বিনু আবদারের গলায় বলল, বাবা, আমি রিক্রুট করা দেখব।
খুব একটা ইচ্ছা ছিল না অবনীমোহনের। তবু ছেলে যখন ধরেছে, আর না বলতে পারলেন না। বললেন, চল–
বিষহরিতলার কাছে আসতে দেখা গেল, লারমোর ঝাকড়া বটগাছের তলায় যথারীতি তাঁর রোগীপত্তর নিয়ে বসে আছেন। এত যে ডামাডোল, আকাল, যুদ্ধ, সমস্ত জল-বাংলা জুড়ে যে এত দুর্ভিক্ষের দুর্ভাগ্যের ছায়া, সে সবের কোনও দিকেই লক্ষ্য নেই তার। বহুজনহিতায় বহুজনসুখায় এক প্রশান্ত ধ্যানের ভেতর তিনি মগ্ন হয়ে আছেন।
বিষহরিতলা বাঁয়ে ফেলে খোলা মাঠের কাছে আসতে দেখা গেল, ঢাকের বাজনা থেমে গেছে। এর ভেতর হাটের নানা দিক থেকে মানুষ গিয়ে সেখানে জমা হতে শুরু করেছে।
এস.ডি.ও সাহেব জমায়েতটার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। মোটামুটি শ’চার পাঁচেক লোক জমেছে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, যারা সৈন্যদলে নাম লেখাবে তারা ডান দিকের ওই ফাঁকা জায়গায় গিয়ে দাঁড়াও।
ভিড়ের ভেতর থেকে একজন দু’জন করে ফাঁকা জায়গায় গিয়ে দাঁড়াতে লাগল। বিনুর মনে পড়ল, তিন চার সপ্তাহ আগে যখন সুজনগঞ্জের হাটে এসেছিল তখন রিক্রুমেন্টের কথায় হাটুরে লোকেরা ভয় পেয়ে গিয়েছিল। এক মাসের কম সময়ের ভেতর কি এমন ঘটল যাতে তাদের ভয় কেটে গেছে?
হঠাৎ বিনুর চোখে পড়ল, তার ঠিক পাশে খলিল বছির তাহের এবং আরও ক’জন চরের মুসলমান দাঁড়িয়ে আছে। ধানকাটার মরশুমে তারা হেমনাথের বাড়ি আসে। কিছুদিন আগেও তাদের রাজদিয়ায় মাটি ভরাট এবং মিলিটারি ব্যারাক তৈরি করতে দেখা গেছে।
বছিরদের দেখে বিনু অবাক। বলল, তোমরা এখানে?
বছির বলল, যুজ্যে নাম লিখাইতে আইছি।
তোমরা যুদ্ধে যাবে!
হ।
এই সময় অবনীমোহন তাদের দিকে ফিরলেন। বছিরদের শেষ কথাগুলো তিনি শুনতে পেয়েছিলেন। বিস্ময়ের সুরে বললেন, যুদ্ধে যাবে কেন?
বছির বলল, কাম কাইজ নাই। কিছু এট্টা তো করন লাগব।
বিনু বলে উঠল, কাজ নেই মানে! এই তো ক’দিন আগে মিলিটারিদের ওখানে মাটি কাটছিলে। ব্যারাক তৈরি করছিলে–
হে আর কয়দিনের কাম? শ্যাষ হইয়া গ্যাছে।
খানিক ভেবে অবনীমোহন বললেন, আর কোথাও কোনও কাজ পেলে না?
না জামাইকত্তা বিষণ্ণভাবে মাথা নাড়ল বছির, কুনোখানে কাম নাই। এই দিকে ধান-চাউল মিলে না। আগে চাষবাসের খন্দ গ্যালে মাইনষের বাড়িত্ কামলা খাটতাম। অহন কেও কামলা নেয় না। উপাস দিয়া দিয়া আর পারি না জামাইকত্তা। পোলাপান মরতে বইছে।
তাহের বলল, শুনছি, যুজ্যে গ্যালে প্যাটভরা খাওন মিলব, মাস মাস ট্যাকা পাওন যাইব। না খাইয়া মরার থিকা যুজ্যে যাওন ভালা না?
