উত্তর না দিয়ে সুধা রগড়ের গলায় বলল, আনন্দদার খবর জানবার জন্যে নগদ দুটো টাকা খরচ করতে হবে দিদিভাই।
সুনীতি ঝঙ্কার দিয়ে উঠল, আহা-হা—
একসময় খাবার ডাক পড়ল।
বইটই গুছিয়ে প্রথমে সুধা সুনীতি রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
পুবের ঘর আর রান্নাঘরের মাঝখানে উঠোন। সুধা সুনীতির পর বিনু ঝিনুক খেতে গেল। অন্ধকারে যেতে যেতে ঝিনুক বলল, তোমার তো এখন ভারি মজা, না বিনুদা?
বিনু বলল, কেন?
ঝুমা এসেছে।
বিনু কিছু বলল না। উঠোন পেরুতে পেরুতে ঝিনুকের কথাগুলো বুঝবার চেষ্টা করতে লাগল শুধু।
.
২.৩৮
দিন দুই পর ছিল রবিবার। দুপুরবেলা বিনুরা সবে খেয়েদেয়ে উঠেছে, সেই সময় ঝুমা আর আনন্দ এসে হাজির।
সঙ্গে সঙ্গে বাড়িময় সাড়া পড়ে গেল। সুরমা-শিবানী-হেমনাথ-অবনীমোহন, সবাই ছুটে এলেন।
আনন্দ বলল, কলকাতা থেকে আমরা বেস্পতিবার এসেছি। বলে হাসল, তার হাসিটা কেমন যেন লজ্জার রঙে ছোপানো।
সুরমা বললেন, বিনুর কাছে সেদিনই আমরা খবর পেয়ে গেছি।
বিনুর সঙ্গে স্টিমারঘাটে আমাদের দেখা হয়েছিল।
স্নেহতলা বললেন, উঠোনে দাঁড়িয়ে কথা নয়। চল, ঘরে চল–ঝুমাদের হাত ধরে তিনি এনে বসালেন। অন্য সবাই তাদের সঙ্গে সঙ্গে এল।
ঘরে এসে আনন্দ বলল, জাপানি বোমার ভয়ে কালকাতা থেকে তোক পালাবার হিড়িক পড়েছে। চারদিক এখন ফাঁকা। আমার বাবা মা ভাইবোনেরা মধুপুরে চলে গেছে
সুরমা শুধোলেন, মধুপুরে কে আছে?
কেউ নেই। আমাদের একটা বাড়ি আছে, একজন মালী দেখাশোনা করে।
কলকাতায় একখানা বাড়ি আছে না তোমাদের?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
আগের বার সুযোগ হয়নি। এবার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব কথা জেনে নিলেন সুরমা। আনন্দর বাবা অ্যাডভোকেট, দুই দাদা বড় সরকারি চাকুরে। ছোট ভাইটা বি.এ পড়ছে। বড় বোনেদের বিয়ে হয়ে গেছে। হোট যে বোনটা রয়েছে সে ছাত্রী। বাকি রইল আনন্দ নিজে। আগেই এম. এ আর লটা পাশ করেছিল। কিছুদিন হল, বাবার সঙ্গে কোর্টে যেতে শুরু করেছে। আশা, বাবা বেঁচে থাকতে থাকতেই সে দাঁড়িয়ে যাবে। অ্যাডভোকেট হিসেবে বাবার বিপুল প্রতিষ্ঠা। তার প্রতিষ্ঠা এবং খ্যাতি আনন্দকে অনেকখানি এগিয়ে দেবেই। দু’চার বছর বাবার সঙ্গে বেরুতে পারলে সাফল্যের চাবিকাঠিটার সন্ধান নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। তবে যুদ্ধটা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওটা না থামলে কিছুই হবে না।
সুরমার সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে আবার আগের প্রসঙ্গে ফিরে গেল আনন্দ, জাপানি বোমার ভয়ে আমাদের বাড়ির সবাই গেল মধুপুর। দিদি-জামাইবাবু আমাকে কিছুতেই ছাড়লেন না, টানতে টানতে রাজদিয়ায় নিয়ে এলেন।
