স্নেহলতা বললেন, গাছে টাছে চড়তে হবে না। তুই ঘরে গিয়ে বোস। জানলা দিয়ে যেটুকু দেখা যায় তার বেশি দেখবার দরকার নেই।
বিনু শুনল না, ঊর্ধ্বশ্বাসে মাঠের দিকে ছুটল। আজ আর তাকে বাড়িতে আটকে রাখা গেল না। মাঠজোড়া রণভূমি তাকে বিপুল আকর্ষণে টেনে নিয়ে গেল।
পেছনে স্নেহলতার ভীত, ব্যাকুল কণ্ঠস্বর শোনা যেতে লাগল, হেমনাথ আর অবনীমোহনকে তিনি বলছেন, তোমরা ছেলেটাকে আটকালে না? আজ কী যে হবে! যাও যাও, ওকে ফেরাও
হেমনাথরা কী উত্তর দিলেন, বিনু শুনতে পেল না। তার আগেই ছায়াচ্ছন্ন ঝুপসি বাগান পেরিয়ে, মাঘের নিস্তরঙ্গ পুকুর পেছনে ফেলে, ফসলশূন্য ফাঁকা মাঠে এসে পড়ল।
চারদিক থেকে জনতা গোল হয়ে বৃত্তাকারে ছুটছে। সন্মোহিতের মতো তাদের পিছু পিছু দৌড়তে লাগল বিনু।
দক্ষিণের চকে এসে দেখা গেল, সত্যি সত্যি মাঠের মাঝ-মধ্যিখানে বাঘটা শুয়ে আছে। চারধার থেকে গোল হয়ে জনতা ঝড়ের মতো নেমে আসছিল। বাঘটা যখন সিকি মাইলের মতো দূরে সেই সময় কেউ যেন মন্ত্র পড়ে হঠাৎ তাদের থামিয়ে দিল।
একধারে সারি সারি অনেকগুলো হিজল গাছ। বিনু আর দেরি করল না, সব চাইতে উঁচু গাছটার মগডালে চড়ে বসল। ভাটির দেশে শ্বশুরবাড়িতে চলে যাবার আগে বিনুকে গাছে চড়া শিখিয়ে দিয়েছিল যুগল।
শাঁখ কাসরের আওয়াজ থেমে গেছে। কালী মাঈকী জয়’, কিংবা আল্লা হো আকবর’-ও আর শোনা যাচ্ছে না। জনতা যুদ্ধক্ষেত্রে এসে যেন বিমূঢ় হয়ে গেছে।
হঠাৎ কে যেন চেঁচিয়ে উঠল, সাহেববাবু কই?
আট দশটা লোক চিৎকার করে বলল, বাড়িত্ নাই।
অহন কী করা?
সাহেববাবু তো কইছিল, বাঘ দেখলে তেনারে খপর দিতে। তেনি নাই, আমরা ফিরাই যাই।
হগলেরে তাইলে ফিরনের কথা কইয়া দ্যাও। বাঘ মারণ বইলা কথা! সাহেববাবুনা থাকলে আমাগো চালাইব কে?
