ভবতোষ মলিন হেসেছেন, এক মাস দু’মাস কি রে, গেলাম তো পরশু বিকেলবেলা।
মা কোথায়?
ঝাঁপসা, ভারী স্বরে ভবতোষ বললেন, হাসপাতালে রেখে এসেছি।
কবে আসবে?
চার পাঁচ দিন পরে নিয়ে আসব।
ঝিনুকের সব প্রশ্নের উত্তর ঠিকই দিয়ে গেছেন ভবতোষ, তবে কেমন যেন শ্বাসরুদ্ধের মতো। গলার কাছের মোটা মোটা রক্তবাহী শিরাগুলো অস্বাভাবিক স্ফীত হয়ে উঠেছে। চোখ ফেটে হয়তো। বা ফিনকি দিয়ে রক্তই ছুটবে।
বাতাসে কদম ফুলের রেণুর মত যে ফিনফিনে ইলশেগুঁড়ি উড়ছিল, এখন আর তা নেই। তার বদলে শরতের ঝিরঝিরে বৃষ্টি আবার শুরু হয়ে গেছে।
স্নেহলতা বললেন, ঘরে চল ভব। এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে ভিজে নেয়ে যাবে।
আবার ঘরে যাব? আমি বরং ঝিনুককে নিয়ে এখন যাই। পরে আসব’খন।
ঝিনুককে নেবার জন্যেই ছুটে এসেছ নাকি?
হ্যাঁ, মানে–
সেজন্যে তোমাকে ব্যস্ত হতে হবে না। স্নেহলতা বলতে লাগলেন, তুমি ঘরে এস তো। উঠোন পর্যন্ত এলে, ঘরে গিয়ে না বসলে আমাদের খুব খারাপ লাগবে।
মৃদু স্বরে ভবতোষ বললেন, আচ্ছা, চলুন–
এমনভাবে কথাগুলো বললেন ভবতোষ, যাতে মনে হয়, নিজের ইচ্ছায় তিনি চলেন না। হয়তো নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছা তার ওপর ক্রিয়া করে না। অন্যের খুশিতে তাঁর চলাফেরা, ওঠাবসা। সমস্ত কিছুই অন্যের তাড়ায়, অন্যের নির্দেশে।
অবনীমোহনরা যেখানে আছেন সেই ঘরটার দিকে পা বাড়ালেন স্নেহলতা। অন্য সবাই তাকে অনুসরণ করল।
যেতে যেতে স্নেহলতা শুধোলেন, ঢাকা থেকে কখন ফিরলে ভব?
ভবতোষ বললেন, খানিক আগে। বাড়ি ফিরেই আপনাদের এখানে চলে এসেছি।
নারায়ণগঞ্জ থেকে কখন স্টিমার ধরেছ?
দশটা নাগাদ।
চান-খাওয়া নিশ্চয়ই হয় নি?
স্টিমারে মিষ্টি টিষ্টি খেয়েছিলাম।
মিষ্টি খেলে কখনও চলে? তোমার বাড়িতে তো রান্নাবান্না হয়নি। রাঁধবেই বা কে?
ভবতোষ চুপ করে রইলেন। স্নেহলতা ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, একটু জিরিয়ে নাও, তারপর খেয়ে দেয়ে বাড়ি ফিরবে।
অন্যমনস্কের মতো ভবতোষ বললেন, আচ্ছা।
একটুক্ষণ নীরবতা। তারপর ভবতোষ ডাকলেন, খুড়িমা–
কী বলছ? চলতে চলতে পেছন ফিরে একবার তাকিয়ে নিলেন স্নেহলতা।
হেমকাকা আমার কাছে সেদিন ফিটনটা চেয়েছিলেন। কাদের আসবার কথা ছিল না?
হ্যাঁ।
তাঁরা এসেছেন?
হ্যাঁ। ভেতরে এস, আলাপ করিয়ে দিচ্ছি।
ঘরে এসে অবনীমোহনদের সঙ্গে ভবতোষের পরিচয় করিয়ে দিলেন স্নেহলতা। তারপর বললেন, এখন কিছু খাবে ভব?
না। তবে—
বলে ফেল না—
একটা জিনিস পেলে মন্দ হত না, কিন্তু আপনাদের এখানে তার প্রবেশ তো নিষিদ্ধ।
স্নেহলতা হাসলেন, চা নিশ্চয়ই?
