হেমনাথ তাঁর অসুখের কথা বললেন, এবং কিছুদিন ধরে যে বন্দি জীবন যাপন করছেন, তা ও জানলেন।
রজবালি আন্তরিক সুরে বলল, আপনের অ্যামন অসুখ, খপর পাই নাই তো। পাইলে আগেই আসতাম।
হেমনাথের মুখ দেখে মনে হল, রাজবালির আন্তরিকতাটুকু খুবই ভাল লেগেছে তাঁর। মৃদু হেসে বললেন, তোদের খবর ভাল তো?
আপনেরা য্যামন রাখছেন।
আমরা রাখবার কে? যিনি রাখবার তিনিই রেখেছেন।
হে যা কইছেন।
তারপর কী মনে করে? কোনও দরকারে এসেছিস, না এমনি বেড়াতে?
রজবালি হাসল, ব্যবসায়ী মানুষ, বিনা দরকারে কুনোখানে যাওনের উপায় আছে? সোময় কই?
জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন হেমনাথ।
রজবালি বলল, এইখানে যে মিলিটারি আসছে আমি তাগো কাছে ছাপ্লাইয়ের এট্টা অডার’ পাইছি। কী সাপ্লাই?
হাস-মুরগি-পাঠা-ডিম, চাউল-ডাইল–এই হগল। অডারের ব্যাপারটা পাকা করতে আইজ আইছিলাম।
বিনুর হঠাৎ নিত্য দাসের কথা মনে পড়ল। দেখা যাচ্ছে, মিলিটারির কল্যাণে চারদিকের বড় বড় ব্যবসায়ী আর আড়তদাররা রাজদিয়ায় হানা দিতে শুরু করেছে।
হেমনাথ শুধালেন, অর্ডারের কথা পাকা হল?
হ।
কবে থেকে সাপ্লাই দিতে হবে?
রজবালি বলল, পরশু থিকা। ভাবতে আছি রাইজদায় এট্টা বাড়ি ভাড়া নিমু। এইখানে ‘রাখি’ কইরা না রাখতে পারলে রুজ রুজ ঠিক সোময় মাল ছাপ্লাই দিতে পারুম না। এয়া তো এতি-পেতি লইয়া কারবার না, মিলিটারি বইলা কথা। টাইমে দিতে না পারলে ঘেটিতে মাথা থাকব না।
রজবালি আরও জানালো, স্টিমারঘাটের কাছে মন্তাজ মিঞা যে নতুন বাড়িখানা করেছে, সেটাই ভাড়া করতে চাইছে। মোটামুটি কথাবার্তা হয়ে গেছে। কাল পরশু বাড়িটার দখল পাওয়া যেতে পারে।
হেমনাথ এবার অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে এলেন, তোদের ওদিকে ধানচালের খবর কী বল–
জবর খারাপ হ্যামকত্তা। দশ পনর দিন ধইরা মীরকাদিমের বাজারে একদানা চাউল নাই। চাউল বইলা কথা। মাইনষে পাগলের লাখান ঘুরতে আছে।
চিন্তিত মুখে হেমনাথ বললেন, খুবই বিপদের কথা। তা হ্যাঁ রে, তোর আড়তে তো অত ধান ছিল। সব বিক্রি করে ফেলেছিস?
চকিতে চারদিক একবার ভাল করে দেখে নিয়ে রজবালি বলল, না। অত ধান চাউল কি দুই চাইর-দশ দিনে বেচা যায়! ছয় মাস ধইরা বেচলেও শ্যাষ করন যাইব না। একটু চুপ করে থেকে আবার বলল, হগল ব্যবসায়ীতে যা করছে, আমিও হেই করছি হ্যামকত্তা।
কী করেছিস?
ধান চাউল সরাইয়া ফেলাইছি।
কেন? বিমূঢ়ের মতো জিজ্ঞেস করলেন হেমনাথ।
রজবালি বলল, দর আরও চেতুক (চড়ক), হের পর ছাড়ুম। আমার এক সুমুন্দি মানিকগুঞ্জের উই দিকে চাউলের ব্যবসায়ী। হেয় কইছে, দর আরও চেতবো। যত পারি অহন য্যান ধান-চাউল ‘রাখি’ করি।
হেমনাথ বললেন, ‘রাখি’ তো করছিস। এদিকে দেশের লোক না খেয়ে শুকিয়ে মরছে, সেদিকে খেয়াল আছে?
