একটু ভেবে বিনু বলল, স্কুল ছুটির পর দেরি করে বাড়ি ফিরলে মা বকে—
ঝুমা বলল, আমি মাসিমাকে বলব’খন।
আচ্ছা।
নৌকোয় ওঠার পর থেকে কত কথা যে বলেছে ঝুমা! অনেক সময় এক কথার সঙ্গে আরেক কথার মিল ছিল না। তবু এই অসংখ্য অসংলগ্ন কথা, ঝুমার হাসি, চোখের তারায় অর্থপূর্ণ ইঙ্গিত সব মিলেমিশে বিনুকে হাতছানি দিয়ে দিয়ে এক অচেনা রহস্যের দিকে যেন টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।
আদিগন্ত এই মাঠের ভেতর শুধু জল আর জল। মাঝে মাঝে ধানখেত, নলখাগড়ার ঝোঁপ, মুত্রার। জঙ্গল, শাপলাবন, শালুকবন, পদ্মবন, কদাচিৎ দু’চারটি বউন্যা কি হিজল গাছ ছাড়া কেউ নেই, কিছু নেই। এই নির্জন জলমগ্ন চরাচরে নিঝুম দুপুরবেলায় ঝুমাকে বড় ভাল লাগছে। আবার কেমন যেন ভয়ও করছে বিনুর। বুকের ভেতর ঘোট ঘোট ঢেউয়ের মতো কী যেন বয়ে যাচ্ছে তার।
রোদের রং যখন গাঁদাফুলের মতো হলুদ হয়ে এল সেই সময় ঝুমা বলল, অনেকক্ষণ এসেছি। এবার ফিরব না?
বিনু বলল, হ্যাঁ।
পুকুরঘাটে ফিরে এসে বিনু অবাক। জলে পা ডুবিয়ে নারকেল গুঁড়ির সিঁড়িতে একা বসে আছে ঝিনুক।
সেই পিঠক্ষীরা গাছটার গায়ে নৌকো বাঁধতেই প্রথমে লাফ দিয়ে পাড়ে নামল ঝুমা, তারপর বিনু। নেমেই বিনু ঝিনুককে শুধলো, এখানে বসে আছ যে?
আধফোঁটা গলায় ঝিনুক বলল, এমনি।
কখন থেকে বসে আছ?
অনেকক্ষণ। তোমরা যখন নৌকোয় করে ধানখেতের ভেতর ঢুকলে সেই তখন থেকে—
বিনুর একবার ইচ্ছে হল, জিজ্ঞেস করে, তাদের পিছু পিছু কি ঘর থেকে পুকুরঘাট পর্যন্ত চলে এসেছিল ঝিনুক? কী ভেবে করল না। বিনুর মন ছায়াচ্ছন্ন হয়ে রইল।
বাড়িতে এসে বেশিক্ষণ থাকতে পারল না ঝুমা। একটু পর তাকে নিয়ে আনন্দ চলে গেল।
যাবার আগে অবশ্য ঝুমা সুরমাকে বলে গেছে, স্কুল ছুটির পর বিনুদা কিন্তু মাঝে মাঝে আমাদের বাড়ি যাবে মাসিমা। আপনি বকতে পারবেন না।
সরল মনে সুরমা বলেছেন, তোমাদের বাড়ি গেলে বকব কেন? নিশ্চয়ই যাবে।
বিনু লক্ষ করেছে, সেইসময় একবার তার দিকে, আরেক বার ঝুমার দিকে তাকাচ্ছিল ঝিনুক। কী যেন খুঁজবার চেষ্টা করছিল সে।
.