অবনীমোহন কী বলবেন, ভেবে পেলেন না।
তাহের আবার বলল, আমাগো চরের কেউ আর ঘরে বইসা থাকব না। হগলে যুজ্যে যাইব গিয়া।
খলিল বলল, হুদা (শুধু) আমাগো চরের নিকি, চাইর দিকে যা আকাল লাগছে, হেয়াতে যাগো ঘরে চাউল আছে হেরা (তারা) ছাড়া বেবাক মাইনষে যুজ্যে যাইব। না গিয়া উপায় নাই জামাইকত্তা। নিজেরা না খাইয়া থাকি, হে এক কথা। কিন্তুক চৌখের সামনে পোলা-মাইয়া প্যাটের জ্বালায় দাপাইয়া মরব, এখাইয়া থাকি, হেরা ছাড়া বেকার
অবনীমোহন অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকলেন। এবারও কিছু বলতে পারলেন না।
ওদিক থেকে একটা কনস্টেবলের গলা ভেসে এল, যারা যুজ্যে যাইবা, উই ধারে গিয়া লাইন দিয়া খাড়াও–যারা যুজ্যে যাইবা–
প্রথমে এস.ডি.ও সাহেব যুদ্ধে যাবার ডাক দিয়েছিলেন। এখন তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে কনস্টেবলটা চেঁচিয়ে যাচ্ছে। আর এস.ডি.ও সাহেব চেয়ারে বসে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সমস্ত কিছু পর্যবেক্ষণ করছেন। তার পাশে বসে আছে মিলিটারি অফিসাররা।
বছির আর অপেক্ষা করল না। ডান দিকে যেখানে লম্বা লাইন পড়েছে তার পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। চোখের পলকে লাইনটা বিশ হাত বেড়ে গেল।
যুদ্ধে যেতে ইচ্ছুক লোকগুলোর সংখ্যা যখন একশ’ ছাড়িয়ে গেছে, সেই সময় এস.ডি.ও সাহেব বললেন, এবার বাছাইয়ের কাজ শুরু কর।
তিন চারটি কনস্টেবল ফিতে দিয়ে ব্যস্তভাবে মাপামাপি শুরু করে দিল। একবার তারা লোকগুলোর পা থেকে মাথা পর্যন্ত মাপছে, তারপর বুকের ছাতি মাপছে।
সেনাদলে যাকে তাকে নেওয়া হয় না। সেখানে নাম লেখাতে হলে বিশেষ শরীরিক উচ্চতা, ওজন আর বুকের মাপ থাকা দরকার। তার কম হলে চলবে না।
কেউ লম্বায় ঠিক হচ্ছে তো বুকের মাপে আটকে যাচ্ছে। কারোর বুকের মাপ ঠিক হচ্ছে তো। লম্বায় আটকে যাচ্ছে।
এর ভেতর যারা চলাক চতুর তারা পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে উচ্চতা বাড়াবার চেষ্টা করছে। যাদের বুক রোগা পাখির মতো তারা জোরে ফুসফুঁসে বাতাস টেনে টেনে ফুলিয়ে রাখছে। কিন্তু কনস্টেবলদের চোখে ধুলো ছিটানো সহজ নয়। যারা ডিঙি মেরে লম্বা হয়েছিল রুলের গুতোয় তাদের বেঁটে করে দিচ্ছে তারা। যারা বুক ফুলিয়ে রেখেছে তাদের পেটে ঘুষি মেরে হাওয়া বার করে দিচ্ছে।
যাদের মাপ মিলল, মুরগি বাছাইয়ের মতো তাদের একধারে দাঁড় করিয়ে রাখল কনস্টেবলরা, বাকিদের ভাগিয়ে দিল। দেখা গেল, শ’খানেক লোকের ভেতর অর্ধেকই বাতিল হয়ে গেছে।
বাছাইয়ের প্রথম কাজ হল দৈর্ঘ্য প্রস্থের মাপ নেওয়া। তারপর বাক্সের মতো চৌকো একটা যন্ত্রের ওপর বসিয়ে পছন্দ করা লোবগুলোর ওজন নেওয়া হল। ওজন নিতে গিয়ে আরও কিছু লোক ছাঁটাই হয়ে গেল।