কৌতুকের গলায় হেমনাথ হঠাৎ বলে উঠলেন, রাজদিয়ায় আসতে তোমার বুঝি একটুও ইচ্ছা ছিল না? বলে চোখের মণি দুটো কোণে এনে আড়ে আড়ে সুনীতির দিকে তাকালেন।
বিনু লক্ষ করেছে, এতক্ষণ একদৃষ্টে আনন্দের দিকে তাকিয়ে ছিল সুনীতি। তার চোখমুখে ঢেউয়ের মতো কী খেলে যাচ্ছিল। হেমনাথ তাকাতেই দ্রুত মুখ নামিয়ে নখ খুঁটতে লাগল।
এদিকে আনন্দ থতমত খেয়ে গিয়েছিল, নামানে, দু’বছর আগে যখন এসেছিলাম, রাজদিয়া আমার খুব ভাল লেগেছিল। তাই
বাধা দিয়ে হেমনাথ বলতে লাগলেন, তুমি আর যাই হও, উৎকৃষ্ট উকিল হতে পারবে না– বলে ঠোঁট টিপে টিপে হাসতে লাগলেন, নিজের কেসটা পর্যন্ত ভাল করে সাজাতে পার না। অপলক তাকিয়ে থেকে কী যেন বুঝতে চেষ্টা করল আনন্দ, তারপর হেমনাথের সঙ্গে সুর মিলিয়ে হেসে উঠল।
একটু ভেবে হেমনাথ বললেন, এবার বন্দুক টলুক এনেছ তো? তোমার যা শিকারের নেশা!
আজ্ঞে হ্যাঁ। পুরো এক বাক্স কার্তুজও এনেছি।
স্নেহলতা বললেন, রাজদিয়ার জন্তু-জানোয়ার আর পাখিদের দেখছি বড়ই দুর্দিন।
প্রগলভতার ঈশ্বর আজ বুঝি হেমনাথের কাঁধে ভর করে বসেছে। চোখের তারা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে রগড়ের সুরে আনন্দকে বললেন, তুমি কী ধরনের শিকারি তা আমার জানা আছে। নিশানার এক। শ’ হাত দূর দিয়ে গুলি চলে যায়। অবশ্য–
আনন্দ জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল।
হেমনাথ বলতে লাগলেন, এক জায়গায় তীর ঠিক বিধিয়েছ। সেখানে নিশানা ভুল হয় নি’ বলে চোরা চোখে সুনীতিকে বিদ্ধ করলেন।
সুনীতি সেই যে মুখ নামিয়েছিল, আর তোলে নি। সমানে নখ খুঁটেই চলেছে।
হকচকিয়ে আনন্দ কী বলতে যাচ্ছিল, সেই সময় বিনুর মনে হল কাঁধের কাছে কেউ মৃদু টোকা দিচ্ছে। মুখ ফেরাতেই সে দেখতে পেল–ঝুমা।
চোখে চোখ পড়তেই ঝুমা বলল, চল—
কোথায়?
তোমাদের বাগানে বেড়াই গে। এখানে বসে বসে বড়দের কথা শুনে কী হবে? তার চাইতে আমরা গল্প করব।
একটু চুপ করে থেকে বিনু বলল, চল—
দু’জনে ঘর থেকে বেরিয়ে বাগানে চলে এল।
হেমনাথের বাড়ির নকশা করা টিনের চালগুলোতে রোদ ঝলকে যাচ্ছে। পুকুরে, দূর ধানখেতে, গাছপালার মাথায় কিংবা আকাশ জুড়ে যেদিকেই চোখ ফেরানো যাক, রোদের ছড়াছড়ি। কিন্তু বাগানের ভেতরটা বড় ছায়াচ্ছন্ন, নিঝুম, মায়ের কোলের মতো ঠান্ডা। এখানে এলেই যেন ঘুমে চোখ জুড়ে যায়।
মৌটুসকি আর হলদিবনা পাখিগুলো ঘন জামরুল পাতার ভেতর বসে খুনসুটি করছিল। চোখ উদানে ঝোঁপের জঙ্গলে ঝাঁকে ঝাঁকে সোনাপোকা উড়ছে। বড় বড় ঘাসের মাথায় সবুজ রঙের গঙ্গাফড়িং ঢ্যাঙা পায়ে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। কতকগুলো বহুরূপী গিরগিটি অকারণেই ছোটাছুটি করছে। আর শোনা যাচ্ছিল ঝিঁঝির ডাক। কোন পাতাল থেকে তাদের বিলাপ উঠে আসছে, কে বলবে।
