বাইরে রেশন কার্ড আর বোতল হাতে ঝুলিয়ে জনতা তীর্থের কাকের মতো তাকিয়ে থাকে। ভেতরে দেখা যায়, নিত্য দাস একটা তক্তপোশে বসে আছে। তার সামনে ক্যাশবাক্স, রসিদ বই। ডান ধারে। বড় বড় কেরোসিনের ড্রামগুলো শূন্য, চিনির বস্তাগুলো ফাঁকা। পেছনে কাপড় রাখার জন্য যে সারি সারি কাঁচের আলমারি বসানো আছে সেগুলোতে কিছুই নেই।
বাইরে জনতা করুণ গলায় গোঙানির মতো আওয়াজ করে ডাকে, অ দাস মশয়, অ দাস মশয়–
একশ’বার ডাকলে তক্তপোষের ওপর থেকে একবার মোটে সাড়া দেয় নিত্য দাস, কী কও–
ইটু ক্রাচিন দ্যান। আন্ধারে থাইকা থাইকা আর পারি না। হেই দিন রাইতে ঘরে সাপ ঢুকছিল।
ক্রাচিন নাই।
ইট্ট ব্যবোস্তা করেন দাস মশয়—
ব্যবস্থা কি আমার হাতে? উই দেখ না ক্রাচিন ডেরামগুলান শূইন্য (শূন্য)।
দয়া করেন দাস মশয়—
দয়ার কী আছে! তোমরা ট্যাকা দিয়া মাল কিনবা, কিন্তু ব্যাপারখান কী জানো?
কী?
ছাপ্লাই নাই। উই দেখ চিনির ছালাগুলা (বস্তাগুলো) শূইন্য পইড়া রইছে।
মিঠার লেইগা পোলাপানগুলো কাইন্দা মরে। কনটোলে চিনি পাইলে কিনতে পারি। কিন্তুক বাইরে গুড়ের দর একেবারে আগুন। কাছে আউগান (এগুলো যায় না।
ক্যান যে তোমরা এত ঘ্যান ঘ্যান কর! কইতে আছি চিনি নাই, নিজের চৌখে হগলে দেখতেও আছ। তবু বিশ্বাস যাও না।
চিনি না দ্যান, কাপড় দ্যান–
কাপড়েরও ছাপ্লাই নাই। আঙুল দিয়ে সারি সারি ফাঁকা আলমারিগুলো দেখিয়ে দেয় নিত্য দাস।
জনতা বলে, চিনি ক্রাচিন না দ্যান তো না দিলেন। কিন্তুক একখান শাড়ি না দিলে চলব না দাস মশয়। কাপড় বিহনে ঘরের বউমাইয়া বাইর হইতে পারে না। গামছায় কি শরম ঢাকে! তারা কয় গলায় দড়ি দিব।
অসীম ধৈর্য নিত্য দাসের। সবার কথা, সবার মিনতি, সবার আবেদন কান পেতে গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনে যায়। তারপর বলে, কাপড় কই পাই? ছাপ্লাই না থাকলে আমি কী করতে পারি? আমার তো আর ধুতি-শাড়ির মেচিন নাই যে বানাইয়া দিমু।
আপনের কুনো কথা শুনুম না। কাপড় না পাইলে এইখানে ‘হত্যা’ (হত্যে) দিয়া পইড়া থাকুম।
হত্যা দিলে কি কাপড় মিলব! হের থিকা এক কাম কর–
কী?
গরমেণ্টেরে (গভর্নমেন্টকে) গিয়া ধর।
গরমেন বুঝি না, আপনেই আমাগো হগল। বাঁচান দাস মশয়, ঘরের বউ-ঝি’র ইজ্জত বাঁচান।
এই সব আবেদন-নিবেদন কাকুতি-মিনক্সি মধ্যে হঠাৎ বিনুকে দেখতে পেলেই হাতের ইশারা করে নিত্য দাস। ভিড় ঠেলে ঠেলে বিনু দোকানের ভেতর চলে আসে।
নিত্য দাস তার কানের কাছে মুখ এনে ফিস ফিস করে, কি ছুটোবাবু, ক্রাচিন নিতে আসছ?
বিনু মাথা নাড়ে, হ্যাঁ।
যাও গা, রাইতে পাঠাইয়া দিমু।
কিন্তু—
কী?