২.৩৯
পরের দিন স্কুল ছুটির পর ঝুমাদের বাড়ি গেল বিনু।
তাকে দেখেই চোখের কোণে হেসে ফেলল ঝুমা, একেবারে গুড বয়। আজ আসতে বলেছি, আজই এসেছে–
খানিকক্ষণ এ গল্প সে গল্পের পর ঝুমাকে একলা পেয়ে বিনু বলল, এবার সিনেমার কথাটা বল।
ও বাবা, ছেলের আর তর সয় না।
কিছুতেই সিনেমার কথাটা সেদিন বলল না ঝুমা।
সেদিন কেন, আরও দিনকয়েক বিনুকে ঘোরাল ঝুমা। তারপর একদিন বিকেলবেলা বিনু ওদের • বাড়ি যেতেই তাকে ছাদে নিয়ে গেল। কার্নিসের ধারে নিরালা একটু কোণ দেখে এসে দাঁড়াল।
দূরে স্টিমারঘাট আর বরফ কলের চুড়োটা চোখে পড়ছে। ডান ধারে ঝাউবনের ওপারে সারি সারি মিলিটারি ব্যারাক। ব্যারাকের ওধারে বিকেলের রোদ গায়ে মেখে নদীর ঢেউগুলো টলমল করছে। মোচার খোলার মতো কেরায়া আর ভাউলে নৌকাগুলো দূলছে। ছেঁড়া রঙিন পাপড়ির মতো আকাশে ঝক ঝাক পাখি উড়ছে।
বিনু বলল, এখন বল—
ভুরু দুটো বাঁকিয়ে চুরিয়ে ঝুমা বলল, শুনবার জন্যে ঘুম হচ্ছিল না বুঝি?
এবার প্রথম দু’একদিন মুখচোরার মতো ছিল বিনু, এখন সাহস বেড়ে গেছে। সে বলল, হচ্ছিলই না তো–
একটু চুপ করে থেকে ঝুমা বলল, সিনেমাটায় কী ছিল জানোবলেই দু’হাতে মুখ ঢেকে খিল খিল করে হেসে উঠল।
হাসছ কেন? বল–
অনেকক্ষণ হাসার পর স্থির হল ঝুমা। অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে ফিসফিস গলায় বলতে লাগল, সিনেমায় একটা সাহেব একটা মেমসাহেবকে খুব কিস খাচ্ছিল–
নাক মুখ আঁ আঁ করে উঠল বিনুর। অবিশ্বাসের গলায় সে বলল, যাঃ—
সত্যি বিনুদা। মা কালীর দিব্যি।
খানিক চিন্তা করে বিনু বলল, সাহেবটার কত বয়েস?
সাতাশ আটাশ—
আর মেমটার?
বাইশ তেইশ!
এত বড় ছেলেমেয়ে কখনো কিস খায়!
মুখ ফিরিয়ে ঝুমা বলল, তুমি একটা হাঁদারাম। কিছু জানো না। লাভার হলেই কিস খায়। এই যে আমার দিদি–
বিনু শুধলো, তোমার দিদি কী?
কলকাতায় দিদির এক লাভার আছে–অনিমেষদা। আমাদের বাড়ি এলেই দু’জনে ছাদে চলে যেত। তারপর খুব কিস খেত।
সমস্ত শরীর কেমন যেন জ্বরের মতো লাগছিল। ঝাঁপসা কাঁপা গলায় বিনু বলল, সত্যি?
সত্যি।
তারপর কী হয়ে গেল, কে বলবে। সময় যেন কিছুক্ষণ গতি হারিয়ে এই নির্জন ছাদে স্তব্ধ হয়ে রইল। বিনুর যখন জ্ঞান ফিরল, দেখতে গেল, তার বুকের ভেতর ঝুমা চোখ বুজে আছে। চকিত বিনু এক ধাক্কায় তাকে সরিয়ে উধ্বশ্বাসে সিঁড়িঘরের দিকে ছুটল। তর তর করে নিচে নেমে রাজদিয়ার রাস্তা দিয়ে আচ্ছন্নের মতো দৌড়তে লাগল। তার চারধারে চরাচর যেন দুলতে শুরু করেছে।
বিনু জানে না, একটু আগে ঝুমা তার হাত ধরে কৈশোর থেকে যৌবনের সিংদরজায় পৌঁছে দিয়েছে।
.
স্কুলের ছুটি হলে আজকাল আর কোনও দিকে তাকায় না বিনু। সম্মোহিতের মতো নেশাগ্রস্তের মতো ঝুমাদের বাড়ি চলে যায়। এই সময়টার জন্য সারাদিন অস্থির, উন্মুখ হয়ে থাকে সে।
অশোকের কাছে জীবনের রহস্যময় একটা কথা কিছু কিছু শুনেছিল বিনু। কিন্তু সে সব ভাসা ভাসা, মৌখিক। ঝুমা যেন এক টানে চারদিকের সব পর্দা ছিঁড়ে সেই রহস্যটাকে তার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
এই ভাবেই চলছিল। হঠাৎ একদিন স্কুল ছুটির পর ঝুমাদের বাড়ি এসে বিনু অবাক, ঝিনুক বসে আছে।
