মুত্রাঝোপের পাশে, কাঁটাবেতের বনের ধারে কিংবা আম-জাম-বাতাবি লেবু গাছের তলায় তলায় বিনুরা কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়াল। কিন্তু একটা জায়গাও মনঃপূত হল না।
শেষ পর্যন্ত ঝুমা বলল, চল, পুকুরঘাটে গিয়ে বসি—
বিনু তক্ষুনি সায় দিল, চল–
পুকুরঘাটটা নারকেল গুঁড়ি দিয়ে বাঁধানো। বসতে গিয়েই ঝুমার চোখে পড়ল, ডান ধারে সরু পিঠক্ষীরা গাছটার গায়ে একটা ছোেট একমাল্লাই নৌকো বাঁধা রয়েছে।
ঝুমা তাড়াতাড়ি মত বদলে ফেলল, এখানে বসব না।
তা হলে কোথায় বসবে?
নৌকোয় চড়ব।
নৌকোর নামে বিনুও উৎসাহিত হয়ে উঠল, সেই ভাল। এস—
দু’জন পিঠক্ষীরা গাছটার দিকে এগিয়ে গেল।
প্রথম ঝুমাকে নৌকোয় তুলল বিনু, তারপর নিজে উঠে বাঁধন খুলে বৈঠা হাতে গলুইর কাছে বসল।
ঝুমা বলল, সেবার তুমি আর আমি নৌকোয় করে অথৈ জলে চলে গিয়েছিলাম, মনে আছে। বিনুদা?
হু–বলেই বৈঠার খোঁচায় নৌকোটাকে মাঝ-পুকুরে নিয়ে এল বিনু।
সেবার কিন্তু আমরা নৌকো বাইতে জানতাম না। কী কষ্টে যে পুকুর পার হয়ে ওই ধানখেতের দিকে গিয়েছিলাম!
এবার আর কষ্ট হবে না। আমি নৌকো বাওয়া শিখে গেছি।
সেবারের মতো এবারও চারদিকে শুধু জল। পুকুরের ওপারে ধানখেত, মাঠ–সব একাকার। মাঠের মাঝখানে হিজল আর বন্যা গাছগুলোর বুক পর্যন্ত ডুবে গেছে। হিজলের যে ডালগুলো জলের ওপরে, ফুলে ফুলে সেগুলো ছাওয়া। আর বউন্যা গাছের ডাল থেকে শক্ত শক্ত অসংখ্য গোলাকার ফল ঝুলছে। ধানখেত বাদ দিলে যে মাঠ, সেখানে শুধু শাপলা শালুক আর পদ্মবন।
পুকুর ধানখেত পার হয়ে একসময় শাপলাবনে এসে পড়ল বিনুরা।
হঠাৎ কী একটা কথা মনে পড়তে ঝুমা বলে উঠল, তোমাকে তো নিয়ে এলাম। সেবারের মতো আবার কান্ড করে বসবে না?
কিসের কান্ড?
কাউফল পাড়তে গিয়ে জলে ডুবে গিয়েছিলে, মনে পড়ে? বিনু বলল, এখন আর ডুবব না, সাঁতার শিখে গেছি।
চোখের তারা স্থির করে ঝুমা বলল, বাব্বা, তুমি দেখছি অনেক কিছু শিখে গেছ! নৌকো বাইতে শিখেছ, সাঁতার কাটতে শিখেছ–
বা রে, আমি বড় হয়েছি না।
বড় হয়েছ! বলে নৌকোর মাঝখান থেকে অনেক কাছে চলে এল ঝুমা। তারপর মাথা ঘুরিয়ে এদিক থেকে ওদিকে, মিটমিটি দুষ্টুমির চোখে বিনুকে দেখতে লাগল।
বিব্রত মুখে বিনু বলল, কী দেখছ?
সত্যিই তো বড় হয়ে গেছ। ঠোঁটের ওপর গোঁফ উঠছে—
বিনু লজ্জা পেয়ে চোখ নামাল।
ঝুমা আবার বলল, বড় তো হয়েছ, সিগারেট খাও?
সিগারেট খাওয়ার সঙ্গে যে স্মৃতিটা জড়ানো তা খুব মনোরম নয়। বিনু অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। আস্তে আস্তে মাথা নেড়ে জানালো, সে সিগারেট খায় না।
ঈষৎ ধিক্কারের গলায় ঝুমা বলল, সিগারেট খাও না, তা হলে কী বড় হয়েছ।
বিনু চুপ।
কিছুক্ষণ পর ঝুমা শুধলো, সেই কাউগাছটা এখনও আছে বিনুদা?
