এদিকে সেদিনকার সেই মজার ঘটনাটির পর আনন্দর আর দেখা নেই। আগে দিনে দুবার করে হেমনাথের বাড়ি আসছিল, এখন রামকেশবের বাড়ির একটা ঘরে সে নাকি নির্বাসন বেছে নিয়েছে।
একদিন হেমনাথ গিয়ে আনন্দকে ধরে আনলেন। রগড়ের গলায় বললেন, আরে দাদা, তোমার এত লজ্জাটা কিসের?
আনন্দ খুবই বিব্রত বোধ করছিল। উত্তর দিল না।
হেমনাথ আবার বললেন, লজ্জার কিছু নেই, বুঝলে ভাই। বড় বড় সেনাপতি যারা–যেমন ধর রোমেল, মন্টোগোমারি, দ্য গল–ফ্রন্টে হেঁজিপেঁজি সোলজারের গায়ের গন্ধ শুকতে শুকতে কি তারা লড়ে? তারা দূরে দূরে বসে কলকাঠি নাড়ে। তুমি ঘরে বসে থেকে আদর্শ জেনারেলের মতো কাজ করেছ। একটু থেমে আবার বললেন, ভয় নেই, এর জন্যে সুনীতিদিদি বর বদল করবে না। কী বলিস রে দিদিভাই?
সুধা-সুনীতি-বিনু ঝিনুকরা কাছেই ছিল। সুনীতি ছুটে পালিয়ে গেল।
সুধা চোখের তারায় আর ঠোঁটের প্রান্তে ধারাল হাসিটা হেসে বিঁধিয়ে বিধিয়ে বলল, কী বীরপুরুষ, বোঝা গেল। কাঁধে বন্দুক, কোমরে ভোজালি, গলায় টোটার মালা ঝোলানোই সার।
২.৪৬-৫০ মাঘের শেষ তারিখে
২.৪৬
মাঘের শেষ তারিখে দিন পড়েছে। একই লগ্নে সুধা সুনীতির বিয়ে। রাত থাকতে থাকতে কাকপক্ষী জাগবার আগে দুই বোনকে বিছানা থেকে তোলা হল। শুরু হল অধিবাসের কাজ।
সুধা সুনীতিকে নতুন কাপড় পরানো হল, গলায় দেওয়া হল তুলসী কাঠের মালা, কোমরে নতুন লাল ঘুনসি, কপালে চন্দন কুঙ্কুমের ফোঁটা, চোখে কাজলের টান, সারা গায়ে ঝকমকে নতুন গয়না, হাতে নতুন শাখা।
মেয়ে সাজাবার পর নতুন পিঁড়িতে তাদের পাশাপাশি বসিয়ে শ্বেত পাথরের থালায় খাবার খেতে দেওয়া হল–খই চিড়ে মুড়কি ক্ষীর দই চিনি-বাতাসা। বিনু ঝিনুকও ওদের সঙ্গে বসে গেল। এরপর সারাদিন বিয়ের কনেরা আর কিছু খাবে না। খাবে সেই রাত্রিবেলা–বিয়ের পর।
সুধা সুনীতিকে খেতে বসিয়ে তিরিশ চল্লিশজন এয়ো নিয়ে গান গাইতে গাইতে নদীর ঘাটে জলসই’তে গেলেন স্নেহলতা। সঙ্গে সঙ্গে সানদার (সানাইবাদক) আর ঢুলী বাজাতে বাজাতে চলল।
জলে ঢেউ দিও না লো সখী
ঢেউ দিও না, ঢেউ দিও না,
আমরা জলের চাতকী।
জলের কালোরূপ নিরখি
জলে ঢেউ দিও না গো সখী।
আগে সখী, পাছে গো সখী।
মধ্যে রাধা চন্দ্রমুখী।
স্নেহলতা যতক্ষণ না ফিরছেন, সুধা সুনীতি পাত ছেড়ে উঠবে না। এই হচ্ছে রীতি।
কিছুক্ষণ পর স্নেহলতারা নদী থেকে নতুন কলসিতে জল ভরে ফিরে এলেন। যে কলসিটায় জল আনা হয়েছে সেটার নাম মঙ্গলকলস। পাঁচজন এয়ো একসঙ্গে কলসিটা ধরে উলু দিতে দিতে মাটিতে স্থির করে বসাল। একজন তার তলায় আগেই ধানদূর্বা দিয়েছে। বাকিরা গান ধরল।
ওগো মঙ্গলো আসিছে দুয়ারে।
মঙ্গলো অবনী আজ।
মঙ্গলো জলধর, মঙ্গলো কলসে
পাদ্য অর্ঘ্য নিয়ে এসো হরষে,
অতিথি, ভূপতি, দেবতা, স্বদেশে,
মঙ্গলো অবনী আজ।
দেখতে দেখতে রোদ উঠে গেল, বেলা চড়তে লাগল। দুপুরের খানিক আগে পুরুত এল। অবনীমোহন মেয়ে সম্প্রদান করবেন। পুরুত তাকে নিয়ে বৃদ্ধিতে বসে গেল। বৃদ্ধির সময়ও মেয়েরা গান ধরল:
ওগো বৃদ্ধির কার্যে কী কী লাগে?
