হাচাই পালের ওই রকম উদ্ভ্রান্ত চেহারা দেখে স্নেহলতা চমকে উঠলেন, কী হয়েছে রে হাচাই?
হাঁপাতে হাঁপাতে হাচাই পাল বলল, সুন্দি কাউঠার খোঁজে মাঠে গেছিলাম। গিয়া দেখি বাঘ। দেইখাই লৌড় (দৌড়) দিলাম–
বাঘ!
হ বৌ-ঠাইরেন—
এই বাঘ নিয়ে দিন সাতেকের মধ্যে এক মজার ব্যাপার ঘটে গেল।
.
২.৪৪
কুমোরপাড়ার হাচাই পালই শুধু না, ক’দিনের মধ্যে বাঘটাকে আরও অনেকে দেখল। যেমন মৃধাবাড়ির ছলিমুদ্দিন, গোঁসাইবাড়ির সহদেব, নিকুঞ্জ কবিরাজ, অধর সাহা, মনা ঘোষ–এমনি আরও অনেকে।
কেউ বলল, বাঘটা দু’হাত লম্বা। কেউ বলল, আট হাত। কেউ বলল, দশ হাত। যত দিন যেতে লাগল লোকের মুখে মুখে বাঘটার দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-উচ্চতা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে লাগল।
নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করবার জন্য বাঘটাও যেন উঠে পড়ে লেগে গেছে। আজ এ বাড়ির ছাগল পাওয়া যাচ্ছে না, কাল ও বাড়ির গোরুর খোঁজ নেই, পরশু সে বাড়ির হালের বলদ নিরুদ্দেশ। একদিন তো যুগীপাড়ার একটা ছেলেই নিখোঁজ হয়ে গেল। মাঠের মাঝখানে নলখাগড়ার ঝোপে খানকয়েক হাড় ছাড়া ছেলেটার আর কোনও চিহ্নই পাওয়া গেল না।
এদিকে রাজদিয়াকে ঘিরে দশ আরওখানা গ্রামে সন্ত্রাসের রাজত্ব শুরু হয়ে গেছে। কনট্রোলের দোকান থেকে কেরোসিন উধাও হবার পর সন্ধে নামতে না-নামতেই চারদিক নিশুতি হয়ে যাচ্ছিল। আজকাল বিকেল থাকতেই বাঘের ভয়ে ঘরে খিল পড়ে যায়।
সব চাইতে অসুবিধে হয়েছে বিনু আর ঝিনুকের। তারা যে তেমন বড় হয়েছে, এ কথাটা স্নেহলতা বা বাড়ির আর কেউ মানতেই চায় না। এখন কিছুদিন স্কুলে ছুটি চলছে। বেলা বেড়ে রোদ বেশ চনচনে হয়ে উঠলে তবে তারা ঘরের বার হতে পারে, আবার বিকেলবেলা রাজদিয়ার সব লোক বাইরে থাকতে থাকতেই তাদের ঘরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। বাড়ির চৌহদ্দির বাইরে যাবার উপায় নেই তাদের। স্নেহলতার ভয়, বাঘটা তাকে তাকে আছে। রাজদিয়ার কয়েক হাজার লোকের ভেতর থেকে বেছে বেছে তার নাতি-নাতনী দুটোকে টপ করে মুখে তুলে নিয়ে যাবে।
স্নেহলতা লক্ষ্মণের গন্ডি কেটে দিয়েছেন। পেছনে রান্নাঘর, সামনে উঠোন, দক্ষিণে মধুটুকুরি আমের গাছ ও উত্তরে চেঁকিঘর–এই চতুঃসীমার মধ্যে বন্দি হয়ে থাকতে কার আর ভাল লাগে! এমনকি বাগান এবং পুকুরেও একা একা যাওয়া বারণ।
অন্য কিছুর জন্য নয়, ঝুমার জন্যই খুব খারাপ লাগে বিনুর। সারাদিন ছটফট করে এ ঘর ও ঘর করে বেড়ায় সে। উঠোন জুড়ে চঞ্চল পায়ে ঘুরপাক খেতে থাকে।
ঝিনুক কিন্তু ভারি খুশি। পুবের ঘরের উঁচু পৈঠের ওপর বসে পা নাচাতে নাচাতে কৌতুকের চোখে সে বিনুর অস্থিরতা দেখতে থাকে। একসময় খুব আস্তে করে ডাকে, বিনুদা–
বিনু বলল, কী বলছ?
তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে, না?
কষ্ট কেন?
ঝিনুকের চাপা ঠোঁটের মাঝখানে হাসির একটু আভা ফুটে উঠেই চকিতে মিলিয়ে যায়। সে বলে, সারাদিন বাড়িতে আটকে আছ বলে–
চোখমুখ কুঁচকে বিরক্ত, রাগ-রাগ গলায় বিনু বলতে থাকে, সমস্ত দিন বাড়ি বসে থাকতে কারোর ভাল লাগে?
ঠিকই তো।
দিদার কী যে ভয়, রাস্তায় বেরুলে এত লোক থাকতে বাঘ এসে যেন আমাকেই গিলে ফেলবে।
কয়েক পলক বিনুর দিকে তাকিয়ে থেকে গলার স্বর আরও নামিয়ে ফেলে ঝিনুক, একে বেরুতে পারছ না। তার ওপর–
তার ওপর কী?
ঝুমাদের বাড়ি যাওয়া হচ্ছে না। ঝুমাদের বাড়ি যেতে পারলে এত কষ্ট, এত রাগ হত না। তাই না বিনুদা?
চোখের তারা স্থির করে ঝিনুকের দিকে তাকায় বিনু। বুঝতে চেষ্টা করে মেয়েটা কি কিছু আভাস পেয়েছে? বলে, তোমার কি মনে হয়, রাস্তায় বেরুলেই আমি ঝুমাদের বাড়ি যাই? বিনুর গলা অল্প অল্প কাপে।
ঝিনুক হঠাৎ উদাস হয়ে যায়, কী জানি–
আর বিনু এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ায় না। বড় বড় পা ফেলে আবার এ ঘরে ও ঘরে এবং উঠোনে ঘুরতে থাকে। ঘুরতে ঘুরতে ভাবে, কুমাই শুধু না, এই ঝিনুক মেয়েটিই কি কম রহস্যময়ী!
.
বাঘের উৎপাত দিন দিন বেড়েই চলল। রক্তের স্বাদ যখন একবার সে পেয়েছে তখন কি সহজে থামবে?
এদিকে থানা থেকে ঢেঁড়া দিয়ে পনের কুড়ি মাইলের ভেতর যত গ্রাম-গঞ্জ আছে, সব জায়গার লোককে সাবধান করে দেওয়া হয়েছে। বাঘ মারবার জন্য মোটা টাকা পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছে।
এত এত ব্যাপার যখন ঘটে গেল তখন কি আর আনন্দ চুপ করে বসে থাকতে পারে? বাঘ মারার দায়িত্ব সে নিজের কাঁধে তুলে নিল। একদিন দুপুরবেলা বিনুরা দেখতে পেল, পুকুরের ওধারে চারদিকের গ্রামগুলো থেকে কয়েক শ’ যুবক এবং প্রৌঢ়কে জড়ো করে ফেলেছে সে। এই মুহূর্তে তার গায়ে পুরোপুরি শিকারির সাজ। কাঁধ থেকে বন্দুক ঝুলছে, গলায় টোটার মালা, কোমরে মস্ত ভোজালি।
মাঘের মাঝামাঝি এই সময়টায় মাঠে জল নেই, ধানও কাটা হয়ে গেছে। আনন্দকে ঘিরে বিরাট জনতা ধানকাটা মাঠের ওপর গোল হয়ে বসে পড়ল।
এত লোক যখন রয়েছে তখন ভয়ের কোনও কারণ নেই। স্নেহলতাকে বলে বিনু ধানখেতে ছুটল।
জনতার বেশির ভাগই চাষী শ্রেণীর মানুষ। দুর্ভিক্ষে হেজেমজে যাবার পর যারা কোনও রকমে টিকে আছে তারা ছুটে এসেছে। উৎকন্ঠিতের মতো লোকগুলো আনন্দের দিকে তাকিয়ে ছিল।
আনন্দ বলছিল, বাঘটাকে তোমরা মারতে চাও, এই তো?
সবাই সমস্বরে বলল, হ সাহেববাবু। শালার বাঘের লেইগা পরানে শান্তি নাই। কুনদিন কার বাড়ি। গিয়া যে আকাম কইরা আইব।