ভবতোষ মাথা নাড়লেন।
স্নেহলতা বললেন এ বাড়িতে চা ঢুকে পড়েছে।
মলিন বিষণ্ণতার মধ্যেও ভবতাষের চোখে বিস্ময়ের ছায়া পড়ল। বললেন, কাকাবাবু চা ঢুকতে দিলেন!
না দিয়ে উপায় কী। স্নেহলতা হাসতে হাসতে বললেন, আমার মেয়ে-জামাই, নাতি-নাতনীদের আবার ওই জিনিসটি না হলে চলে না।
ভবতোষ বললেন, যাক, এ বাড়ি নিয়ে রাজদিয়ার সাত বাড়িতে তা হলে চা ঢোকার ছাড়পত্র পেল। এবার থেকে চায়ের লোভেও মাঝে মাঝে আসতে হবে।
অবনীমোহন অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। বললেন, এ বাড়ি বাদ দিলে থাকে ছ’বাড়ি। ওই ছ’বাড়ি ছাড়া রাজদিয়ায় চায়ের চল নেই নাকি?
ভবতোষ মৃদু হাসলেন, না। হেমকাকা নিজে পি. সি. রায়ের শিষ্য, রাজদিয়াকেও তাই করে ছেড়েছেন। শুধু আমরা ক’জন পাষন্ড তাকে অমান্য করে চলেছি।
অবনীমোহনও হেসে ফেললেন।
একটু পরে চা এল। স্নেহলতা বা শিবানীর চা তৈরির অভ্যাস নেই, সুনীতিই করে এনে দিল।
চা খেতে খেতে ভবতোষ স্নেহলতার দিকে ফিরে বললেন, ঝিনুক কান্নাকাটি করে নি?
না।
আমার কথা বলেছিল?
মোটেও না। তবে–
কী?
বিনুর দিকে আঙুল বাড়িয়ে স্নেহলতা এবার বললেন, ওই দাদাভাইটা আসার পর খুব হিংসে হয়েছে। জেদ করে, বায়না ধরে ওর সমান সমান ভাগ আদায় করেছে। বলে তিনি হাসলেন।
ঘরের অন্য সবাইও হাসল। আর বিনু নেহাত অকারণেই হঠাৎ খুব লজ্জা পেয়ে গেল।
চা খাওয়া হলে তাড়া দিয়ে ভবতোষকে চান করতে পাঠালেন স্নেহলতা। পুকুরঘাট থেকে ফিরে এলে এ ঘরেই আসন পেতে খেতে বসিয়ে দিলেন।
বিশাল ঘরের এক ধারে দুটো তক্তপোশ জোড়া দেওয়া। তার ওপর অবনীমোহনরা বসে আছেন। তাদের দৃষ্টি ভবতোষের ওপরেই স্থির হয়ে রয়েছে। এই মানুষটি সম্বন্ধে হেমনাথ এবং স্নেহলতা দু’জনে গাঢ় বিষাদময় কিছু ভূমিকা করে রেখেছিলেন। অবনীমোহনদের চোখ দেখে মনে হয়, সাগ্রহে কিসের যেন প্রতীক্ষা করছেন।
প্রায় নিঃশব্দেই খেয়ে যাচ্ছিলেন ভবতোষ। আধাআধি খাওয়া হয়েছে, এমন সময় স্নেহলতা ডাকলেন, ভব–
পাত থেকে মুখ তুলে জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন ভবতোষ।
তক্ষুনি কিছু বললেন না স্নেহলতা। বলবেন কি বলবেন না, তাই নিয়ে মনে মনে খুব সম্ভব বোঝাঁপড়া করতে লাগলেন। অনেকক্ষণ পর দ্বিধান্বিত সুরে জিজ্ঞেস করলেন, কাল তোমার ফেরার কথা ছিল না?
হ্যাঁ।
এলে না যে?
ভবতোষ উত্তর দিলেন না। ঝোলমাখা ভাতের ভেতর তার হাত থেমে গেছে, কণ্ঠার কাছটা থর থর কাঁপছে।
স্নেহলতা আবার প্রশ্ন করলেন, এই দু’দিন কি বৌমাদের বাড়িতেই ছিলে?
আস্তে মাথা নাড়লেন ভবতোষ, না।
খানিক আগে চায়ের ব্যাপার নিয়ে লঘু কৌতুকের চিকচিকে একটু আভা ফুটেছিল সবার চোখেমুখে। সমস্ত আবহাওয়া আবার অত্যন্ত ভারী, কষ্টকর আর যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠল।
