দেখতে দেখতে একসময় বেহুঁশ হয়ে পড়ল বিনু। জ্ঞান ফিরলে দেখল, সদর হাসপাতালে শুয়ে আছে, পায়ে মস্ত ব্যান্ডেজ। তার পাশের বেডে মোতাহার সাহেব। চারদিকের সারি সারি বেডগুলোতে আরও অনেক ছেলে। বেড বেশি নেই বলে অনেককে মেঝেতে ফেলে রাখা হয়েছে।
হাসপাতালে সাত দিন থাকতে হল। এর ভেতর হেমনাথ আর ঝিনুক রোজই আসে।
ঝিনুক ছলছল করুণ চোখে তাকিয়ে বলে, তোমার খুব লেগেছে, না বিনুদা?
বিনু হাসে, না, তেমন কিছু নয়।
সুরমা, অবনীমোহন, সুধা সুনীতি একদিন পর পর এসে দেখে যায়। ঝুমাও এল একদিন। ঠোঁট টিপে বলল, আচ্ছা বীরপুরুষ।
হাসপাতালে থাকার সময় বিনু লক্ষ করেছে, দিনরাত পুলিশ সারা হাসপাতালটা ঘিরে রেখেছে। সাত দিন পর পুলিশের পাহারাতেই কোর্টে যেতে হল। তাদের বিরুদ্ধে থানা আক্রমণের অভিযোগ আনা হয়েছে।
বিচারে পনের দিনের জেল হয়ে গেল বিনুর, মোতাহার সাহেবের হল দু’মাস। অন্য ছেলেদেরও দশ থেকে পনের দিনের সাজা হল।
মুক্তির দিন জেল গেটে সে কী দৃশ্য! সারা রাজদিয়া যেন ভেঙে পড়েছে সেখানে। বিনুরা বেরিয়ে আসতেই কারা যেন গলায় ফুলের মালা দিয়ে তাকে কাঁধে তুলে ফেলল। কাঁধে চড়েই বাড়ি ফিরল সে।
জেল-খাটা, পা-ভাঙার জন্য অবনীমোহন বা সুরমা সুখী নন। তারা বলতে লাগলেন, হই চই করে কতগুলো দিন নষ্ট করল। এ বছর কিছুতেই ও পাশ করতে পারবে না। একটা বছর মাটি হবে।
হেমনাথ বিনুর পক্ষ নিয়ে বললেন, হোক নষ্ট, পড়াশোনার জন্য সারা জীবন পড়ে আছে, কিন্তু এমন দিন আর কখনও আসবে না। সেদিন নিজে থেকে প্রশেসনে না গেলে আমিই ওকে দিয়ে আসতাম।
‘ভারত ছাড়’ আন্দোলন উত্তেজনা কেটে যেতে বেশ সময় লাগল। তারপর স্কুল, পড়াশোনা, ছুটির পর ঝুমাদের বাড়ি যাওয়া, ঝিনুকের সঙ্গে লুকোচুরি দিয়ে ঘেরা সেই পুরনো অভ্যস্ত জীবনের ভেতর আবার ফিরে গেল বিনু।
২.৪১-৪৫ অবনীমোহনের সঙ্গে একদিন হাটে
২.৪১
অবনীমোহনের সঙ্গে একদিন হাটে গিয়ে বিনু দেখে এসেছিল, একদানা ধানচাল পাওয়া যাচ্ছে না। নদীর পাড় ঘেঁষে সারি সারি আড়তগুলো তালাবন্ধ। বিনু শুনে এসেছিল, এখান থেকে বিশ মাইল উত্তরে গিরিগঞ্জ নামে যে বাজারটা আছে সেখানে ক’টা ধানচালের দোকান লুট হয়ে গেছে।
সেই থেকে অবস্থা দিন দিন আরও খারাপ হয়ে যাচ্ছে। সারা রাজ্য থেকে খাদ্যশস্য উধাও হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে দূর দূরান্তের হাট থেকে লুটপাটের খবর আসে। চারদিকের গ্রামগুলো থেকে, নদীর চরগুলো থেকে আরও যা খবর পাওয়া যায় তা ভয়াবহ। ধানচাল নেই, তাই ওসব জায়গার বাসিন্দারা মেটে আলু, মিট কুমড়ো, কচু, কন্দ, শাপলা শালুক সেদ্ধ করে প্রথম দিকে চালিয়েছে। তারপর আমাপাতা, জামপাতা, শিউলি পাতা, যা পেয়েছে তাই খেয়েছে। এখন নাকি ইঁদুর, খরগোশ পুড়িয়ে খাচ্ছে।
