কিছুক্ষণ হাত বুলোবার পর মজিদ মিঞা চলে গেল। ঘন্টাখানেক পর লারমোরকে নিয়ে আবার এসে হাজির হল। বলল, দ্যাখেন লালমোহন সাহেব, পোলায় নি আমার বাচব! বলে তার কী কান্না।
অবনীমোহন হেমনাথ যত বোঝন, জ্বর হয়েছে, সেরে যাবে–মজিদ মিঞা শোনে না। তার কান্না বাড়তেই লাগল, অয় রে, কী পাষাণ পরান আমার–
সারা রাত বিনুর শিয়রে জেগে বসে থাকল মজিদ মিঞা।
.
এরই ভেতর একদিন ঢাকা ইউনিভাটির এম.এ পরীক্ষার রেজাল্ট বেরিয়ে গেল। যা আশা করা গিয়েছিল, তা-ই হল। হিরণ ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছে।
কলেজের চাকরি হয়েই ছিল। রেজাল্ট বেরুবার পর রাজদিয়ায় এসে প্রফেসারি নিল হিরণ।
.
২.৩৪
জ্বর ছাড়ার পর অবনীমোহনের সঙ্গে একদিন সুজনগঞ্জের হাটে গেল বিনু। হেমনাথ আসেন নি। ক’দিন ধরে তার জ্বর, একেবারে শয্যাশায়ী হয়ে আছেন। বিনু সেরে উঠবার পরই তিনি জ্বরে পড়েছেন।
দু’বছর হল বিনুরা রাজদিয়া এসেছে। এই প্রথম হেমনাথকে সে অসুস্থ হতে দেখল।
হাটে পা দিতেই বিনুদের কানে এল, সুজনগঞ্জে চাল পাওয়া যাচ্ছে না। এতবড় একটা গঞ্জ, যেখানে ফি হাটে কম করে হাজার, দেড়-হাজার মণ ধান-চাল বিকিকিনি হয় সেখানে একদানা শস্যও নেই। নদীর ধার ঘেঁষে সারি সারি আড়তগুলোতে তালা ঝুলছে। পুব দিকে হাটুরে চালার তলায় চারপাশের গ্রাম থেকে চাষীরা ঘরে ভানা চাল এনে বসত। চালাগুলো আজ ফাঁকা।
চাল নেই, চাল নেই।
তামাকহাটা বেগুনহাটা মরিচবাটা–যেখানেই বিনুরা যাচ্ছে, সন্ত্রস্ত গুঞ্জন শুনতে পাচ্ছে।
হায় আল্লা, বাজারে চাউল নাই। নিজেরা খাই কী? পোলাপানরে বাঁচাই ক্যামনে?
হে ভগমান, অদ্দিষ্টে কী যে আছে!
বিনুরা দেখতে পেল, হাটের নানা জায়গায় থোকা থোকা ভিড় জমেছে। সবাই ভয়ার্ত, বিহ্বল, দিশেহারা। চাল ছাড়া আর কেউ কোনও কথা বলছে না।
ঘুরতে ঘুরতে মাছ ব্যাপারি গয়জদ্দির সঙ্গে দেখা। সে বলল, হাটে কুন সময় (কখন) আইলেন জামাইকত্তা?
অবনীমোহন বললেন, একটু আগে।
খপর শুনছেন?
হ্যাঁ, শুনলাম।
পঞ্চাশ ষাইট বচ্ছর ব’স (বয়স) হইল, চাউলের অ্যামন আকাল আর দেখি নাই। ঘরে এক পাসারি চাউল আছে, তিন ওক্ত কইরা খাইলে তিনদিনও চলব না। দুই ওক্ত কইরা খাইলে বড় জোর চাইর রোজ। হেরপর কী যে করুম!
অবাক হয়ে অবনীমোহন বললেন, তোমার ঘরে মোটে এক পসারি চাল থাকবে কেন? তোমার না দশ কানি ধানের জমি!
গয়জদ্দি কপালে চাপড় মেরে বলল, আর কইয়েন না জামাইকত্তা, বুদ্ধির দুষ (দোষ) আর লোভ। দুইয়ে পইড়া এইবার গুষ্ঠিসুদ্ধা মরলাম।
কিরকম?
