প্যারেড করতে করতে বাঁয়ের জায়গায় ডান পা তুললে রক্ষা নেই, অমনি আনন্দের হাতের বেত পায়ের গোছে এসে পড়ে। আনন্দের চোখকে ফাঁকি দেওয়া সহজ নয়।
প্যারেড শুরু হবার পর বেশ কিছুদিন বাঘটাকে আর দেখা গেল না। তার বিরুদ্ধে যে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে, এ খবর কি সে জেনে ফেলেছে? যাই হোক, মানুষ খানিকটা নিশ্চিন্ত হতে পেরেছে, তবে সর্তক আছে। সন্ধের আগে আগেই যথারীতি ঘরে ঢুকে খিল দিচ্ছে তারা। এইভাবেই চলতে লাগল।
.
২.৪৫
হঠাৎ একদিন সকালবেলা বারুইবাড়ির প্রাণবল্লভ মাঠের দিক থেকে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে ছুটতে এবং চেঁচাতে চেঁচাতে হেমনাথের বাড়ি এসে হাজির, খাইছে রে খাইছে, আমারে খাইয়া ফেলাইল রে–
পুব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ, চারদিকের ঘর থেকে সুধা-সুনীতি বিনু-ঝিনুক অবনীমোহন-হেমনাথ, সবাই ছোটাছুটি করে বেরিয়ে এলেন।
উদ্বিগ্ন মুখে হেমনাথ শুধোলেন, কী হয়েছে প্রাণবল্লভ, কী হয়েছে?
প্রথমটা কথা বলতে পারল না প্রাণবল্লভ। হাত-পা-ঠোঁট, তার সারা শরীর ভয়ে থর থর কাঁপছে। হাত ধরে তাকে বারান্দায় বসালেন হেমনাথ। বললেন, আগে শান্ত হ। পরে বলবি।
কাঁপা, ভাঙা ভাঙা গলায় প্রণবল্লভ বলল, ইট্টু জল বড়কত্তা–
জল খেয়ে খানিকটা শান্ত হল প্রাণবল্লভ। তারপর যা বলল, সংক্ষেপে এইরকম। ভোরবেলা মেটে আলুর সন্ধানে সে ধানকাটা মাঠে গিয়েছিল। আলের ধারে ঘুরে ঘুরে দু’চারটে যোগাড়ও করেছিল। ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ তার চোখে পড়ে, দক্ষিণের চকে মাঠের মাঝখানে গুটিসুটি মেরে বাঘটা শুয়ে আছে।
প্রাণবল্লভের কথা শেষ হলে অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে হেমনাথ বললেন, সুধাদিদি সুনীতিদিদি, শিগগির শাঁখ বাজা। বাঘের খবর পেলেই আনন্দ শাঁখ টাখ বাজাতে বলেছিল না? সেদিনকার মিটিং-এর কথা কারোর জানতে আর বাকি নেই।
সুধা সুনীতি ছুটে গিয়ে ঘর থেকে শাঁখ বার করে আনল, তারপর দুই বোন গাল ফুলিয়ে জোরে জোরে ফুঁ দিতে লাগল।
প্রাণবল্লভের ভয় কেটে গিয়েছিল। লাফ দিয়ে উঠোনে নেমে আকাশে হাত ছুঁড়ে চেঁচিয়ে উঠল সে, বন্দে মাতরম–
বন্দে মাতরম-এর এরকম প্রয়োগ আগে কখনও দেখে নি বিনু।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গে এ পাড়া, সে পাড়া এবং দূর-দূরান্ত থেকে শাঁখ কাসর এবং টিন পেটাবার আওয়াজ ভেসে আসতে লাগল। সেই সঙ্গে মুহুর্মুহু শোনা যেতে লাগল, বন্দে মাতরম্–
কালী মাঈকী জয়—
মুসলমান পাড়ার দিক থেকে আওয়াজ আসতে লাগল, আল্লা হো আকবর–
তারপরেই হো হো চিৎকারে দিগদিগন্ত তোলপাড় করে অসংখ্য মানুষ বেরিয়ে পড়ল। সবার হাতে লাঠি আর সুপারি কাঠের সড়কি।
হেমনাথ প্রাণবল্লভকে বললেন, যা শিগগির, আনন্দকে বাঘের খবরটা দিয়ে আয়।
স্নেহলতা বললেন, যা চেঁচামেচি আর কাসর ঘন্টার আওয়াজ, তাতে খবর পেতে কি তার বাকি আছে?
