তা ছাড়া, রাজদিয়ার রাস্তায় কত দৃশ্য চোখে পড়ে। হুস হুস করে যে মিলিটারি জিপগুলো ছুটে যায় তার ভেতর দেখা যায়, আমেরিকান টমির গলা জড়িয়ে নারীদেহ ঝুলছে। ঝাউবনের মধ্যে নিগ্রো সৈন্যগুলো কোত্থেকে যেন মেয়েমানুষ জুটিয়ে এনে এই শীতের রাতে নরকের খেলা শুরু করে দেয়।
একদিন এক বাড়িতে কান পাততে গিয়ে বিশ্রী ব্যাপার ঘটে গেল।
বিনুরা দেখল, শীতের রাত্তিরে এরা জানালা খুলে শুয়েছে।
খুব চাপা গলায় অশোক বলল, ভালই হয়েছে। এতদিন খালি শুনেছি, এবার ভেতরকার মজা দেখতে পাব।
পা টিপে টিপে তিনজন জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। অন্য সব বাড়ির জানালায় কান রেখে বিনুরা যা শুনেছে, এখানেও তা-ই শুনতে পেল। গাঢ় গলায় পুরুষটি তার সঙ্গিনীকে আদরের কথা বলছে, মাঝে মাঝে চুমু খাবার শব্দ।
উত্তেজনায় তিনজন মুখ বাড়াতে লাগল। কিন্তু ঘরের ভেতর আলো নেই, তা ছাড়া ওরা মশারি টাঙিয়ে শুয়েছে। চোখে শান দিয়েও কিছুই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না।
বাইরে হিমের ভেতর অস্থির হয়ে উঠল বিনুরা। হঠাৎ শ্যামল এক কান্ড করে বসল, বোম টিপে হাতের টর্চটা জ্বেলে ফেলল। মশারির গায়ে আলো পড়তেই দুটি ঘনবদ্ধ যুবক যুবতী ছিটকে দু’ধারে সরে গেল। তারপরেই যুবকটি তীক্ষ্ণ গলায় চেঁচিয়ে উঠল, কে, কে রে, চোর–
মেয়েটিও চেঁচাতে লাগল, চোর, চো–
ততক্ষণে আলো নিবিয়ে ফেলেছে শ্যামল। একমুহূর্ত বিমূঢ়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকল তারা। তারপর সারা বাড়ির দরজা জানালা খোলার আওয়াজ কানে আসতেই উধ্বশ্বাসে ছুট লাগাল এবং চোখের পলকে এর চেঁকিঘরের পাশ দিয়ে, ওর বাগানের ভেতর দিয়ে, তার উঠোন ডিঙিয়ে নদীর পাড়ে এসে পড়ল।
নদীর পাড়ে স্টিমারঘাটের কাছে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে অশোক শ্যামলকে বলতে লাগল, তুমি কী ছেলে বল তো! ফস করে টর্চ জ্বেলে দিলে!
কাজটা যে ভাল হয় নি, শ্যামল আগেই বুঝতে পেরেছিল। সে চুপ করে থাকল।
অশোক আবার বলল, টর্চটা জ্বেলেছিলে জ্বেলেছিলে, একটু পরে যদি জ্বালতে—
শ্যামল বলল, পরে জ্বাললে কী হত?
চোখের তারা নাচিয়ে অশোক বলল, আরও মজা দেখতে পেতে।
একধারে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল বিনু। ভয়ে উত্তেজনায় তার বুকের ভেতরটা ভীষণ কাঁপছিল। আর সেই কাঁপুনির মধ্যে, কেন কে জানে, ঝুমার কথা খুব মনে পড়ে যাচ্ছিল তার।
.
