে, পুকুরের ওপারে শূন্য মাঠের ওপর কত রকমের পাখি যে উড়তে থাকে–কানিবক, পানিকাউ, টিয়া, বুলবুলি, ধবধবে গো-বক।
যেদিকেই চোখ ফেরানো যাক, এখন শুধুই রঙের সমারোহ। লালে নীলে সবুজে অপরূপ এই বসুন্ধরা বিনুকে আজকাল আর আকুল করে না। যুগল চলে যাবার সময় ধানের খেত, শাপলা বন, জলসেঁচি শাকের ঘন জঙ্গল, উলু খড়ের বন, কেয়া ঝোঁপ, বেত ঝোঁপ, বনতুলসীর চাপ চাপ অরণ্য– জল-বাংলার সজল শ্যামল ভূখন্ডের সবটুকুর উত্তরাধিকার তার হাতে তুলে দিয়ে গিয়েছিল। এই সেদিনও একা একা শূন্য মাঠে আলপথ ধরে মোহাচ্ছান্নের মতো হেঁটে যেতে তার ভাল লাগত। আকাশ জুড়ে ফিনফিনে পাতলা ডানায় ফড়িংদের ওড়াওড়ি দেখতে দেখতে মুগ্ধ হয়ে যেত। চনচনে সোনালি রোদ, উলটোপালটা বাতাস, গাছপালা, বনানী, নরম তৃণদল–সব যেন যাদুকরের মতো তাকে সম্মোহিত করে ফেলত।
কিন্তু আজকাল সারা দিনই প্রায় পুবের ঘরের পৈঠেয় চুপচাপ বসে থাকে বিনু। পুকুরের ওপারে ধু ধু দক্ষিণের চক, অনেক দূরের দিগন্ত, আকাশ, বনভূমি–সব মিলিয়ে যেন এক অপরিচিত মহাদেশ। ওখানকার কোনও কিছুই সে জানে না, চেনে না। কোনওদিন ওখানে সে যেন যায় নি, যাবার আকর্ষণও বোধ করে না।
