শুধু রাজদিয়ারই নয়, চারদিকের গ্রাম-গঞ্জ-জনপদ, সব জায়গার নৌকোই আটক করা হয়েছে।
নৌকো আটকের পর একটা সপ্তাহও কাটল না।
সেদিন স্কুলে যাবার সময় বিনু দেখতে পেল, নদীর পাড়ে বিরাট ভিড় জমেছে। পায়ে পায়ে এগিয়ে একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখে সে বিমূঢ় হয়ে যায়।
শত শত লোক নদী সাঁতরে রাজদিয়ার দিকে আসছে। তারা পাড়ে উঠতেই কে যেন জিজ্ঞেস করল তোমরা কুনখানের মানুষ?
আগন্তুকদের মধ্যে একজন বলল, চরবেউলার।
নদী সাতইরা আইলা যে?
কী করুম, গরমেন নাও লইয়া গ্যাছে। হেয়া ছাড়া আমাগো চরে এক দানা চাউল নাই। পোলামাইয়া লইয়া না খাইয়া জান যায়।
আরেকজন বলল, হুদা (শুধু) আমাগো চর নিকি, কুনোচরেই চাউল নাই। দ্যাখেন না,দুই-একদিনের ভিতরে আরও কত মানুষ রাইজদায় আসে।
সত্যিই দেখা গেল, কয়েকদিনের মধ্যে অসংখ্য মানুষ খাদ্যের আশায় রাজদিয়াতে হানা দিল।
লোকগুলো সারাদিন মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে বেড়ায় আর গোঙানির মতো শব্দ করে বলে, দু’গা ভাত দিবেন মা, ইউ ফ্যান দিবেন–
বিমর্ষ হেমনাথ বলতে লাগলেন, দুর্ভিক্ষ–দুর্ভিক্ষ শুরু হয়ে গেছে।
.
২.৪২
শুধু নদীর চরগুলো থেকেইনয়, চারদিকের গ্রাম-গঞ্জ থেকেও খাদ্যের সন্ধানে কত মানুষ যে রাজদিয়া ছুটে এল। এমনকি আঞ্জুমান বেবাজিয়ানীরা পর্যন্ত এসেছে। থানা থেকে তাদের নৌকোও ‘সিজ’ করে নিয়েছে। যুদ্ধ ভাসমান বেদে-বহরকেও রেহাই দেয় নি।
আজকাল সমস্ত রাজদিয়া জুড়ে দিনরাত শুধু শোনা যায়, মা জননী, দু’গা ভাত দ্যান, ইট্র ফ্যান দ্যান। না খাইয়া খাইয়া শরীলে আর দ্যায় না।
রাস্তায় বেরুলেই চোখে পড়ে কঙ্কালসার প্রেতের মতো দলে দলে মানুষ দুর্বল, অশক্ত পায়ে টলমল করে হাঁটছে। এক দুয়ার থেকে তাড়া খেয়ে যাচ্ছে আরেক দুয়ারে।
অবশ্য রাজদিয়াবাসীরা একেবারে নির্দয় নয়। সব বাড়ি থেকে চাল ডাল যোগাড় করে শহরের দু’মাথায় দু’টো লঙ্গরখানা খোলা হয়েছে। সারাদিন পর বেলা হেলে গেলে মাথাপিছু দু’হাতা করে তরল ট্যালটেলে খিচুড়ি দেওয়া হতে লাগল।
কিন্তু দেশজোড়া দুর্ভিক্ষের বিরুদ্ধে দু’টো মোটে লঙ্গরখানা খাড়া করে কতক্ষণই বা যুদ্ধ চালানো যায়! কটা লোককেই বা খাওয়ানো চলে!
