চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঝুমা বলতে লাগল, যা সেজেছ, এখন কারোর সঙ্গে মালাবদল করিয়ে দিলেই হয়–
বিনুর আড়ষ্টতা কেটে গিয়েছিল। হাসতে হাসতে বলল, আমার আপত্তি নেই। একজন যদি রাজি থাকে আজই’ বলে চোখের তারায় ইঙ্গিত করল।
ইঙ্গিতটা বুঝেছে ঝুমা। ঝঙ্কার দিয়ে বলল, আহা-হা, আহ্লাদ কত–
বিনু হাসতেই লাগল।
ঝুমা আবার বলল, ওবেলা তোমাদের বাড়ি যাচ্ছি।
বরযাত্রীদের সঙ্গে?
হ্যাঁ, বাসর জাগব। তোমাকেও জাগতে হবে।
নিশ্চয়ই।
বাসরে তোমার কী হাল করি, দেখো।
দেখব।
একটু ভেবে ঝুমা বলল, বাসর তো সেই রাত্রিবেলায়। তখন যা হবার হবে। এখন একটু মজা করি।
বিনু ভয়ে ভয়ে বলল, কী করবে?
উত্তর না দিয়ে ছুটে কোথায় চলে গেল ঝুমা। পরক্ষণেই ফিরে এসে বিনু কিছু বুঝবার আগেই এক গাদা হলুদ তার নাকে-মুখে, ধুতি-পাঞ্জাবিতে মাখিয়ে দিল।
বিনু বলতে লাগল, কী করছ! কী করছ!
ঝুমা বলল, একদিন তো মাখতেই হবে। মাখলে কেমন লাগে আগেই দেখে নাও—
.
গোধুলি লগ্নে বিয়ে। বেলা থাকতে থাকতে দুই বর এসে পড়ল। বেশিক্ষণ তাদের বসতে হল না, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বিয়ের আসরে নিয়ে যাওয়া হল। সানাই ঢোল কঁসি আর শাঁখের বাজনা, ঘন ঘন উলুধ্বনি–এর মধ্যে পর পর দুই মেয়েকে সম্প্রদান করলেন অবনীমোহন। সাত পাক ঘোরাবার সময় এয়োরা গান ধরল:
আমতলায় ঝামুর ঝুমুর কলাতলায় বিয়া,
আইল গো সুন্দরীর জামাই মুকুট
মাথায় দিয়া।
মুকুটের তলে তলে চন্দনের ফোটা।
চল সখী সবাই মিলা জামাই বরি গিয়া।
ও রাধে ঠমকে ঠমকে হাটে।
শ্যামচাঁদের পাছে য্যামন ময়ুরে প্যাখম ধরে।
আগে যায় গো শ্যাম রাজা।
পাছে যায় গো রাধা,
তারও পাছে যায় গো পুরুত
ভৃঙ্গার হাতে লইয়া।
এক পাক, দুই পাক, তিন পাকও যায়,
সাত পাক দিয়া রাধা নয়ন তুইলা চায়।
বিয়ের আসর থেকে সোজা বাসর ঘরে। পাশাপাশি দুই বাসর ঘর সাজানো হয়েছে। সেখানে শুধু মেয়েদের ভিড়। ঠাট্টা, ঠিসারা, বিদ্যুৎচমকের মতো হাসাহাসি, ঠেলাঠেলি–এর মধ্যেই দুই ঘরে চাল খেলা, যো-খেলা হয়ে গেল। তারপর শুরু হল জামাই নাজেহাল করা ধাঁধা। ধাঁধার পর স্নেহলতা রঙ্গিণী মুর্তি ধরলেন। দুই বাসরে ঘুরে ঘুরে মাথায় আড়-ঘোমটা টেনে মাজা বাঁকিয়ে গাইতে লাগলেন:
ওগো বর, এলাম তোমার বাসরে।
একটা গান গাও না শুনি,
গান যদি না গাও, আমার নাতনীর
ধর পাও,
নহিলে মিলবে না সোনার চাঁদবদনী।
এত ভিড়ের ভেতর ছুঁচের পেছনে সুতোটির মতো বিনুর পেছনে ঝুমা লেগেই আছে। আর ঝিনুক? জল খেলা, চাল খেলা, ধাঁধা, নাচ গান, ঠাট্টা, রগড়-কিছুই যেন বুঝতে পারছিল না সে। পলকহীন কুমা আর বিনুর দিকে তাকিয়ে ছিল সে।
