প্রথম দিকে বিনু অশোকদের সঙ্গে কথা বলছিল না। অশোকরাও মুখ বুজেই ছিল। আড়চোখে তিন জন তিন জনকে দেখে যাচ্ছিল শুধু।
নদীর পাড়ে এসে অশোক আর পারল না। বিনুর কাছে নিবিড় হয়ে এসে বলল, সেই লোকটা সেদিন তোমাকে কান ধরে বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিল?
বিনু বুঝল, মজিদ মিঞার কথা বলছে অশোক। বিব্রতভাবে বলল, হ্যাঁ।
লোকটা এক নম্বরের ডাকাত।
বিনু উত্তর দিল না।
অশোক আবার বলল, বাড়ি নিয়ে গিয়ে তোমাকে মেরেছিল?
মুখ নিচু করে বিনু মাথা নাড়ল।
অশোক আবার বলল, খুব?
হ্যাঁ। মারের চোটে জ্বর এসে গিয়েছিল।
গভীর সহানুভূতির গলায় অশোক বলল, ইস, এমন করে কেউ মারে! খানিক নীরব থেকে আবার বলল, আমাকেও বাবা খুব মার দিয়েছিল।
তাই নাকি?
মারতে মারতে বাড়ির বাইরে বার করে দিয়েছিল। ঠাকুমা গিয়ে আমাকে ফিরিয়ে এনেছে।
এতক্ষণ শ্যামল চুপ করে ছিল। এবার মুখ খুলল, তোমাদের শুধু মেরেই ছিল, আমার অবস্থা কী হয়েছিল জানো?
ধীরে ধীরে বিব্রত ভাবটা কেটে যাচ্ছিল বিনুর। উৎসুক সুরে সে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছিল?
শ্যামল বলতে লাগল, মার তো খেয়েছিলামই, তার ওপর দুদিন কিছু খেতে দেয় নি।
আহা রে–
দেখা গেল তিনজনেই তিনজনের দুঃখে দুঃখী, সমব্যথী। একটি রাত একসঙ্গে জাগবার আগেই তাদের বন্ধুত্ব আবার আগের মতো গাঢ় হয়ে গেল।
.
ওধারে লালমোরের গির্জা আর এধারে সারি সারি মিষ্টির দোকানগুলোর সামনে ঘন হিজলবন। নদীর দীর্ঘ পাড় ধরে ডিফেন্স পার্টির ছেলেরা কতবার যে টহল দেয়। নদীর জলে সন্দেহজনক কিছু নড়তে দেখলেই তারা থমকে দাঁড়ায়, একসঙ্গে পাঁচটা টর্চ জ্বলে ওঠে।
সবে অঘ্রাণ পড়েছে। কিন্তু এরই ভেতর জল-বাংলার এই ছোট্ট নগণ্য শহরটিতে শীত নেমে গেছে।
নদীর দিক থেকে যে উলটোপালটা জলো হাওয়া ঘোড়া ছুটিয়ে যায় তা বরফের মতো ঠান্ডা। গুঁড়ো গুঁড়ো হিমে নদী, আকাশ, দূরের ঝাউবন, সারি সারি হিজলগাছ কিংবা রাজদিয়া শহরের বাড়িঘর, মিলিটারি ব্যারাক–সব কেমন যেন ঝাঁপসা।
সারা গা আলোয়ানে মুড়ে, কানে মাথায় কম্ফোর্টার জড়িয়েও শীত কাটে না।
একদিন ডিফেন্স পার্টির সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে মানিক বলল, আজ বড় ঠান্ডা, না? মানিক নাহা। বাড়ির ছেলে, মাসখানেক হল কলকাতা থেকে এসে এখানকার কলেজে বি.এ’তে ভর্তি হয়েছে। বিনুদের গ্রুপটার সে. নেতা।
অন্য ছেলেরা হি হি কাঁপতে কাঁপতে বলল, হ্যাঁ মানিকদা—
একটা জিনিস খেলে শীতটা কিন্তু কেটে যেত।
কী?
পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বার করে দেখাল মানিক।
আবার সিগারেট! বিনু চমকে উঠল। লক্ষ করল, অশোক শ্যামলও খুব একটা আরাম বোধ করছে না।
বিনু বলল, আমি তো সিগারেট খাই না। মজিদ মিঞার মারের কথা ভেবে মনে আর সুখ নেই তার। অশোক শ্যামলও তাই বলল।
মানিক বলল, যা শীত! এক আধটা খেলে গা গরম হয়ে যাবে। হি হি করে কাঁপছ। কাপুনি বন্ধ হবে। নাও নাও, সবাই একটা করে নিয়ে ধরিয়ে ফেল।
কিন্তু—
কী?
কেউ যদি দেখে ফেলে?
এই শীতের রাত্তিরে তোমাদের সিগারেট খাওয়া দেখবার জন্যে লোকের বাইরে বেরুতে বয়ে গেছে। সবাই লেপ মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছ, দেখ গে। সিগারেট টেনে ভাল করে পেয়ারাপাতা চিবিয়ে বাড়ি যাবে, কেউ টেরও পাবে না।
কিন্তু–
আবার কী?
আপনি রয়েছেন।
আমার কাছে লজ্জা কী। আমরা সবাই বন্ধু—ফ্রেন্ড–
কোনও অজুহাতই খাটল না, একটা করে সিগারেট নিতেই হল সবাইকে।
আবার সিগারেট খাওয়া শুরু হয়েছে। ডিফেন্স পার্টিতে রাত জাগতে এসে শুধু কি সিগারেট খাওয়া, আরও চমকপ্রদ সব ব্যাপার ঘটতে লাগল।
একদিন রাত্রিবেলা বিনু আর শ্যামলকে অন্য সবার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে অশোক বলল, আজ আর আমরা ওদের সঙ্গে সঙ্গে নদীর পাড়ে ঘুরব না।”
বিনু শুধেলো, তা হলে কী করবে?
এক জায়গায় যাব।
কোথায়?
চোখ টিপে রহস্যময় হেসে অশোক বলল, চল না। গেলেই বুঝতে পারবে। দারুণ মজা হবে।
অশোক শ্যামল এবং বিনুকে নিয়ে মল্লিকদের ঝুপসি বাগান পেরিয়ে একটা ঘরের বন্ধ জানালার সামনে এসে দাঁড়াল।
বিনু বলল, এখানে কী?
চাপা গলায় অশোক বলল, একদম চুপ। কথা না বলে জানালায় কান দিয়ে দাঁড়াও।
দিন কয়েক আগে মল্লিকদের ছোট ছেলে সুখরঞ্জনের বিয়ে হয়েছে। এটা তাদেরই ঘর। বিনু তা জানে। খুব নিচু গলায় সে কথা অশোককে বললও।
বিরক্ত সুরে অশোক বলল, ছেলেটা তো খালি বক বক করে! মুখ বুজে জানালায় একটু কান পাতো ভাই–
জানালায় কান রাখতেই সমস্ত শরীর ঝিমঝিম করতে লাগল। সুখরঞ্জন যা যা বলে তার বউকে আদর করছে, এমন সব সোহাগের ভাষা আগে কখনও শোনেনি বিনু।
অনেকক্ষণ পর সুখরঞ্জনদের গলা ঘুমে জড়িয়ে এল। তখন অশোক বলল, চল—
বাগানের বাইরে বড় রাস্তায় এসে অশোক আবার বলল, কিরকম লাগল?
শ্যামল শিস টানার মতো শব্দ করে বলল, সত্যি মজাদার।
কী বলেছিলাম?
বিনু বলল, এখানকার খবর তুমি কি করে জানলে?
মুরুব্বিআনা চালে হেসে অশোক বলল, অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। একটু থেমে আবার বলল, আরও অনেক জায়গার খবর আমি জানি।
বল না, বল না—
একদিনে সব শুনে ফেললে তারপর কী করবে? একটু ধৈর্য ধর।
.
এরপর থেকে ডিফেন্স পার্টির সঙ্গে রাত জাগতে এসে তিনজন এক ফাঁকে সরে পড়ে। যুবতী স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে যুবকেরা যেখানে শুয়ে থাকে, বিনুরা গিয়ে তাদের ঘরের জানালায় কান পাতে।