ধানচাল উধাও হবার পর হেমানাথের বাড়ি লোকজনের আনাগোনা বেড়ে গেছে। প্রতিদিনই দুপুরে আট দশ জন করে বাইরের লোক খেয়ে যাচ্ছে। আজকাল নিবারণ পিওন প্রায়ই আসে। এছাড়া এ গ্রামের, ও গ্রামের চেনা-অচেনা কত মানুষ যে আসছে। ঠিক দুপুরবেলা বার-বাড়ির উঠোনে এসে করুণ গলায় তারা বলে, অতিথ আসলাম গো মা-ঠাইরেন, পাঁচ দিন প্যাটে ভাত পড়ে নাই।
এ তো গেল দুপুরবেলার কথা, রাতের অন্ধকারে যুগীপাড়া-ঋষিপাড়া-নমঃশূদ্রপাড়ার বৌ-ঝিরা আসে। স্নেহলতাকে বলে, দুই মুঠা চাউল দ্যান গো বইনদিদি, তিনদিন আখা (উনুন) ধরাই নাই।
চিরদিন স্নেহলতা বা হেমনাথ দিয়ে এসেছেন, কাউকে কখনও বিমুখ করেন নি। এই দুঃসময়েও তারা দিয়েই যাচ্ছেন। কিন্তু এভাবে কতদিন চলবে, কে জানে।
প্রতি বছরই মাঠ থেকে ধান উঠবার পর খোরাকির চাইতে কিছু বেশি রেখে বাদবাকি বেচে দেন হেমনাথ। যেভাবে লোকজন খেয়ে যাচ্ছে, যুগীপাড়া-ঋষিপাড়ার বউ-ঝিরা চাল নিচ্ছে, তাতে নিজেদেরই হয়তো একদিন উপোস দিয়ে থাকতে হবে। কিন্তু পরের কথা ভেবে স্নেহলতা বা হেমনাথ মন ভারক্রান্ত করেন না। পরে যা হবার হবে, এখন মানুষের প্রাণ তো বাঁচুক।
.
দেখতে দেখতে আরেক পুজো চলে গেল।
পুজোর পর মাঠের জলে যখন টান ধরল, ধানের শিষগুলো গাঢ় সবুজ হয়ে এল, সেইসময় একদিন হরিন্দ এবং তার দুই মোষের মতো ঢাকী কাগা বগা রাজদিয়ার রাস্তায় ঢেঁড়া দিয়ে গেল। যার যত নাও আছে, তিন দিনের ভিতরে হগল থানায় জমা দিবা। গরমেনের হুকুম। জমা না দিলে বিপদ আছে–
বিনু স্কুলে যেতে যেতে ঢেঁড়া শুনে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, নৌকো জমা দিতে হবে কেন?
হরিন্দ যা বলল তা এইরকম। জাপানিরা যে কোনও দিন পূর্ব-বাংলায় এসে পড়তে পারে। এসেই যদি নৌকো পেয়ে যায়, মিত্রশক্তির পক্ষে বিপদ ঘটে যাবে। তাই সতর্কতা এবং নিরাপত্তার কারণে নৌকো আটক করা হচ্ছে। বিপদ কেটে গেলেই ফেরত দেওয়া হবে।
বিনু একাই না, রাজদিয়ার আরও অনেকে হরিন্দদের চারপাশে ভিড় জমিয়েছিল। তাদের ভেতর ভীত, সন্ত্রস্ত গুঞ্জন উঠল, হে ভগমান, নাও হইল আমাগো হাত-পাও। নাও যদিন আটকায়, আমরা কী করুম? খাম কী?
এইবার মরণ, মরণ—
তিন দিনের মধ্যেই দেখা গেল, খাল-বিল-নদী শূন্য করে থানার পাশের মস্ত মাঠটায় অসংখ্য নৌকো উঠে এসেছে। গাছি, ভাউলে, মহাজনী, কোষ, একমাল্লাই, দু’মাল্লাই, চারমাল্লাই কত রকমের যে নৌকো তার লেখাজোখা নেই।
