বিনু তাড়াতাড়ি বলে উঠল, তোমরা যা ভাবছ তা নয় দিদা—
সুধা এই সময় গলা কাঁপিয়ে কাঁপয়ে ভেংচি কাটার মতো মুখ করে বলল, তোমরা যা ভাবছ তা নয় দিদা! নিশ্চয়ই তা-ই। আবার ওই বাঁদরগুলোর সঙ্গে মিলিটারি ব্যারাকে গিয়ে ভিখিরিদের মতো চকলেট চাইছিলি, সিগারেট খাচ্ছিলি। দাঁড়া আজই মজিদ মামাকে খবর পাঠাচ্ছি। চ্যালা কাঠ দিয়ে যাতে–
সুধার কথা শেষ হল না, তার আগেই বিনু ঝাঁপিয়ে পড়ল। নিমেষে দেখা গেল সুধার চুলের গোছা বিনুর মুঠোয়। সুধাও ছাড়ে নি, দু’হাতের দশটা নখ বিনুর গালে বসিয়ে দিয়ে ধরে আছে।
চেঁচামেচি এবং টানাটানি করে স্নেহলতারা দু’জনকে ছাড়িয়ে দিলেন।
যে সুনীতি চিরদিনই ধীর স্থির শান্ত, হঠাৎ কী যেন হয়ে গেল তার। ছুটে এসে বিনুর গালে এক চড় কষিয়ে দিল। চোখ পাকিয়ে বলল, অন্যায়ও করবে, আবার লোকের গায়ে হাতও তুলবে! দিন দিন তোমার আস্পর্ধা বেড়েই চলেছে! খুনী কোথাকার–
দুর্বিনীত ঘাড় বাঁকিয়ে বিনু বলল, আমি অন্যায় করি নি। চড় খেয়ে তার চোখ টসটস করছে। মনে হচ্ছে সে দুটো বুঝি ফেটেই যাবে।
সুরমা বললেন, অন্যায় করিস নি তো এতক্ষণ ছিলি কোথায়? তোকে না বলে দেওয়া হয়েছে স্কুল ছুটির পর এক মিনিটও বাইরে থাকবি না। আবার সন্ধে করে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে।
বিনু বলল, স্কুল ছুটির পর আমি তো আসছিলামই। স্টিমারঘাটের কাছে ঝুমাদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।
কোন ঝুমা?
ওই যে রামকেশবদাদুর নাতনি—
স্নেহলতা বললেন, ওরা এসেছে নাকি?
বিনু বলতে লাগল, হ্যাঁ, আজই বিকেলবেলা এসেছে। স্টিমারঘাটে নেমেই আমাকে দেখতে পেয়ে ওরা আটকাল। কথা বলতে বলতে দেরি হয়ে গেল।
সুধাটা চিরকালের ঘরশত্রু। সে হঠাৎ বলল, গোয়ালন্দের স্টিমার তো আসে সকালে। বিকেলবেলা এসেছে কিরকম?
দাঁতমুখ খিঁচিয়ে চেঁচিয়ে মেচিয়ে বাড়ি মাথায় তুলে ফেলল বিনু, বিশ্বাস না হয়, কুমাদের বাড়ি গিয়ে জিজ্ঞেস করে আয় না রাক্ষুসী।
আবার একটা কুরুক্ষেত্র বেধে যাবার উপক্রম হচ্ছিল। তাড়াতাড়ি দু’জনকে থামিয়ে স্নেহলতা বললেন, ঝুমাদের জন্যে দেরি হয়েছে, সে কথা বলবি তো। কী বোকা ছেলে তুই! শুধু শুধু মার খেলি!
অভিমানের গলায় বিনু বলল, তোমরা আমাকে বলতে দিলে কোথায়?
বিনুর একখানা হাত ধরে স্নেহের সুরে স্নেহলতা বললেন, চল, হাত মুখ ধুয়ে খাবি। সেই কখন চাট্টি খেয়ে স্কুলে গিয়েছিলি।
.
