সাহেববাবু সম্ভাষণটা খুব সম্ভব আনন্দের হ্যাঁট-বুট-প্যান্ট এবং গুলি-বন্দুকের সম্মানে।
আনন্দ বলল, সে তত ঠিকই।
বাঘ কার কী ক্ষতি করেছে, তাদের কতখানি দুর্দশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, এরপর লোকগুলো সে সব কাহিনী বলে যেতে লাগল।
সব শুনে আনন্দ বলল, বাঘ আমি মেরে দিতে পারি। তবে–
তয় কী? জনতা উন্মুখ হল।
আমার কথামতো তোমাদের চলতে হবে।
নিয্যস চলুম।
এরপর উদ্দীপ্ত ভাষায় ছোটখাটো একখানা বক্তৃতা দিল আনন্দ। তার সারমর্ম এইরকম। প্রথমত, সবাইকে লাঠি এবং সড়কি বানিয়ে নিতে হবে। ঘরে ঘরে শাঁখ, কাঁসর, নিদেন পক্ষে একটুকরো টিন মজুদ রাখতে হবে। কেউ যদি বাঘটাকে দেখতে পায়, সঙ্গে সঙ্গে নিজের গ্রামে গিয়ে খবর দেবে। আর খবর পেলেই যত শাঁখটাখ আছে, একসঙ্গে বাজাতে হবে। এক গ্রামের বাজনার আওয়াজ পেলে আরেক গ্রাম বাজাতে শুরু করবে। এই ভাবে চারদিকের গ্রামগুলো সর্তক হয়ে যাবে।
শুধু শাঁখ কাঁসর বা টিন বাজালেই চলবে না। চেঁচিয়ে ধ্বনিও দিতে হবে, বন্দে মাতরম্’, কালী মাঈকি জয়’ কিংবা আল্লা হো আকবর। ধ্বনিটা কানে গেলে চুপ করে বসে থাকলে চলবে না। প্রতিধ্বনিও দিতে হবে। তারপর লাঠি সড়কি নিয়ে সব দিক থেকে বাঘটাকে ঘিরে পিটিয়ে মেরে ফেলা হবে। তাতেও যদি সুবিধে না হয়, আনন্দ এবং তার বন্দুক তো আছেই।
পরিকল্পনার কথাটা বলে ঘুরে ঘুরে সগর্বে জনতাকে একবার দেখে নিল আনন্দ। তারপর আবার শুরু করল, ফন্দিটা কেমন?
সবাই চেঁচিয়ে পেঁচিয়ে সায় দিল, চোমকার সাহেববাবু, চোমৎকার–
এবার বাঘের আর নিস্তার নেই, বুঝলে?
এরকম চমকপ্রদ একখানা পরিকল্পনার পর বাঘের আয়ু যে নেহাতই ফুরিয়ে এসেছে, সে সম্বন্ধে জনতার সন্দেহ থাকল না। উৎসাহে উদ্দীপনায় তাদের চোখ চক চক করতে লাগল।
আনন্দ বলল, তা হলে ওই কথাই রইল—
হ।
হঠাৎ এই সময় একজন বলে উঠল, বাঘেরে আমরা যহন ঘিরা ধরুম, আপনে আমাগো লগে থাকবেন তো?
বাঁ হাতের তালুতে প্রচন্ড ঘুষি কষিয়ে আনন্দ বলল, নিশ্চয়ই। আমি না থাকে তোমাদের চালাবে কে?