তবু যাক।
প্রাণবল্লভ রামকেশবের বাড়ি ছুটল। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে খবর দিল, সে একাই না, আরও অনেকে আনন্দকে বাঘের খবর দিতে গিয়েছিল। কিন্তু আনন্দকে পাওয়া যাচ্ছে না।
হেমনাথ বললেন, সে কী! কাজের সময় সেনাপতিই নিরুদ্দেশ!
প্রাণবল্লভ কী বলতে গিয়ে থেমে গেল। হেমনাথের মুখের দিকে তাকিয়ে ইতস্তত করতে লাগল।
তার মনের কথাটা যেন পড়তে পারলেন হেমনাথ। বললেন, কিছু বলবি?
হ।
বল না—
অপরাধ যদি না ন্যান কথাখান কই–বলে হাতজোড় করল প্রাণবল্লভ।
হেমনাথ অবাক, অপরাধ নেব কেন?
হাতজোড় অবস্থাতেই প্রাণবল্লভ বলল, আমার মনে হইল সাহেববাবু বাড়িতেই আছে, ভিতরে তেনার গলাও য্যান পাইলাম। কিন্তুক মা-ঠাইরেনরা কইয়া দিল তেনি নাই–
হেমনাথ ধমকের গলায় বললেন, কী যা-তা বলছিস!
বিশ্বাস যান না বড়কত্তা?
না।
বিশ্বাস না যাওনেরই কথা। কিন্তুক—
কিন্তু কী?
সাক্ষী আছে।
কে সাক্ষী?
প্রাণবল্লভ একে একে নাম করে যেতে লাগল, গণকবাড়ির মহেন্দর, কামারবাড়ির নিমাই, সোনারুবাড়ির অনন্ত, কালিমুদ্দিন মাঝি, বরকাতুল্লা নিকারিকত মাইনষের নাম কমু?
এত লোক আনন্দের খোঁজে গিয়েছিল। হেমনাথের চোখেমুখে এবং কণ্ঠস্বরে বিস্ময়।
হ। বাঘ দেখলে তেনিই তো খপর দিতে কইছিল।
একটু চুপ করে থেকে হেমনাথ বললেন, আচ্ছা, তুই যা এখন—
প্রাণবল্পভ চলে গেল।
ওদিকে আরেক কান্ড চলছিল, লাঠি সড়কি নিয়ে রাজদিয়ার লোক তো মাঠের দিকে ছুটছিলই। দিগন্তের ওপারে কৃষাণ গ্রামগুলো থেকে শত শত মানুষ ছুটে আসছিল। তাদের হাতেও লাঠি সড়কি এবং নানারকম অস্ত্র।
শাঁখ কাঁসর এবং টিন পেটাবার আওয়াজ আসছিলই। সেই সঙ্গে মুহুর্মুহু শোনা যাচ্ছিল, বন্দে মাতরম্।
কালী মাঈকি জয়—
আল্লা হো আকাবর—
ধান-কাটা শীতের মাঠ পানিপথ কি হলদিঘাটের যুদ্ধক্ষেত্রের চেহারা নিতে শুরু করেছে। বিনু হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে উঠল, আমি মাঠে যাব দিদা–
মাঠে কেন রে দাদাভাই? স্নেহলতা চমকে উঠলেন।
বাঘ মারা দেখতে।
না না, ওখানে তোমাকে যেতে হবে না। জোরে জোরে প্রবলবেগে হাত নাড়তে লাগলেন স্নেহলতা, চোখেমুখে তার ভয়ের ছায়া পড়ল।
আমি যাবই– ঘাড় গোঁজ করে পা ছুঁড়তে লাগল বিনু। শাঁখ কসরের শব্দ, অবিরল বন্দে মাতরম্ আর আল্লাহ আকবর’ তার রক্ত চঞ্চল করে তুলেছে।
ওখানে কী হবে, কেউ বলতে পারে! বাঘটা যদি কোনও রকমে ছিটকে তোর কাছে চলে আসে–
আমি ওই হিজলগাছের মাথায় চড়ে দেখব–দূর মাঠের দিকে আঙুল বাড়িয়ে দিল বিনু।