ষোল মণ চাউল লাগে গো।
ওগো বৃদ্ধির কার্যে কী কী লাগে?
ষোল বিড়া পান লাগে গো।
ওগো বৃদ্ধির কার্যে কী কী লাগে?
ষোল মণ গুয়া লাগে গো।
বৃদ্ধির পর এয়োরা শিলে কাঁচা হলুদ বেটে সুধা সুনীতিকে মাখাল। তারপর তাদের মাথায় ধানদূর্বা দিয়ে উলু দিতে দিতে স্নান করাতে লাগল। সেই সঙ্গে গান।
তোরা আয় লো সকলে
আমার সীতাকে স্নান করাব
সুশীতল জলে।
কস্তুরী মিশায়ে জল ঢেলে দাও গো
সীতার শিরে।
সখী, সকলে আন গো, মাজ কেটে আনো
কুর হরিদ্রা বেটে আনো—
সুধা সুনীতির স্নান হয়ে গেলে, ‘অধিবাসে’র তত্ত্ব নিয়ে হেমনাথ আর বিনু বেরিয়ে পড়ল। দু’ বাড়িতে তত্ত্ব যাবে। মাছ, পান, তামার পরাতে পরাতে নানা রকমের মিষ্টি। এত জিনিস হাতে করে তো নিয়ে যাওয়া যায় না। তাই ভবতোষের ফিটনটা সকাল বেলাতেই আনিয়ে রেখেছিলেন হেমনাথ।
প্রথমে বিনুরা গেল হিরণদের বাড়ি। সেখানে বেশিক্ষণ বসল না; তত্ত্ব নামিয়ে দিয়ে সোজা রামকেশবের বাড়ি চলে এল।
এখানেও সানাই বাজছে, ঢাক বাজছে। মাঝে মাঝে শাঁখ এবং কল কল উলুর আওয়াজ আসছে।
বিনুরা বাড়ির ভেতর আসতেই সাড়া পড়ে গেল। ঝুমা কোথায় ছিল, ছুটতে ছুটতে সামনে এসে হাজির।
আজ দারুণ সেজেছে ঝুমা। অন্যদিন ফ্রক পরে থাকে। আজ হলুদ রঙের সিল্কের শাড়ি আর লাল টুকটুকে একটা জামা পরেছে। শাড়িটার গায়ে ছোট ছোট নীল ময়ূর। কপালে আগুনের কুঁড়ির মতো কুমকুমের একটি টিপ। টিপটাকে গোল করে ঘিরে চন্দনের বিন্দু। চোখে কাজলের টান। গালে এবং ঠোঁটে লালচে রং। আঙুলে পাথর-বসানো লম্বা আংটি, গলায় হার, হাতে সোনার চুড়ি, বাঁ হাতের সুডোল নরম কবজিটাকে ঘিরে সরু ফিতেতে বাঁধা চৌকো ঘড়ি।
ঝুমার সাজটাজ নিয়ে ঠাট্টা করতে যাচ্ছিল বিনু। তার আগেই ঘাড়খানা বাঁকিয়ে গালে একটি হাত রেখে ঝুমাই বলে উঠল, বাবা, কী সাজটাই না সেজেছে! একেবারে বরবেশ।
চমকে নিজের দিকে তাকাল বিনু। তার পরনে ধবধবে পাটভাঙা ধুতি, দুধরং সিল্কের পাঞ্জাবি, পায়ে নতুন পাম্প-শু। সাজসজ্জা তারও কিছু কম নয়। বিব্রত হেসে বিনু বলল, না, মানে–
