ওজনের পর যারা টিকে রইল এস.ডি.ও সাহেব নিজের হাতে তাদের নাম ঠিকানা লিখে নিলেন। তারপর বললেন, পরশু দিন তোমরা রাজদিয়া মিলিটারি ব্যারাকে চলে যাবে।
লোকগুলো শুধলো, কহন যামু?
সকালবেলা। হ্যাঁ, ভাল কথা, খালি পেটে আসবে। সেদিন তোমাদের মেডিক্যাল হবে।
মেডিক্যাল কী?
স্বাস্থ্য পরীক্ষা।
ঝাড়াই বাছাইয়ের কাজ সুচারুভাবে সম্পন্ন করে এস.ডি.ও সাহেব মিলিটারি অফিসার এবং পুলিশ বাহিনী নিয়ে চলে গেলেন।
চরের যে মুসলমান কামলারা ধানকাটার সময় হেমনাথের বাড়ি আসে তাদের ভেতর একজনকে মোটে পছন্দ করা হয়েছে। সে তাহের। প্রাথমিক পরীক্ষায় বাকি কারোর যোগ্যতা প্রমাণিত হয় নি।
খলিল বছিররা অযোগ্যতার গ্লানি দুই কাঁধে ঝুলিয়ে হতাশ মুখে ফিরে এল। তাহেরও তাদের সঙ্গে। এসেছে। অন্য কেউ সেনাদলে চাকরি পাবে না, সেজন্য বেচারা প্রাণ খুলে আনন্দ পর্যন্ত করতে পারছে না। রিকুমেন্টের লোকেরা সবাইকে বাদ দিয়ে তাকে পছন্দ করেছে, এ যেন তারই অপরাধ। খলিলদের পিছু পিছু মুখ চুন করে তাহের এসে দাঁড়াল।
বিনুরা এখনও সেইখানেই দাঁড়িয়ে আছে।
অবনীমোহন বললেন, তোমাদের একজনকে বেছে নাম লিখে নিল, দেখলাম।
খলিল বলল, হ। তাহেররে অগো পছন্দ হইছে। আর আমরা ফ্যালনা, গাঙ্গের পানিতে ভাইসা আসছি।
অবনীমোহন চুপ করে থাকলেন।
খলিল আবার বলল, আমি উচায় (উচ্চতায়) খাটো হইলাম। আরে আমি যে খাটো হেয়াতে কি আমার হাত আছে? খোদায় য্যামন বানাইছে, ত্যামন হইছি। ইচ্ছা কইরা খাটো হইছি?
অবনীমোহন মাথা নাড়েন, তা তো বটেই।
বছির এবার বলল, বুকের মাপে আমি খারিজ হইয়া গেলাম। ছাতির ওসার (প্রস্থ) নিকি আমার কম। কম হইব না তা কি বেশি হইব! উপাস দিয়া দিয়া পরান যায়। ছাতি বড় হইব ক্যামনে? বাইচা যে আছি, হেই না কত?
সবাই ক্ষুব্ধ, আশাহত, দুঃখিত। অবনীমোহনের উত্তর দেবার মতো কিছুই ছিল না।
খলিল বলল, হগলই নছিব জামাইকত্তা। আমরা যুজ্যে গিয়া যে দু’গা খাইয়া বাচুম, খোদাতাল্লায় তা চায় না।
.
২.৩৫
হেমনাথ সেই যে জ্বরে পড়েছিলেন, সারতে দশ দিন লেগে গেল। জ্বর সারলেও দুর্বলতা কাটল না। একটু হাঁটলেই পা ভেঙে আসে, মাথা ঘুরতে থাকে।
চিরকাল বয়সকে অস্বীকার করে এসেছেন হেমনাথ। বয়সও এতকাল উদাসীন ছিল। হঠাৎ সে তাঁর দিকে নজর দিতে শুরু করেছে, এবং প্রথম সুযোগেই বিছানায় ফেলে দিয়েছে।
অসুস্থ, দুর্বল শরীর নিয়ে কোথায় গিয়ে কী বিপদ ঘটাবেন, সেই ভয়ে স্নেহলতা তাকে বাইরে বেরুতে দেন না। পাছে বেরিয়ে যান, সেজন্য চোখে চোখে রাখছেন।
এত বড় সংসার যার মাথায় তার তো এক জায়গায় বসে থাকলে চলে না। কোনও দরকারে উঠে যেতে হলে ঝিনুক কিংবা সুধা সনীতিকে পাহারাদার হিসেবে হেমনাথের কাছে বসিয়ে রেখে যান স্নেহলতা।
হেমনাথ চেঁচামেচি করেন, বসিয়ে বসিয়ে আমাকে একেবারে অথর্ব করে ফেলছ স্নেহ।
স্নেহলতা হাসেন, তাই নাকি?
