বিনু অভিভূতের মতো হেমনাথের দিকে তাকিয়ে থাকে।
.
২.৩৭
সিগারেট খাওয়ার জন্য মজিদ মিঞার হাতে সেই যে মার খেয়েছিল, তার পর থেকে শ্যামল আর অশোকের সঙ্গে মেশে না বিনু। হেমনাথ-অবনীমোহন-সুরমা-স্নেহলতা, সবাই ওদের সঙ্গে মেলামেশা করতে বারণ করে দিয়েছেন। নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে, স্কুল ছুটির পর পারতপক্ষে ওদের সঙ্গে বেড়ায় না বিনু। বেশির ভাগ দিন সোজা বাড়ি চলে আসে।
আজও ফিরছিল সে।
পশ্চিম আকাশের ঢাল পাড় বেয়ে সূর্যটা অনেকখানি নেমে গেছে। রোদের রং এখন বাসি হলুদের মতো। বিকেলের নিবু নিবু অনুজ্জ্বল আলো গায়ে মেখে ঝাকে ঝাকে বালিহাঁস আর পানিকাউ উড়ছিল। উত্তর আকাশে তুলোর স্কুপের মতো সাদা সাদা ভবঘুরে মেঘ।
বরফ কল, মাছের আড়ত পেরিয়ে স্টিমারঘাটের কাছে আসতেই কে যেন ডাকল, বিনুদা বিনুদা–
চমকে ঘুরে দাঁড়াতেই বিনু দেখতে পেল, জেটির কাছে ঝুমা।
চোখাচোখি হতেই ঝুমা হাতছানি দিল।
প্রথমটা বিশ্বাসই করতে পারল না বিনু। এই বিকেলবেলায় নদীর দিক থেকে যখন এলোমেলো হাওয়া দিয়েছে, সূর্যটা ডুবুডুবু, রোদের রং বাসি হলুদের মতো, যখন পশ্চিমের ভাসমান মেঘ ফুলে ফুলে পাহাড়ের মতো হয়ে আছে, সেই সময় স্টিমারঘাটের কাছে কুমার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে, কে ভাবতে পেরেছিল! অবাক বিনু দাঁড়িয়েই থাকল।
ঝুমা আবার ডাকল, দাঁড়িয়ে রইলে কেন? এস দু’চোখে অপার বিস্ময় নিয়ে আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল বিনু।
স্তূপাকার মালপত্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে ঝুমা। ট্রাঙ্ক, সুটকেস, বেতের বাস্কেট, কুঁজো, চার পাঁচটা হোল্ডঅল, টিফিন-কেরিয়ারকত যে জিনিস, লেখাজোখা নেই। ঝুমারা ছাড়া আর কাউকেই দেখা যাচ্ছে না।
পলকহীন তাকিয়েই ছিল বিনু। চোখ কুঁচকে ঝুমা বলল, একেরারে বোবা হয়ে গেলে যে! আমাকে যেন চিনতেই পারছ না–
হঠাৎ দেখলে সত্যিই চেনা যায় না। মাথায় অনেকখানি লম্বা হয়ে গেছে ঝুমা। দু’বছর আগে ছিল বালিকা, বড় বড় পা ফেলে কখন সে কৈশোরকে ধরে ফেলেছে, কে বলবে। গায়ের চামড়া টানটান, মসৃণ, তাতে চকচকে আভা ফুটেছে। প্রচুর স্বাস্থ্য মেয়েটার, গায়ের আঁটোসাঁটো জামাটায় ধরতে চায় না।
চোখ এমনিতেই বড়, তার মাঝখানে কালো কুচকুচে মণিদু’টো নিয়ত অস্থির, নিয়ত ছটফটে।
বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারল না বিনু। অন্য দিকে চোখ ফিরিয়ে বিব্রতভাবে বলল, না, মানে–
মানে আবার কী?
অনেকদিন পর তোমাকে দেখলাম কিনা। একটু সামলে নিয়ে বিনু আবার বলল, তুমি একলা এখানে, এই স্টিমারঘাটে?
ঝুমা বলল, আজই আমরা কলকাতা থেকে এলাম যে—
কখন এসেছ?