খেয়েটেয়ে বিনু পড়তে বসল। বেশ রাত হয়ে গেছে। ধানখেত, পুকুর, সুদূর বনানী, গাছপালা সব কিছুই এখন গাঢ় অন্ধকারে অবলুপ্ত।
সুধা সুনীতি আর ঝিনুক আগেই পড়তে বসেছিল।
এ বাড়িতে আজকাল আর কেরোসিন ঢোকে না। হেমনাথের বারণ। সারা দেশ যখন অন্ধকারে ডুবে আছে তখন নিজের ঘরে তিনি দেওয়ালি জ্বালাতে চান না। তা ছাড়া, নিত্য দাসের ওপর তিনি এতই অসন্তুষ্ট যে তার দোকানের একটা কুটোও বাড়িতে ঢুকতে দেবেন না।
কেরোসিন আসে না। এ বাড়িতে আজকাল রেড়ির তেল জ্বলে।
এই মুহূর্তে পুবের ঘরের এক কোণে দু’টো আড়াই-তলা কাঠের পিলসুজে প্রদীপ জ্বলছে। রেড়ির তেলের নিরুত্তেজ আলোয় চারধার স্নিগ্ধ। বিনুরা তিন ভাই বোন আর ঝিনুক সুর করে পড়ে যাচ্ছিল।
বিনুর ডান পাশে বসেছে সুনীতি। তারপর সুধা এবং ঝিনুক।
পড়তে পড়তে মুখ তুলে সুনীতি একবার বিনুকে দেখে নিল। তারপর আবার বাইরের দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ পর আবার বিনুকে দেখল, তারপর চোখ নামিয়ে বই নাড়াচাড়া করতে লাগল।
অনেকক্ষণ ইতস্তত করার পর খুব আস্তে, গলার ভেতর থেকে সুনীতি ডাকল, বিনু—
বিনু শুনেও শুনল না, গলা চড়িয়ে পড়তে লাগল।
ফের ডাকল সুনীতি।
এবার বিরক্ত, অপ্রসন্ন চোখে তাকাল বিনু।
সুনীতি বলল, খুব পড়া দেখাচ্ছিস, না? বলে হাসল।
বিনু কিছু বলল না, চোখ কুঁচকেই থাকল।
সুনীতি এবার কোমল গলায় বলল, গালে খুব লেগেছিল, না রে?
মুখ বাঁকিয়ে বিনু বলল, না, লাগবে না!
সত্যি, আর মারব না। হঠাৎ এমন রাগ হয়ে গিয়েছিল। বিনুর মাথায় হাত বুলোত লাগল সুনীতি।
এক ঝটকায় সুনীতির হাতটা সবিয়ে দিল বিনু, মারবার সময় মনে ছিল না? এখন আদর ফলানো হচ্ছে!
সুনীতি আবার বিনুর মাথায় হাত রাখল। খোশামোদের গলায় বলল, জীবনে আর কক্ষনো তোর গায়ে হাত তুলব না। মা কালীর দিব্যি। আর
আর কী?
তোকে একটা জিনিস দেব।
কী জিনিস?
দু’টো টাকা।
বিনু এবার নরম হল। একটু ভেবে বলল, কখন দেবে?
আজকেই।
ঠিক?
ঠিক।
একটু চুপ করে থেকে সুনীতি গলার স্বর আরও নামিয়ে দিল, অ্যাই—
কী বলছ?
ঝুমারা কে কে এসেছে রে?
ঝুমা রুমাদি শিশিরমামা মামী আর—
নিশ্বাস বন্ধ করে পলকহীন তাকিয়ে ছিল সুনীতি। চাপা গলায় ফিসফিস করে বলব, আর কে?
বিনুর চোখ চিকচিক করতে লাগল। সে বলল, যার কথা শুনবার জন্যে দম বন্ধ করে আছ– সে। আনন্দদাও এসেছে।
আহা, দম বন্ধ করে থাকবার আর লোক পেলাম না! বলেই বইয়ের ওপর ঝুঁকে মনোযোগ দিয়ে পড়তে লাগল সুনীতি।
বিনু বলল, আমার টাকা দাও—
দেব’খন।
ও, কাজের বেলায় আঁটিসুটি, কাজ ফুরালে দাঁত কপাটি। টাকা না দিলে কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে।
কিছুক্ষণ পড়াশোনার পর বিনু হঠাৎ শুনতে পেল, নিচু গলায় সুধা সুনীতিকে বলছে, তোর মনস্কামনা পূর্ণ হল তো দিদি–
সুনীতি বলল, কিসের আবার মনস্কামনা?