কথাটা শুনেও শুনল না রজবালি। অন্যমনস্কের মতো বলতে লাগল, আমরা ব্যবসায়ী। দ্যাশের মাইনষের দিকে তাকাইলে আমাগো কি চলে! একটু থেমে আবার বলল, আপনের তো মেলা জমিন। বাড়তি ধান চাউল কিছু আছে? থাকলে আমারে দিতে পারেন। ভাল দাম দিমু।
হেমনাথ মাথা নাড়লেন, নেই। প্রত্যেক বার ধান ওঠার পরই বাড়তি ধান বেচে দিই। এবারও দিয়েছি। বেশি কিছু থাকলেও তোকে দিতাম না। লোককে বিলিয়ে দিতাম।
রজবালি কথাটা গায়ে মাখল না। হাসতে হাসতে বলল, আপনের লগে কার তুলুনা। আপনে নিজে না খাইয়াও মাইনষেরে খাওয়াতেই পারেন। কিন্তু আমরা হইলাম ব্যবসায়ী মানুষ।
হেমনাথ উত্তর দিলেন না।
রজবালি বলল, অনেকক্ষণ আইছি। এইবার যাই হ্যামকত্তা। উঠতে গিয়ে কী মনে পড়তে বসে পড়ল, ভাল কথা, আপনেরে একখান খপর দেওয়া হয় নাই–
কী খবর?
মুছলিম লিগের নাম শুনছেন?
মুসলিম লিগ? শুনব না কেন?
হ। রজবালি মাথা নাড়ল, কয়দিন আগে ঢাকার থিকা মুছলিম লিগের বড় মিঞারা মীরকাদিমে আইসা মিটিন করল। মিটিনে তেনারা কী কইল জানেন?
কী?
মুছলমানগো লেইগা একখান দ্যাশ চাই। তার নাম পাকিস্থান। তেনারা আরও কইল, যেখানে যত মুছলমান আছে হগলের লিগে নাম লিখান দরকার। অত বড় মানুষগুলা কইছে, কেও আর না কইতে পারল না। আমাগো উইদিকের মেলা মাইনষে মুছলিম লিগে নাম লিখাইতে আছে।
একটু পর রজবালি গেল।
২.৩৬-৪০ চিনি কেরোসিন আর কাপড়
২.৩৬
কনট্রোল হবার আগেই চিনি কেরোসিন আর কাপড় বাজার থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিল। তারপর এই রাজদিয়ায় তিনখানা কনট্রোলের দোকান বসল। একটা নিত্য দাসের, একটা অখিল সাহার আর তৃতীয়টি রায়েবালি শিকদারের।
প্রথম প্রথম রেশন কার্ড দেখিয়ে জিনিস তিনটে পাওয়া যাচ্ছিল। তারপর কনট্রোলের দোকান থেকে সেগুলো অদৃশ্য হয়ে গেল।
মিলিটারি ব্যারাকগুলি বাদ দিলে রাজদিয়ার ঘরে ঘরে আজকাল আর হেরিকেন জ্বলে না। গন্ধক শলা কি রেডির তেলের প্রদীপ জ্বালিয়ে সবাই রাতের কাজ সারে। চারদিকের গ্রামগুলোর অবস্থা আরও করুণ। সেখানকার মানুষেরা বিকেল থাকতে খেয়েদেয়ে (যে খাবার জোটাতে পারে) ঘরে খিল লাগিয়ে দেয়। ফলে সন্ধে নামতে না-নামতেই গ্রামগুলো নিশুতিপুর। সারা পূর্ব বাংলা জুড়ে পাতালের অন্তহীন, গাঢ় অন্ধকার যেন অনড় হয়ে আছে।
.
বিনুদের রেশন কার্ড পড়েছে নিত্য দাসের দোকানে। চিনি আর কেরোসিন আনতে বিনুকে সেখানে যেতে হয়। যখনই যায়, তার চোখে পড়ে, দোকানটার সামনে উলটো চন্ডীর মেলা লেগে আছে। শুধু নিত্য দাসের দোকানেই না, অখিল সাহা আর রায়েবালি শিকদারের দোকান দুটোরও একই হাল।