আপনার দোকানে তো কেরোসিন নেই।
থাউক না থাউক, হে তোমার দেখতে হইব না। তুমি ক্রাচিন পাইলেই তো হইল। নিত্য দাস বলতে থাকে, রাইতে যে ক্রাচিন পাঠামু হেই কথাখান গুপন (গোপন) রাইখো। একবার জানতে পারলে উই শকুনের গুষ্টি আমারে ছিড়া খাইব। বলে সামনের জনতাকে দেখিয়ে দেয়।
বিনু যেদিনই কেরোসিন আনতে যায়, সেই একই কথা বলে তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেয় নিত্য দাস। তারপর রাত্রিবেলা তার লোক ঢাকাটুকি দিয়ে কেরোসিনের টিন নিয়ে আসে।
এইভাবেই চলছিল।
নিত্য দাসের যে গোমস্তা কেরোসিন দিয়ে যায় তার নাম সুচাঁদ। হঠাৎ একদিন সে হেমনাথের সামনে পড়ে গেল।
হেমনাথ বললেন, তুই নিত্য দাসের দোকানে কাজ করিস না?
সুচাঁদ বলল, আইজ্ঞা।
এই রাত্রিবেলা আমার বাড়ি কী মনে করে?
আইজ্ঞা ক্রাচিন।
কেরোসিন?
হ–সতর্ক চোখে চারদিক দেখে নিয়ে কাপড়ের আড়াল থেকে মাকারি একটা টিন বার করল সুচাঁদ।
হেমনাথ বিমুঢ়ের মতো বললেন, কী ব্যাপার? এইভাবে চোরের মতো কেরোসিন নিয়ে এসেছিস! আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
তার বাড়িতে এভাবে গোপনে যে কেরোসিন পাঠানো হচ্ছে, হেমনাথ জানতেন না। তার বিমুঢ় হবারই কথা।
বিনু কাছেই ছিল। সে সমস্ত ব্যাপারটা খুলে বলল।
শুনে চিৎকার করে উঠলেন হেমনাথ, হারামজাদার এত বড় সাহস, কেরোসিন ঘুষ দিয়ে আমাকে খুশি করতে চায়! সুচাঁদকে বললেন, বেররা আমার বাড়ি থেকে।
সুচাঁদ ভয় পেয়ে গিয়েছিল, আইজ্ঞা–
উত্তেজিত সুরে হেমনাথ আবার বললেন, এখনও দাঁড়িয়ে আছিস! কেরোসিন টিন নিয়ে এক্ষুনি চলে যা–
সুচাঁদ পালিয়ে গেল।
চেঁচামেচি শুনে স্নেহলতারা বেরিয়ে এসেছিলেন।
স্নেহলতা বললেন, কী হল, অত হইচই কেন?
উত্তেজনা যেন শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছুল হেমানাথের, ওই নিত্য দাসের স্পর্ধা দেখেছ।
কেন, কী করেছে সে?
কী করে নি? রেশনের চিনি-কেরোসিন-কাপড় ব্ল্যাকে দশ গুণ দামে বিক্রি করছে। রাজদিয়া কেতুগঞ্জ-রসুলপুল, চারদিকের গ্রামগুলোর কোনও লোক ন্যায্য দামে এক দানা চিনি পাচ্ছে না, এক ফোঁটা কেরোসিন পাচ্ছে না, কাপড়ের একটা সুতো পাচ্ছে না। আর রাত্রিবেলা লোক দিয়ে আমাকে ঘুষ পাঠানো হচ্ছে! ওকে আমি পুলিশে দেব, জেলে পাঠাব।
স্নেহলতা শুধোলেন, সুচাঁদ কি কেরোসিন এনেছিল?
হেমনাথ বললেন, এনেছিল। আমি তাড়িয়ে দিয়েছি।
তাড়িয়ে তো দিলে, হেরিকেন জ্বলবে কেমন করে?
জ্বলবে না। গন্ধকশলা আর রেড়ির তেল দিয়ে কাজ চালাও। তা যদি না পার, অন্ধকারে থাকবে। সারা দেশে আলো নেই, আর তুমি নিজের ঘরে দেয়ালি জ্বালবে–এ হতে পারে না স্নেহ।