এক্ষুনি এলাম। দেখছ না স্টিমারটা–
বিনু তাকিয়ে দেখল, জেটিঘাটের ওপারে রাজহাঁসের মতো সেই স্টিমারটা দাঁড়িয়ে আছে। সেটার মাস্তুলে খয়েরি রঙের শঙ্খচিল। হঠাৎ বিনুর মনে পড়ল, ও বেলা স্কুলে আসার সময় স্টিমারটা চোখে পড়ে নি। সে বলল, স্টিমার তো সকালবেলা আসার কথা–
ঝুমা বলল, হ্যাঁ, বড্ড দেরি করে এসেছে। পাক্কা দশ ঘন্টা লেট–
এবার বিনু ভাল করে লক্ষ করল, ঝুমার চুল রুক্ষ, উষ্কখুষ্ক। প্রায় দু’দিন স্টিমার এবং ট্রেনে কাটিয়ে আসার ফলে মুখচোখ মলিন। তারপর একটা কথা খেয়াল হতে তাড়াতাড়ি বলে উঠল, তোমাকেই শুধু দেখছি, আর সবাই কোথায়?
জেটিঘাটের ভেতর। কুলিদের দিয়ে মালপত্তর এনে এনে রাখছে। আমি এখানে পাহারা দিচ্ছি। দাদু আর বাবা গেছেন একটা ঘোড়ার গাড়ি যোগাড় করতে। ওঁরা এলেই আমরা বাড়ি যাব। বলতে বলতে হঠাৎ কী মনে পড়ে গেল ঝুমার, আচ্ছা বিনুদা–
কী বলছ?
তোমরা তো সেই থেকেই দেশে আছ, আর কলকাতায় যাও নি–তাই না?
হ্যাঁ। তোমায় কে বললে?
বা রে, কলকাতায় গেলে তুমি বুঝি আমাদের বাড়ি যেতে না? তা ছাড়া–
কী?
চোখের তারা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঝুমা এবার বলল, তোমরা যে দেশে আছ, সে খবর আমরা পেয়েছি।
কেমন করে?
হাঁদা গঙ্গারাম, কিছুই জানো না! সুনীতিদি প্রত্যেক সপ্তাহে আমার মামাকে দু’খানা করে চিঠি লেখে। তাতেই জানতে পেরেছি।
বিনু মনে মনে ভাবল, সত্যিই সে হাঁদা। সুনীতির সব চিঠিই তো সে নিজের হাতে ডাকবাক্সে দিয়ে আসত, অথচ এমন সোজা জিনিসটা তার মাথায় ঢুকল না!
ঝুমা এবার গলা নামিয়ে ফিসফিস করল, তোমার দিদি আর আমার মামার ভেতর ব্যাপার আছে, না বিনুদা– বলে দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ভুরু নাচিয়ে নাচিয়ে কেমন করে যেন হাসতে লাগল।
ঝুমার ইঙ্গিতটা বুঝতে পেরেছে বিনু। তার মুখ লাল হয়ে উঠল। দু’বছর আগে মেয়েটা ছিল দুর্দান্ত, ডানপিটে। ভয় টয় বলে তার কিছুই ছিল না। টের পাওয়া যাচ্ছে, সেই ঝুমা এবার অন্য দিক থেকে পেকে টুসটুসে হয়ে এসেছে।
একটু নীরবতা।
তারপর ঝুমাই আবার ডাকল বিনুদা–
কী বলছ?
সেই হিংসুটি মেয়েটা এখন কোথায় গো?
কার কথা বলছ?
ঝিনুক-ঝিনুক—
বিনু বলল, ঝিনুক আমাদের বাড়িতেই আছে।
ঝুমা ঘাড় বাঁকিয়ে শুধলো, সেই তখন থেকে?
হ্যাঁ। গভীর সহানুভূতির গলায় বিনু বলতে লাগল, কোথায় আর যাবে বল। ওর মা তো এখানে নেই–
ঝিনুকের মা এখনও আসে নি?
না।
আর আসবে না মনে হয়।
তাই শুনেছি।
একটু কী ভেবে ঝুমা এবার জিজ্ঞেস করল, ঝিনুক এখন কত বড় হয়েছে বিনুদা? কুমার কথায় চকিত হল বিনু। সত্যিই বড় হয়ে উঠেছে ঝিনুক, প্রায় ঝুমার মতোই কিশোরী। দু’বছর হতে চলল, একই বাড়িতে সাতাশের বন্দে’র ছ’খানা ঘর, ঢালা উঠোন, স্নিগ্ধ ছায়াছন্ন বাগান, টলটলে পুকুর, পাখিদের অশ্রান্ত কিচির মিচির আর গ্রীষ্ম-বর্ষা-শরৎ-হেমন্ত দিয়ে ঘেরা ছোট্ট মনোরম একটি ভুবনের মাঝখানে তারা পাশাপাশি আছে। অথচ তিল তিল করে কখন যে ঝিনুক বড় হয়ে উঠেছে, লক্ষই করে নি বিনু। আজ ঝুমার কথায় মনে পড়ে গেল।