একটা লোক চিৎকার করে ফেরবার কথা বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই বাজিতপুরের জোয়ান ছেলে হালিম বলল, কিছুতেই না। অ্যাঙ্গুর আইসা ফিরা যামু না। সুযুগ যহন পাইছি, শালার বাঘেরে নিকাশ করুম। বলেই আকাশের দিকে হাতের লাঠিটা ছুঁড়ে চেঁচাল, আউগাও (এগোও) ভাই হগল–
নিমেষে জনতার ভেতর সাড়া পড়ে গেল।
আল্লা হো আকবর—
কালী মাঈকী জয়—
তারপরেই বাঘটাকে ঘিরে মানুষের বৃত্ত ছোট হয়ে আসতে লাগল। কিন্তু জন্তুটা যখন তিনশ’ গজের মতো দূরে, লোকগুলো আবার থেমে গেল।
আনন্দ নেই। সেনাপতিত্ব আজ হালিমের দখলে। প্রেরণা দেবার জন্য পেছন থেকে আবার সে চেঁচিয়ে লাগল, আউগাও ভাইরা, আউগাও
ঠেলে ঠেলে জনতাকে আরও অনেকখানি এগিয়ে নিয়ে গেল হালিম। কিন্তু বাঘটা যখন এক শ’ গজ দূরত্বে তখন আর পারা গেল না।
এতদূর থেকে লাঠি সড়কি দিয়ে অন্তত বাঘ মারা যায় না। হালিম শূন্যে ঘুষি ছুঁড়তে ছুঁড়তে সমানে চেষ্টাতে লাগল, আওগাও ভাইরা, আউগাও–
কিন্তু এত অনুপ্রেরণাতেও কাজ হল না। লোকগুলো একেবারে অনড়, কেউ যেন পেরেক ঠুকে মাটিতে তাদের পা আটকে দিয়েছে।
ওদিকে আরেকটা ব্যাপার ঘটল। বাঘটা ঘুমিয়েছিল, হঠাৎ এত চেঁচামেচি শুনে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল।
হিজল গাছের মাথা থেকে বিনুর মনে হল, বাঘটা দশ হাতও না, বার হাতও না, ছ’সাত হাতের মতো লম্বা। হলুদ শরীরে তার কালো কালো ডোরা।
কাঁচা ঘুমটা ভেঙে যাবার জন্য খুব সম্ভব বাঘটা বিরক্ত হয়েছিল, এবং এত লোকজন দেখে কিছুটা বিস্মিত, কিছুটা হকচকিত। সে সামনের দিকে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গে শ’খানেক লোক অস্ত্র টস্ত্র ফেলে। প্রাণপণে ছুটল, এবং নিমেষে দিগন্তের ওপারে অদৃশ্য হয়ে গেল। এবার বাঘটা তাকাল ডানদিকে, তক্ষুনি দু’আড়াইশ লোক আর নেই। অনেকে মালকোঁচা দিয়ে লুঙ্গি পরে এসেছিল, ছুটবার সময় কাছা খুলে যাওয়ার লুঙ্গিতে পা আটকে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। ধান কেটে নিয়ে যাবার পর যে গোড়াগুলো মাঠময় ছড়িয়ে আছে তাতে হোঁচট খেয়েও অনেকে পড়ে যাচ্ছে। পড়েই তক্ষুনি উঠে পড়ছে, এবং ধাঁ করে পেছনে একবার তাকিয়ে নিয়েই আবার ছুটছে।
সামনে পেছনে, যেদিকেই বাঘটা তাকাচ্ছে, এক অবস্থা। মুহূর্তে সব ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। চারদিকে তাকাতে তাকাতে সেনাপতির সঙ্গে একবার তার শুভদৃষ্টি হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেল একটা ডোরাকাটা লাল লুঙ্গি আর সবুজ জামা প্রায় উড়ে গিয়ে আধ মাইল দূরের একটা খালে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
কেউ যখন আর নেই, সেই সময় বাঘটা অলস পায়ে চকের এক প্রান্তে উলুখড়ের জঙ্গলে গিয়ে ঢুকল। তারপর হিজল গাছ থেকে নেমে ছুটতে ছুটতে বাড়ি ফিরে এল বিনু।
কিছুক্ষণের মধ্যে বাঘ শিকারের ব্যাপারটা দিকে দিকে রটে গেল।
হাসতে হাসতে হেমনাথ বললেন, যেমন আনন্দটা তেমনি তার প্যানজার বাহিনী।
বিনু শুনতে পেল সবার কান বাঁচিয়ে সুধা সুনীতিকে বলছে, আচ্ছা বীরপুরুষের গলায় মালা দিবি দিদিভাই–
সুনীতি মুখ তুলতে পারছিল না। মাটির সঙ্গে সে যেন মিশে যেতে চাইছে।
.
দিন চারেক পর খবর পাওয়া গেল, বাঘটা মারা পড়েছে। ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব লঞ্চে করে রাজদিয়া আসছিলেন। নদীর বাঁকে বাঘটাকে দেখে গুলি করে মেরেছেন।
বাঘের ভয়ে আনন্দ যে বাড়ি থেকে বেরোয় নি, এই কথাটা কেমন করে যেন চারদিকের গ্রামগঞ্জগুলোতে রটে গিয়েছিল। খবরটা যে শুনেছে সে-ই হেসেছে।