২.৪৩
রাজদিয়ায় আসার পর কিছুদিন বেশ ভালই ছিলেন সুরমা। কাগজের মতো সাদা ফ্যাকাসে শরীরে লালচে আভা দেখা দিয়েছিল। নিষ্প্রভ চোখে আলোর খেলা শুরু হয়েছিল, রুগ্ণ মুখে লাবণ্য ফুটি ফুটি করছিল। চোখের কোলে, শীর্ণ আঙুলের মাথায় রক্তের সঞ্চার চোখে পড়ছিল।
কিন্তু কদিন আর। তারপরই আবার অসুস্থ হয়ে পড়লেন সুরমা। টিপটিপে বৃষ্টির মতো একটানা অসুখ চলছিলই। তার মধ্যেই ভাত খেতেন, স্নান করতেন, হেঁটে চলে বেড়াতেন।
কিন্তু এ বছর শীত পড়তেই একেবারে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছেন সুরমা। লারমোর রোজ সকালবেলা একবার করে তাকে দেখে যান। সুরমার অসুখটা হার্টের, হৃৎপিন্ডটি খুবই দুর্বল। তার ওপর নানারকম স্নায়বিক উপসর্গ রয়েছে।
এবার শুয়ে পড়বার পর থেকেই কেমন যেন হয়ে গেছেন সুরমা। যত দিন যাচ্ছে, মৃত্যুভয় চারদিক থেকে তাকে যেন ঘিরে ধরতে শুরু করেছে। প্রায় সারাদিনই ক্ষীণ সুরে তিনি বলে যান, ওগো, সুধা সুনীতির বিয়ের ব্যবস্থা কর।
অবনীমোহন বলেন, হবে হবে, আগে তুমি সেরে ওঠ।
এবার আমি আর উঠব না। মন বলছে, এই শোওয়াই আমার শেষ শোওয়া।
কী আজে বাজে বলছ! ঠিক সেরে উঠবে তুমি, আবার আগের মতো সুস্থ হবে।
বিচিত্র হাসেন সুরমা, যতই ভোলাতে চাও না, এবার আর আমার রেহাই নেই। বেচে থাকতে থাকতে সুধা সুনীতির বিয়ে দাও। দেখে শান্তিতে চোখ বুজি।
সুরমা কোনও কথাই যখন শুনবেন না তখন কী আর করা। সুধার জন্য হিরণকে একরকম ঠিক করাই আছে। শুধু হিরণের ঠাকুরদা আর জেঠাইমাকে কথাটা জানাতে হবে। হেমনাথ যখন আছেন তখন তার কথার ওপর ওঁরা কিছু বলবেন না। হিরণ সম্বন্ধে তার মতামতই চুড়ান্ত।
সুনীতির সঙ্গে আনন্দর বিয়ের ব্যাপারে অবনীমোহন আর হেমনাথ একদিন রামকেশবের বাড়ি গেলেন। তারপর রামকেশব শিশির এবং স্মৃতিরেখার সঙ্গে পরামর্শ করে মধুপুরে আনন্দর বাবাকে চিঠি লেখা হল। ইকুয়েশনের সময় ওঁরা ওখানে চলে গেছেন। শিশির স্মৃতিরেখা এবং রামকেশবও আনন্দর বাবাকে চিঠি লিখলেন।
দিন কয়েকের ভেতর উত্তর এসে গেল। ছেলে বড় হয়েছে, তাকে সংসারী করবার জন্য আনন্দর বাবা পাত্রীর খোঁজ করছিলেন। সুনীতিকে যদি ছেলের পছন্দ হয়ে থাকে, এ বিয়েতে তার আপত্তি নেই। শিগগিরই তিনি রাজদিয়া আসছেন। সাক্ষাতে অন্য কথা হবে।
দিন পনেরর ভেতর মধুপুর থেকে আনন্দর বাবা-মা ভাই-বোনেরা এসে পড়ল। হেমনাথ এবং অবনীমোহনের সঙ্গে কথা বলে, সুনীতিকে দেখে আনন্দর বাবা এবং মা খুবই সন্তুষ্ট। এক কথায় বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। স্থির হল, মাঘ মাসে ধান কাটার পর বিয়েটা হবে।
বিয়ের ক’দিন আগে এক দুপুরবেলায় মাঠের দিক থেকে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে ছুটতে কুমোরপাড়ার হাচাই পাল এসে হাজির। ভয়ে চোখের তারা ঠিকরে বেরিয়ে আসছে তার।
স্নেহলতা উঠোনের একধারে তুলসী মঞ্চের পরিচর্যা করছিলেন। সুধা-সুনীতি বিনু-ঝিনুক, বাড়ির সবাই দাঁড়িয়ে ছিল।