এ বিয়ের আরও একটি দিক আছে। সেটা এরকম। হেমনাথ রাজ্যসুদ্ধ লোককে নেমন্তন্ন করে এসেছিলেন, বিয়ে দেখার নেমন্তন্ন। কিন্তু খাবার জন্য তাদেরই ডেকেছিলেন যারা দেশজোড়া আকালে আর মন্বন্তরে একটু ফ্যানের আশায় রাজদিয়ার রাস্তায় রাস্তায় প্রেতমুর্তির মতো ঘুরে বেড়ায়।
সন্ধে থেকে হেমনাথ তাদের সামনে দাঁড়িয়ে তদারক করে খাওয়াচ্ছিলেন।
সকাল থেকে লারমোর এ বাড়িতে আছেন। তিনি বলছেন, এ কী করছ হেম! না খেয়ে খেয়ে ওদের পেট মরে গেছে। তার ওপর ভালমন্দ পড়লে আর দেখতে হবে না। সটান যমরাজার দরবারে গিয়ে হাজির হবে।
হেমনাথ বলেছেন, এমনি মরবে, অমনিও মরবে। না খেয়ে মরে কী হবে, খেয়েই মরুক।
খাওয়া দাওয়া যখন শেষ হয়ে এসেছে সেই সময় গদু চক্কোত্তি এসে হাজির। যুগলের বৌভাতে সে এসেছিল, তারপর এই দেখা গেল। চেহারা খুব খারাপ হয়ে গেছে গদুর। বুকের হাড়গুলো গুনে নেওয়া যায়, চোখ এক ইঞ্চি ভেতরে ঢুকে গেছে।
হেমনাথ বললেন, তোমার এ কী হাল হয়েছে চক্কোত্তি!
গদু চক্কোত্তি বলল, আর কইয়েন না হ্যাম কত্তা, না খাইয়া খাইয়া শরীল গ্যাল। যা আকাল পড়ছে হেয়াতে (তাতে) কেউ আর খাইতে দ্যায় না। আগে মাইষে আনন্দ কইরা খাওয়াইত, অহন আমারে দেখলে মুখ ফিরাইয়া লয়। যা দুদ্দশা, তাগোই বা দুষ (দোষ) কী?
সে তো ঠিকই। অনেক রাত হয়ে গেছে, হাত মুখ ধুয়ে খেতে বসে যাও।
যুগলের বিয়ের সময় গদু চক্কোত্তি যা খেয়েছিল সুধা সুনীতির বিয়েতে তার তিনগুণ খেল। কিন্তু কে জানত, এই খাওয়াই তার শেষ খাওয়া।
যাই হোক, খেয়ে টেয়ে চলে গেল গদু চক্কোত্তি। দিন দুই পর খবর এল, এখান থেকে মাইল তিনেক দূরের এক গ্রামে ভেদবমি করে সে মারা গেছে।
.
২.৪৭
সুধা সুনীতির বিয়ের মাসখানেক পর একদিন দুপুরবেলা ভয়ানক শ্বাসকষ্ট শুরু হল সুরমার। তক্ষুনি লারমোরকে ডেকে আনার জন্য করিমকে পাঠানো হল। কিন্তু লারমোর পৌঁছবার আগেই সব শেষ।
এ বছর পুজোর পর থেকেই শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছিলেন সুরমা। চলাফেরা দূরের কথা, উঠে বসবার শক্তিটুকু পর্যন্ত তার ছিল না। অদৃশ্য রক্তচোষা দেহের সব সার যেন শুষে নিয়ে একটা বাজে সাদা কাগজের মতো সুরমাকে ফেলে রেখে গিয়েছিল।
এবাড়ির লোকেরা মনে মনে অনেক আগে থেকেই তৈরি হয়ে ছিল। বুঝতে পারছিল, সুরমা খুব বেশিদিন বাঁচবেন না। দ্রুত আলো নিবে আসার মতো তার আয়ু ফুরিয়ে আসছিল। যা অনিবার্য, অবশ্যম্ভাবী, আজ দুপুরবেলা তাই ঘটে গেল।
খবর পেয়ে সুধা-সুনীতি-হিরণ-আনন্দ ছুটে এল। শুধু কি ওরাই, কুমোরপাড়া-কামারপাড়া যুগীপাড়া-তিলিপাড়া, সারা রাজদিয়াই বা কেন, মৃত্যু-সংবাদ কানে যেতে চারদিকের গ্রামগঞ্জগুলো থেকে অসংখ্য মানুষ মলিন মুখে হেমনাথের বাড়ির দিকে আসতে লাগল।
