ঝিনুক যেন শ্বাসবায়ুর মতো। সে কাছেই আছে, কিন্তু তার কথা মনেই থাকে না।
বিনু বলল, তোমার মতোই বড় হয়েছে।
তা হলে তো–বলে চোখ কুঁচকে ঠোঁট কামড়াতে লাগল ঝুমা।
তা হলে কী?
ভুরু নাচিয়ে নাচিয়ে ঝুমা বলল, দু’জনে বেশ চালাচ্ছ– কথায় কথায় ভুরু নাচানো মেয়েটার স্বভাব।
কান ঝাঁ ঝাঁ করতে লাগল বিনুর। আবছা গলায় সে বলল, কী যা-তা বলছ!
ঝুমা আবার কী বলতে যাচ্ছিল, সেই সময় জেটিঘাটের ভেতর থেকে চার পাঁচটা কুলির মাথায় বড় বড় স্টিলের ট্রাঙ্ক চাপিয়ে স্মৃতিরেখা বেরিয়ে এলেন। তার পেছনে রুমা আর আনন্দ।
আনন্দও তবে এসেছে!
কাছাকাছি এসে কুলিরা ট্রাঙ্কগুলো নামাল। স্মৃতিরেখা বিনুকে দেখতে পেয়েছিলেন। একটুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, বিনু না?
বিনু বলল, আজ্ঞে হ্যাঁ।
চিনতেই পারা যায় না। কত বড় হয়ে গেছে!
লজ্জায় চোখ নামাল বিনু। স্মৃতিরেখা বললেন, তুমি এখানে কোত্থেকে এলে?
বিনু বলল, স্কুল থেকে। বাড়ি ফিরছিলাম, ঝুমা ডাকল।
একটু চুপ করে থেকে স্মৃতিরেখা এবার বললেন, বোমার ভয়ে পালিয়ে এলাম। কলকাতায় যে কোনওদিন এখন বোমা পড়তে পারে।
চোখ মাটির দিকে রেখেই বিনু বলল, কলকাতা থেকে অনেক লোক রাজদিয়া চলে এসেছে।
তাই নাকি?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
স্মৃতিরেখা বললেন, কলকাতা একেবারে ফাঁকা হয়ে গেছে। যে যেদিকে পারছে, প্রাণের ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। সে যাক গে। হ্যাঁ বিনু–
মুখ তুলে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল বিনু।
স্মৃতিরেখা বললেন, শুনেছি, তোমরা নাকি সেই থেকেই রাজদিয়ায় আছ—
আজ্ঞে হ্যাঁ।
জমিজমাও কিনেছ?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
কতটা?
তিরিশ কানির মতো।
তোমার বাবা বুদ্ধিমানের মতো কাজ করেছেন।
একটু চুপ।
তারপর স্মৃতিরেখা আবার বললেন, বাড়ির সবাই ভাল তো?
বিনু মাথা নাড়ল, আজ্ঞে হ্যাঁ।
এরপর এলোমেলো, অসংলগ্ন নানারকম কথা হতে লাগল। যুদ্ধের কথা, জাপানি বোমার কথা, রাজদিয়ার কথা, কলকাতা থেকে আসার সময় ট্রেনে-স্টিমারে অসম্ভব ভিড়ের মধ্যে প্রচন্ড কষ্টের কথা, ইত্যাদি ইত্যাদি।
একসময় শিশির আর রামকেশব ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে ফিরে এলেন। দেখেই বিনু চিনতে পারল, গাড়িটা ঝিনুকদের। শিশিররা তা হলে ঝিনুকদের ফিটন চেয়ে আনতে গিয়েছিলেন।
কুলিগুলো একধারে দাঁড়িয়ে ছিল। রামকেশব তাড়া লাগালেন, মাল তুলে ফেল–
বাক্সপ্যাঁটরা ভোলা হলে কুলিরা ভাড়া নিয়ে চলে গেল। রামকেশব বললেন, সবাই গাড়িতে ওঠ।
স্মৃতিরেখা বিনুর দিকে তাকিয়ে বললেন, আমাদের বাড়ি যাবে নাকি? চল না—
