স্নেহলতা বললেন, কোথায় ছিলে তবে?
আমার এক বন্ধুর বাড়ি টিকাটুলিতে। তার কাছে ছিলাম। ভবতোষ বললেন।
বৌমা কি সত্যিসত্যিই ওখানে থেকে যাবে?
হ্যাঁ।
তোমার শ্বশুরমশায় কী বললেন?
এই ঘর বুঝি বায়ুশূন্য। শ্বাস টানতেও ভবতোষের কষ্ট হচ্ছে। অবরুদ্ধ গলায় বললেন, তার কিছু বলবার নেই, মেয়েকে যথেষ্ট বকাবকি করেছেন। বকাই সার।
শাশুড়ি?
তিনিও মেয়েকে প্রশ্রয় দেননি। আমার সঙ্গেই ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এনে কী করব বলুন?
বিমর্ষ সুরে স্নেহলতা বললেন, সে তো ঠিকই।
ভবতোষ বলতে লাগলেন, আমার বন্ধুটি যার কাছে দু’দিন কাটিয়ে এলাম সে জগন্নাথ কলেজের অধ্যাপক। একসঙ্গে ঢাকায় ইউনিভাসিটিতে পড়তাম। তাকে পাঠিয়েছিলাম বোঝাবার জন্যে। কিন্তু–
কী? ঝিনুকের মা’র এক কথা, আমার সঙ্গে ঘর করবে না। রাজদিয়াতেও আর কখনও ফিরবে না।
কেউ লক্ষ করে নি, একদৃষ্টে ভবতোষের দিকে তাকিয়ে সব কথা শুনে যাচ্ছিল ঝিনুক। হঠাৎ জোরে জোরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
সবাই চমকে ঝিনুকের দিকে ফিরল। ভবতোষ আর স্নেহলতা প্রায় একসঙ্গেই বলে উঠলেন, কাঁদছিস কেন ঝিনুক?
ফোঁপানি থামে নি, ক্রমশ সেটা উচ্ছ্বলিত হয়ে উঠতে লাগল। এদিকে লাফ দিয়ে তক্তপোশ থেকে নেমে হিরণ ঝিনুককে কোলে তুলে নিল। মাথায় কপালে হাত বুলোতে বুলোতে, আদর করতে করতে বলতে লাগল, কাঁদে না। তুমি লক্ষ্মী মেয়ে, সোনা মেয়ে। ভাল মেয়ে
কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলতে থাকে ঝিনুক। জড়ানো জড়ানো, আধফোঁটা, আধভাঙা গলায় বলতে লাগল, মা আর আসবে না। মা আর আসবে না।
ভর্ৎসনার সুরে ভবতোষের দিকে তাকিয়ে হিরণ বলল, কেন যে তোমরা মেয়েটার সামনে এসব নিয়ে আলোচনা কর। এর আগেও একবার এ ব্যাপারে স্নেহলতাকে বকেছে সে। হিরণ দাঁড়াল না, ঝিনুককে নিয়ে বৃষ্টির ভেতরেই উঠোন পেরিয়ে ওধারের একটা ঘরে চলে গেল। আর এ ঘরে সময় যেন গতি হারিয়ে স্তব্ধ হয়ে রইল। ঝিনুকের সামনে এ প্রসঙ্গ তোলা যে খুবই অন্যায় হয়েছে, নীরবে সবাই তা অনুভব করতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর পাতের ভাতগুলো নাড়াচাড়া করে উঠে পড়লেন ভবতোষ।
স্নেহলতা ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, ও কি, কিছুই তো প্রায় খেলে না। সব পড়ে রইল।
বিস্বাদ সুরে ভবতোষ বললেন, আমার আর খেতে ইচ্ছা করছে না খুড়িমা—
স্নেহলতা পীড়াপীড়ি করলেন না।
আঁচিয়ে এসে ভবতোষ বললেন, হেমকাকাকে তো দেখছি না।
উনি কেতুগঞ্জ গেছেন। স্নেহলতা বললেন।
কখন ফিরবেন?