নিশ্চয়ই। দেখো, আমাকে ঠিক বাতে ধরবে।
তা হলে আমি খুশি হব।
হেমনাথ অবাক হয়ে বলেন, খুশি হবে!
মজার ভঙ্গি করে ঘাড় হেলিয়ে দেন স্নেহলতা, হব হর, একশ’বার হব।
কেন?
বাতে শুয়ে থাকলে অন্তত চরকির মতো ঘোরাটা তোমার বন্ধ হবে। এত বয়েস হল, তবু ঘোরা বাই যাচ্ছে না।
একটু চুপ করে থেকে কৌতুকের গলায় হেমনাথ বলেন, তুমি তো অসুখের জন্যে আমাকে বেরুতে দিচ্ছ না। রাজদিয়ার লোক কিন্তু অন্যরকম ভাবতে শুরু করেছে।
অস্বস্তির সুরে স্নেহলতা জিজ্ঞেস করেন, কী ভাবছে?
বুড়ো বয়েসে তোমার নাকি রস উথলে উঠেছে। দিনরাত আমাকে কোলে শুইয়ে, মুখে মুখ। রেখে—
কথা আর শেষ করতে পারেন না হেমনাথ। তার আগেই স্নেহলতা মুখ লাল করে ঝঙ্কার দিয়ে ওঠেন, আহা, কথার কি ছিরি! কিছুই আটাকায় না মুখে!
হেমনাথ হাসতে থাকেন।
স্নেহলতা আগের সুরে বলতে থাকেন, তোমার চালাকি আমি বুঝি। লোকের ওসব কথা বলতে বয়ে গেছে। বললেও তোমাকে বাড়ির বার হতে দিচ্ছ না।
হেমনাথের বন্দিত্ব যেন আর ফুরোতে চায় না। এরই ভেতর একদিন বিকেল বেলা মীরকাদিমের রজবালি শিকদার এসে হাজির।
রজবালির বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। গায়ের রং টকটকে। এই বয়সেও শরীরের বাঁধুনি বেশ মজবুত। হাতের হাড় চওড়া, চোয়াল শক্ত, চিবুক ধারাল। দাড়ি এবং গোঁফ শৌখিন করে ছাঁটা। চোখদুটি সবসময় সজাগ এবং তীক্ষ্ণ। তাকে ফাঁকি দিয়ে কিছু হবার উপায় নেই। যার দিকে রজবালি তাকায় তার বুকের গভীর পর্যন্ত যেন সে দেখতে পায়।
পরনে ডোরাকাটা সিল্কের লুঙ্গি আর ফিনফিনে পাঞ্জাবি। তার তলায় জালিকাটা গেঞ্জির আভাস। মাথায় নকশা করা ধবধবে টুপি। কানে আতর মাখানো গোলাপি রঙের তুলল। পায়ে কাঁচা চামড়ার নাগরা। চোখের কোলে সুর্মার সূক্ষ্ম টান। সব মিলিয়ে মানুষটি রীতিমতো শৌখিন।
মীরকাদিমের গঞ্জে রজবালির ধান-চাল মুগ-মসুর তিল-তিসি ইত্যাদি শস্যের ব্যবসা। শাল কাঠের খিলান-দেওয়া টিনের প্রকান্ড চারটে আড়ত রয়েছে তার। সবসময় সেগুলো বোঝাই, কম করে এক দেড় হাজার মণ শস্য মজুত থাকে। এছাড়া আছে হাঁড়ি বালতির দোকান, মনিহারি দোকান। সব মিলিয়ে এলাহী ব্যাপার।
হেমনাথ বললেন, রজবালি যে, আয়–আয়– বিনু কাছেই ছিল। তাকে একটা জলচৌকি এনে দিতে বললেন।
জলচৌকি এলে তার পর বসতে বসতে রজবালি বলল, ক্যামন আছেন হ্যামকত্তা? শরীল ক্যামন কাহিল কাহিল ঠ্যাকে।