বিনু বলল, আছে।
চল, কাউ পাড়ি গে—
কাউ এখনও পাকে নি। কাঁচা কাউ পেড়ে কী হবে?
তা হলে থাক। শাপলাই তুলি।
নৌকোর ধারে গিয়ে ঝুঁকে ঝুঁকে কাঁচের মতো টলটলে জল থেকে শাপলা তুলতে তুলতে ঝুমা বলল, আচ্ছা বিনুদা–
বিনু তক্ষুনি সাড়া দিল, কী বলছ?
মনে পড়ে, সেবার রাত্রিবেলা লুকিয়ে লুকিয়ে যাত্রা শুনতে গিয়েছিলাম–
হুঁ।
ঝিনুকটার কী হিংসে! আগে থেকে নৌকোয় উঠে বসে ছিল–
হুঁ।
আমরা কলকাতায় চলে যাবার পর তুমি আর যাত্রা দেখেছ?
না।
কেন?
কে দেখাবে বল?
কেন, যুগল?
যুগল তো এখানে নেই।
কোথায় গেছে?
বিয়ের পর ভাটির দেশে শ্বশুরবাড়ি চলে গেছে।
ও মা, তাই নাকি! আর ফিরবে না?
না।
অনেকক্ষণ চুপচাপ।
তারপর ঝুমাই আবার শুরু করল, জানো বিনুদা–
কী?
কলকাতায় যাবার পর তোমার কথা খালি মনে পড়ত।
আমারও।
ছাই। ঠোঁট উলটে দিল ঝুমা।
বিনু বলল, বিশ্বাস কর, সত্যি মনে পড়ত।
রোজ ভাবতাম, আমাদের বাড়ি আসবে।
কী করে যাব বল। আমরা তো রাজদিয়ায় থেকে গেলাম। কলকাতায় যাওয়া হল না।
ঝুমা বলল, যাওয়া না হয় না-ই হয়েছিল, চিঠি লিখলেও তো পারতে।
বিমূঢ়র মতো বিনু বলল, চিঠি লিখব!
হ্যাঁ। জানো না ‘লাভার’রা চিঠি লেখে। তোমার দিদি আর আমার মামা ঝুড়ি ঝুড়ি চিঠি লিখত।
লাভার শব্দটার মানে বিনুর অজানা নয়। তবু সে জিজেস করল, লাভার কী?
আহা-হা। তুমি একটি গর্দভচন্দ্র শিকদার লাজুক হেসে দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়াতে কামড়াতে ঝুমা বলল, যাদের মধ্যে ভাব থাকে তাদের লাভার বলে।
ফস করে বিনু বলে ফেলল, আমি কি তোমার–শেষ শব্দটা গলায় ভেতর থেকে কিছুতেই বার করে আনতে পারল না সে।
ঘাড় বাঁকিয়ে কেমন করে যেন হাসল ঝুমা, তুমি আমার কী?
বিনু কিছু বলতে পারল না, ঝুমার দিকে তাকিয়েও থাকতে পারল না। মুখ নামিয়ে এলোমেলো নৌকো বাইতে লাগল।
এরপর কিছুক্ষণ দু’জনেই চুপ। শাপলা আর বড় বড় পদ্মপাতা তুলে তুলে নৌকো বোঝাই করে ফেলতে লাগল ঝুমা, আর বিনু লক্ষ্যহীনের মতো কখনও উত্তরে কখনও দক্ষিণে নৌকোটা ছুটিয়ে বেড়াতে লাগল।
একসময় ঝুমা ডাকল, বিনুদা–
কী বলছ? এক পলক তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিল বিনু।
কলকাতা থেকে আসবার আগের দিন একটা ইংরেজি সিনেমা দেখেছিলাম—
কী সিনেমা?
ফাইটের। খুব লড়াই ছিল। আর–
আর কী?
ঠোঁট টিপে টিপে চোখের তারায় হাসতে লাগল ঝুমা, এখন বলব না।
বিনু শুধলো, কখন বলবে?
একদিনে সব শুনতে চাও নাকি? কাল স্কুল ছুটির পর আমাদের বাড়ি যেও। তখন বলব।
সেবার ঝুমা ছিল দুরন্ত, দুর্দান্ত, দুঃসাহসী। দু’বছর পর কলকাতা থেকে অসীম রহস্যময়ী হয়ে ফিরে এসেছে মেয়েটা।