লোকগুলো একেবারে নিশ্চিন্ত হয়ে গেল। নিজেদের মধ্যে তারা বলাবলি করতে লাগল, সাহেববাবু আমাগো লগে থাকব। শালার বাঘের এইবার যম আসছে।
আনন্দ বলল, কথা হয়ে গেল। এখন তোমরা বাড়ি যাও। আর হ্যাঁ, যতদিন না বাঘটা মারা পড়ছে, প্রতি সপ্তাহে রবিবার করে এখানে মিটিং হবে। দুপুর বেলা তোমরা চলে আসবে। যদি বাঘ মারার অন্য কোনও ভাল ফন্দি মাথায় আসে, তোমাদের বলে দেব।
আইচ্ছা।
বাঘের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে যে যার বাড়ি চলে গেল। হতভাগ্য প্রাণীটা জানতেও পারল তার বিরুদ্ধে কী ভীষণ ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে।
মিটিং শেষ হলে আনন্দকে ধরে বাড়ি নিয়ে এল বিনু। সুধা সুনীতি উঠোনই ছিল। ঠোঁট টিপে হাসতে হাসতে সুধা বলল, বাবা, একেবারে বীরবেশে যে! দ্যাখ দিদি, দ্যাখ
সুনীতি চোরা চোখে আনন্দকে দেখে নিয়ে মুখ নিচু করল। তারপর নখ খুঁটতে লাগল। তার মুখে মৃদু কৌতুকের হাসি আলতোভাবে লেগে রইল।
সুধা এবার এগিয়ে এসে চোখ বড় বড় করে বলল, বন্দুক, টোটার মালা, ভোজালি–যেভাবে সেজেছেন, তাতে বাঘটাকে না মারলেও চলবে।
ভুরু অল্প কুঁচকে আনন্দ বলল, কেন?
এই বীরবেশ একবার যদি বাঘটাকে দেখিয়ে দিতে পারেন, রাজ্য ছেড়ে সে পালিয়ে যাবে।
আনন্দ কী বলতে যাচ্ছিল, বলা হল না। স্নেহলতা কোথায় ছিলেন, আনন্দকে দেখতে পেয়ে ছুটে এলেন। বললেন, এস দাদা, এস–
তারপর যতক্ষণ আনন্দ এ বাড়িতে রইল, সুধা তার পেছনে লেগে থাকল।
.
দু’চার দিনের ভেতর দেখা গেল, রাজদিয়া এবং চারপাশের গ্রামগুলোতে একটা সুপারি গাছ কিংবা বয়রা বাঁশও আর আস্ত নেই। সব লাঠি এবং সড়কি হয়ে গেছে।
প্রথমে ঠিক হয়েছিল, রবিবার রবিবার ধানকাটা ফাঁকা মাঠে মিটিং বসবে। এক রবিবার পরই সিদ্ধান্তটা বাতিল করে দিল আনন্দ। নতুন করে স্থির হল, রোজ সবাইকে আসতে হবে। বাঘ বলে কথা!
দু’চারদিন যাতায়াতের পর হঠাৎ একদিন আনন্দ বলল, বাঘ মারা সহজ ব্যাপার না, বুঝলে?
সবাই সমস্বরে বলে উঠল, হেয়া আর বুঝি না!
এর জন্য সকলকে এক মন, এক প্রাণ হতে হবে।
আইজ্ঞা হেয়া তো হইতেই হইব।
আমি ভাবছি—
চারপাশের বিপুল জনতা দম বন্ধ করে উৎসুক চোখে তাকিয়ে রইল।
আনন্দ বলল, সৈন্যদের মতো তোমাদের প্যারেড করতে হবে। তাতে একসঙ্গে কাজ করার প্রেরণা পাবে।
পেরেট কী? ওই লেফট রাইট করা।
পরের দিন থেকেই প্যারেড শুরু হল। দেখা গেল, কেউ লুঙ্গি মালকোচা দিয়ে পরেছে। তার পাশেই হয়তো একজনের পরনে খাটো ধুতি এবং ফতুয়া, গলায় তিনলহর তুলসীর মালা। তার পরের লোকটি পাজামা পরে এসেছে।
নানারকম বেশভূষা আনন্দর পছন্দ নয়। দু’একদিন দেখে আনন্দ বলল, তোমরা এক কাজ কর।
কী?
সবাই একটা করে খাকি প্যান্ট আর সাদা হাফ শার্ট করিয়ে নাও। একরকম পোশাক পরলে দেখতে ভাল, কাজেরও সুবিধে।
এইবার জনতা বিদ্রোহী হয়ে উঠল, কী যে কন সাহেববাবু, তার ঠিক ঠিকানা নাই। এই আকালে খাইতে না পাইয়া মরতে বসছি। আপনে কন পেন্টুল-জামা বানাইতে! এই কারবারে আমরা নাই।
পাছে সেনাদল ভেঙে যায়, এই আশঙ্কায় আনন্দ বলল, আচ্ছা থাক, শার্ট টটি বানাতে হবে না।
ধুতি-লুঙ্গি-পাজামার বিচিত্র সমন্বয়ের ভেতর বিপুল সমারোহে প্যারেড চলতে লাগল।