ধান-চাউলের দর যহন চ্যাতনের (
চার) মুখে হেই সোময় ঘরের বেবাক ধান-চাউল দিলাম বেইচা। টাকা হাতে পাইয়া মাথা গেল গরম হইয়া। চাষীর হাতে কাঁচা ট্যাকা। বুঝলেন জামাইকত্তা, বড় পোলার শাদি দিলাম। শাদির পর পনর দিন ধইরা খাওয়ানের কী চোট! আত্মবান্ধব মিলাইয়া চাল্লিশজন বাড়ি বইসা খাইল। রুজ মাছ। এই ব্যালা চিতল তো উই ব্যালা কাতল। হের উপুর গোস্ত, মিষ্টান্ন, পাতক্ষীর। অন্য পোলারা কমলাঘাটের বড় গুঞ্জ থিকা নয়া জোতা কিনা আনল, পিরহান কিনা আনল। টচ (টর্চ) বাত্তি, লুঙ্গি, ফন্টার পেন (ফাউন্টেন পেন), কত জিনিস যে কিনল! অহন ঘরে চাউলও নাই, ট্যাকাও নাই। অহন খালি কপাল থাপড়াই আর পাছা থাপড়াই। হগলই বুদ্ধির দুষ (দোষ)।
অবনীমোহনদের কথা বলতে দেখে আরও অনেকে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। যেমন মোতালে নিকারি, মনা ঘোষ, বৃন্দাবন ভূঁইমালী- এমনি পনের কুড়িজন। তারাও একই কথা বলল। দর চড়তে দেখে অনেকেই ধান-চাল বেচে দিয়ে কাঁচা টাকা দু’হাতে উড়িয়ে দিয়েছে।
মনা ঘোষ বলল, চাউলের কী করন? একখান বুদ্ধি দ্যান দেখি জামাইকত্তা—
অবনীমোহন বললেন, কী বুদ্ধি দেব, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
বৃন্দাবন ভূঁইমালী বলল, সুজনগুঞ্জে চাউল নাই। কাইল একবার মীরকাদিম, বেতকা, আউশইতে (আউটশাহীতে) যামু। দেখি পাওয়া যায় কিনা–
মোতালেফ নিকারি এই সময় বলে উঠল, কুনোখানে চাউল নাই। আমার বইনের জামাই পরশু ঘুইরা আইছে।
তয়?
তয় আর কি, মরণ। একখান কথা শুনছ?
কী?
কাইল গিরিগুঞ্জের বাজারে দুইটা দোকান লুট হইছে।
নিকি?
হ।
জন্ম ইস্তক চাউল লুটের কথা আর শুনি নাই।
প্যাটের জ্বালায় মাইনষের মাথা ঠিক থাকে! লুটপাট তো হপায় (সবে) আরম্ভ হইল। দ্যাখ না, কী কান্ড হয়!
আরেকখান কথা শুনছ?
কী?
ভাটির দ্যাশে চাউল না পাইয়া মাইনষে শাগ-পাতা খাইতে আছে।
কী যে হইব!
কথায় কথায় দুপুর হয়ে গেল। এখন সুর্যটা খাড়া মাথার ওপর উঠে এসেছে। অবনীমোহন কী বলতে যাচ্ছিলেন, সেই সময় বিষহরিতলার ওধারের মাঠ থেকে ঢাকের আওয়াজ ভেসে এল। চমকে বিনু দেখতে পেল, ঢেঁড়াদার হরিন্দ উঁচু প্যাকিং বাক্সের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তার দুই চেলা কাগা বগা সমানে ঢাক বাজিয়ে যাচ্ছে। এস.ডি.ও সাহেব একধারে চেয়ারে বসে আছেন, একটা লোক তাঁর মাথায় ছাতা ধরে দাঁড়িয়ে। চারপাশে অসংখ্য লাল পাগড়ি। নতুনত্বের ভেতর আজ কয়েকজন মিলিটারি অফিসারকে দেখা যাচ্ছে।
বিনু ফিসফিস করে বলল, বাবা মিলিটারি এসেছে।
অবনীমোহন বললেন, হ্যাঁ।
আগে তো মিলিটারি দেখি নি।
তিন চার হাট তুই আসিস নি, তাই জানিস না। আজকাল ফি হাটে মিলিটারি আসছে।
কেন?
যুদ্ধের জন্যে লোক যোগাড় করছে। একে রিক্রুট করা বলে।