ঝুমাও তাড়াতাড়ি বলে উঠল, চল, চল–আগ্রহে তার চোখ চকচক করতে লাগল।
যাবার খুব যে একটা অনিচ্ছা ছিল তা নয়। হয়তো যেতও বিনু, কিন্তু পরক্ষণে সেই নিষেধাজ্ঞার কথা মনে পড়ে গেল। আজকাল স্কুল ছুটির পর আর এক মুহূর্তও বাইরে থাকার উপায় নেই। মজিদ মিঞা তার কি সর্বনাশটাই না করেছে! অবশ্য অশোকরা মাঝে মাঝে তাকে ধরে ওদের সঙ্গে নিয়ে যায়। একটু ভেবে বিনু বলল, এই মাত্র আপনারা এলেন। আজ বিশ্রাম টিশ্রাম করুন। আমি পরে যাব।
স্মৃতিরেখা বললেন, সেই ভাল। ট্রেনে স্টিমারে দু’দিন যা ধকল গেছে। এখন চান করে একটু শুতে পেলে বাঁচি। তোমাকে নিয়ে গিয়ে ভাল করে কথাই বলতে পারব না। পরে আসবে কিন্তু
আসব।
ঝুমা বলল, কালই এস—
বিনু হাসল।
স্মৃতিরেখা আর কিছু না বলে ফিটনে উঠলেন। তার পিছু পিছু শিশির রুমা আর রামকেশবও উঠলেন।
উঠতে উঠতে রামকেশব বিনুকে বললেন, হেমদাদা আর বৌ-ঠাকরুনকে বলিস, কলকাতা থেকে শিশিররা আজ এসেছে।
বিনু ঘাড় হেলিয়ে দিল, বলব।
আনন্দ আর ঝুমা এখনও নিচে দাঁড়িয়ে। সবার কান বাঁচিয়ে নিচু চাপা গলায় আনন্দ বলল, বাড়িতে আমার কথাও বলে।
ঝুমাটা কাছেই আছে, তাকে ফাঁকি দেওয়া যায় নি। চোখ কুঁচকে ঠোঁট ছুঁচলো করে সে বলল, কার কাছে বলবে মামা? সুনীতিদির কাছে?
তুই ভীষণ ফাজিল হয়েছিস। আলতো করে ঝুমার মাথায় চাটি কষিয়ে দিল আনন্দ।
নাকের ভেতর থেকে কপট কান্নার শব্দ করতে লাগল ঝুমা, উঁ-উঁ-উঁ–
আর বাঁদরামো করতে হবে না। গাড়িতে ওঠ– দু’জনে ফিটনে উঠে দরজা বন্ধ করল।
সঙ্গে সঙ্গে রামকেশব চেঁচিয়ে বললেন, গাড়ি চালা রে রসুল-ঝিনুকদের কোচোয়ানটার নাম রসুল।
ফিটন চলতে শুরু করল। জানালার বাইরে মুখ বার করে হাত নাড়তে লাগল ঝুমা। যতক্ষণ দেখা যায়, নদীর পাড়ে স্টিমারঘাটে দাঁড়িয়ে থাকল বিনু।
.
বাড়ি ফিরতে ফিরতে আজ সন্ধে হয়ে এল। পুকুরের ওপারে ধানের খেত এর মধ্যে ঝাঁপসা হয়ে গেছে। আকাশ যেখানে পিঠ বাঁকিয়ে দিগন্তে নেমেছে, সেই জায়গাটা নিরাকার, অস্পষ্ট। বাগানের এ কোণে ও কোণে থোকা থোকা অন্ধকার জমতে শুরু করেছে। সোনাল আর পিঠক্ষীরা ঝোঁপের জ্ঞের জোনাকিদের নাচানাচি শুরু হয়ে গেছে।
স্টিমারঘাটে যে সূর্যটা ছিল ডুবু ডুবু, এখন তার চিহ্নমাত্র নেই। আকাশ জুড়ে যুঁই ফুলের মতো অগণিত তারা ফুটতে শুরু করেছে।
উঠোনে পা দিতেই সুরমা ছুটে এলেন, তোর তো লজ্জা নেই বিনু। সেদিন যে মজিদ মিঞা অত করে মারল, এর মধ্যেই ভুলে গেলি!
স্নেহলতা সুধা সুনীতি শিবানী ঝিনুক, সবাই একধারে দাঁড়িয়ে আছে। খুব সম্ভব তার ফেরার জন্য ওরা উঠোনে অপেক্ষা করছিল। অবনীমোহন আর হেমনাথকে অবশ্য দেখা গেল না।
স্নেহলতা বললেন, গায়ের ব্যথাও মরল, আবার যে কে সে-ই হয়ে দাঁড়ালি!