স্নেহলতা বললেন, সে কথা জিজ্ঞেস করো না বাপু। আজও ফিরতে পারেন, কালও পারেন, পরশুও পারেন। তোমার কাকাটিকে তো চেনোই। আমি একটা সময় বলি, উনি হয়তো তখন এলেন না। মাঝখান থেকে আমি মিথ্যেবাদী সাজতে পারব না। হেমনাথ সম্পর্কে প্রায় এরকম কথাই খানিক আগে অবনীমোহনকেও বলেছিলেন তিনি।
ভবতোষ মৃদু হাসলেন। একটু চুপ করে থেকে বললেন, আমি তা হলে এখন যাই। খুড়িমা–
এখুনি যাবে?
হা। সন্ধে হয়ে এল। মেয়েটাকে নিয়ে আবার অনেকটা রাস্তা যেতে হবে।
ঝিনুককে সত্যিই নিয়ে যেতে চাইছ?
হ্যাঁ।
কেন?
আপনাদের কাছে দু’দিন তো রইল। ভয়ানক দুষ্ট। তার ওপর এঁরা সব এসেছেন–
ভবতোষের ইঙ্গিত বুঝতে পারলেন স্নেহলতা নিজের দায়িত্বভার অকারণে অন্যের ওপর দিয়ে রাখতে তিনি কুণ্ঠিত হচ্ছেন।
স্নেহলতা বললেন, আমার কাছে মাঝে মাঝে তো দিয়ে যাও। এখানে থাকার অভ্যেস ওর আছে, বেশ ভালই থাকে। দুষ্টুমির কথা বলছ? ওটুকু দুষ্ট সব ছেলেমেয়েই। আর ওরা এসেছে তো কী হয়েছে। ওদের সঙ্গে হইচই করে বেশ থাকবে, মায়ের কথা মনে পড়বে না। বরং–
বরং কী?
একটু ইতস্তত করে স্নেহলতা বললেন, তোমার বাড়িতে তুমি একা। দিনরাত লেখাপড়া নিয়েই থাকো। ঝিনুকটা না পাবে একটা খেলার সঙ্গী, না পাবে কারোর সঙ্গে কথা বলতে। ও এখানেই থাক।
ভবতোষ আস্তে আস্তে বললেন, আমার মনটা ভাল নেই খুড়িমা, আজ ও চলুক। দু’একদিন পর না হয় দিয়ে যাব।
চুঁইয়ে চুঁইয়ে জল আসার মতো অদৃশ্য গোপন পথে অনেকখানি দুঃখ এই ঘরে ছড়িয়ে পড়েছিল। স্নেহলতা বুঝতে পারলেন, আজকের দিনটা অন্তত ঝিনুককে কাছে পাওয়া দরকার ভবতোষের। মেয়ের সঙ্গ তাকে খানিক সান্ত্বনা দিতে পারে। গাঢ় সহানুভূতির সুরে তিনি বললেন, আচ্ছা, নিয়েই যাও।
ভবতোষ বললেন, রাগ করলেন না তো খুড়িমা?
পাগল ছেলে। তোমার ওপর কি রাগ করতে পারি!
একটু চুপ করে থেকে ভবতোষ বললেন, এখন থেকে ঝিনুকের সব দায়িত্ব আপনাকেই নিতে হবে। আমার কলেজ খুললে ওকে কে দেখবে? আপনি ছাড়া মেয়েটাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। নির্ঘাত ও মরে যাবে।
ওসব আজ বাজে কথা বলতে নেই।
তা হলে এখন যাই?
এস।
দরজার দিকে পা বাড়াতে গিয়ে অবনীমোহনের কথা মনে পড়ে গেল ভবতোষের। ফিরে দাঁড়িয়ে বললেন, আমাদের বাড়ি একদিন বেড়াতে যাবেন।
অবনীমোহন বললেন, আপনিও আসবেন।
আসব।
শরতের বৃষ্টি, এই আছে এই নেই। একটু আগেই স্বল্পায়ু শৌখিন বর্ষণ থেমে গেছে। ভবতোষ ঘর থেকে বাইরে এলেন, অন্য সবাইও সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গে এল।
ডাকাডাকি করে ও ঘর থেকে ঝিনুক আর হিরণকে বার করলেন স্নেহলতা। কী একটা মজার কথা হচ্ছিল দু’জনের। খুব হাসতে হাসতে ওরা এল। এর মধ্যেই ঝিনুককে ভুলিয়ে ভালিয়ে অন্যমনস্ক করে ফেলেছে হিরণ।
ফিটনটা উঠোনে দাঁড়িয়ে ছিল। স্নেহলতা বললেন, ঝিনুককে গাড়িতে তুলে দে হিরণ।