কাজেই চারদিকে চুরির হিড়িক পড়ে গেল।
বাজার থেকে ধান চাল উধাও হবার পর থেকেই চুরি শুরু হয়েছিল। কিন্তু এখন যা চলেছে তার সঙ্গে আর কিছুর তুলনাই হয় না।
থালা-ঘটি-বাটি-গাড়-বদনা, কাসা বা পেতলের এক টুকরো বাসনও বাইরে ফেলে রাখার উপায় নেই। রান্না করা ভাত-তরকারি পর্যন্ত নিয়ে যাচ্ছে। তবে সব চাইতে বেশি যা চুরি হচ্ছে তা ধান।
কার্তিকের মাঝামাঝি মাঠের জল নেমে গিয়েছিল। রাজদিয়ার দক্ষিণে এসে দাঁড়ালে, যতদূর চোখ যায়, এখন শুধু ধান, ধান আর ধান।
সবে অঘ্রাণ পড়েছে। এই মাসের শেষ থেকে আমনের মরশুম। ধানের শিষগুলো এখনও কাঁচাই রয়েছে। তাতে সোনালি আভা লাগেনি। সবুজ তুষের ভেতরকার শস্য এখনও যথেষ্ট পুষ্ট নয়। তা হলে কি হবে, রাতের অন্ধকারে ক্ষুধার্ত মানুষ মাঠকে মাঠ কাঁচা ধানই কেটে নিয়ে যাচ্ছে।
ধানই যদি চলে যায়, সারা বছর লোকে খাবে কী? চুরি ঠেকাবার জন্য রাজদিয়ার সব বাড়ি থেকে ছেলে যোগাড় করে ডিফেন্স পার্টি তৈরি হল।
ডিফেন্স পার্টির দুটো কাজ। প্রথমত, রাত জেগে জেগে জমির ধান পাহারা দেওয়া। দ্বিতীয়ত, নদীর ধারে ধারে ঘুরে মহাজনী নৌকাগুলোর ওপর নজর রাখা।
এ অঞ্চলের প্রায় সব নৌকোই যুদ্ধের কল্যাণে ‘সিজ’ করা হয়েছে। তবে ‘স্পেশাল পারমিট’ নিয়ে কেউ কেউ দু’একখানা রাখতে পেরেছে। যেমন ব্যবসাদারেরা।
যুদ্ধ আর দুর্ভিক্ষ শুরু হবার পর ধানচাল জামা কাপড়ের কারবারীরা আর মানুষ নেই। দুঃশাসনের মতো সারা দেশকে বিবস্ত্র এবং নিরন্ন করে তারা মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
রাতের অন্ধকারে বেশি লাভের আশায় ব্যবসায়ীরা নৌকো বোঝাই করে রাজদিয়ার ধান চাল এবং অন্যান্য সব শস্য দূর-দূরান্তে পাচার করে দিতে চাইছে। ডিফেন্স পার্টি তা হতে দেবে না। ঘুরে ঘুরে তারা মহাজনী নৌকো ধরছে।
সব বাড়ি থেকেই দু’টি একটি করে যুবক নেওয়া হয়েছে ডিফেন্স পার্টিতে। ঠিক ওই বয়সের ছেলে হেমনাথের বাড়িতে নেই। কাজেই বিকেই দলে নিতে হল।
যুদ্ধের দৌলতে রাজদিয়ায় তো কম ছেলে নেই। সবাইকে একসঙ্গে রাত জাগতে হয় না। ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হয়ে পালা করে তারা জাগে। আজ এর পালা পড়লে কাল ওর। সপ্তাহে দুদিন জাগতে হয় বিনুকে।
ছেলেরা রাত জাগবে। তাই বাড়ি বাড়ি চাঁদা তুলে পাঁচ ব্যাটারির বড় বড় অনেকগুলো টর্চ কেনা হয়েছে, চা আর মুড়মুড়ে এস’ বিস্কুটের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
প্রথম দিন রাত জাগতে এসে বিনু দেখল, তার দলে শ্যামল আর অশোকও রয়েছে।
মজিদ মিঞার হাতে মার খাবার পর অশোক শ্যামলের সঙ্গে তেমন মিশত না বিনু। অশোকরাও। খুব সম্ভব মার খেয়েছে। মজিদ মিঞা ওদের বাড়ি গিয়েও সিগারেট খাবার কথা বলে এসেছিল। মারটার খাবার পর দু’পক্ষই পরস্পরকে মোটামুটি এড়িয়ে যাচ্ছিল।
ডিফেন্স পার্টিতে তার দলে অশোকরা না থাকলেই ভাল হত। বিনুর খুব অস্বস্তি হতে লাগল।
বিনুদের দলে সবসুদ্ধ বারটি ছেলে। তাদের কাজ হল, নদীর পাড়ে ঘুরে ঘুরে ধান চাল বোঝাই মহাজনী নৌকো খোজা। টর্চ নিয়ে তারা বেরিয়ে পড়ল।
