হ্যাঁ, আমার কথায়।
মোচের র্যাখ (রেখা) পড়ে নাই, গলায় টিফি দিলে (টিপলে) মায়ের দুধ উইঠা আসব। ওই বসে (বয়সে) সিগরেট খাও, আবার চোখ লাল কর! র’ ছ্যামরা, তরে মজা দেখাই। বিনুর কানটা ডান হাতে ধরা ছিল, বাঁ হাত দিয়ে ঠাস করে অশোকের গালে এক চড় কষিয়ে দিল মজিদ মিঞা। সঙ্গে সঙ্গে রাস্তায় ঘুরে পড়ল অশোক।
মজিদ মিঞা একাই ছিল না। তার সঙ্গে অন্য একটা লোকও ছিল। অশোক পড়ে যেতেই মজিদ মিঞা সঙ্গীকে বলল, ধর তো ছ্যামরারে, কত বড় বান্দর হইছে একবার দেখি।
মজিদ মিঞার মুখ থেকে কথা খসবার আগেই লোকটা বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে অশোককে ধরে ফেলল। ব্যাপার সুবিধের নয় বুঝে শ্যামল এই সময় ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুট লাগাল।
পেছন থেকে মজিদ মিঞা চেঁচিয়ে বলল, তোমারে আমি চিনি বাসী, তৈলোক্য স্যানের নাতি তুমি। লৌড়াইয়া (দৌড়ে) পলাইবা কই? যাইতে আছি তোমাগো বাড়ি।
এদিকে অশোককে টানতে টানতে সেই লোকটা সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। মজিদ মিঞা তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার দেখে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, কাগো বাড়ির পোলা তুমি?
অশোকের অবস্থা অবর্ণনীয়। এত যে তুখোড় সে, এত চৌকস, চোখে মুখে যার কথার খই ফোটে, একটু আগেও যে রুখে উঠছিল, এখন তার ঠোঁট কাঁপছে, চোখ জলে ভরে গেছে।
মজিদ মিঞা ধমকে উঠল, কী হইল, মুখ দিয়া দেখি রাও (শব্দ) বাইর হয় না!
কাঁদো কাঁদো মুখে অশোক বলল, আর কক্ষনো করব না।
কান্তে (কাঁদতে) আরম্ভ করলা দেখি। গজ্জন তজ্জন গ্যাল কই? কান্দনে আমি ভুলুম না। কুন বাড়ির পোলা আগে কও। না কইলে কিলাম ল্যাঠা আছে।
ভয়ে ভয়ে অশোক এবার বলল, গোঁসাইবাড়ির–
তোমার বাপের নাম কী?
অনন্তকুমার গোস্বামী।
হঠাৎ ভীষণ রেগে উঠল মজিদ মিঞা। অশোকের গালের কাছে হাত নিয়ে এসে চিৎকার করে উঠল, হারামজাদা, বাপেরে সোম্মান দিতে জান না! নামের আগে শিরিযুক্ত বাবু বসাইতে মানে লাগে!
মুখ নামিয়ে চুপ করে রইল অশোক।
মজিদ মিঞা এবার তার সঙ্গীকে বলল, কাশমা, তুই উই ছ্যামরারে গোসাইবাড়ি লইয়া যা। আমি হ্যামকত্তার বাড়ি থিকা আইতে আছি।
কাশমা অর্থাৎ কাশেম অশোককে নিয়ে চলে গেল। আর মজিদ মিঞা বড় রাস্তার ওপর দিয়ে বিনুর কান ধরে টানতে টানতে তাদের বাড়ি নিয়ে গেল। তার এমন ভয়ানক চেহারা আগে আর কখনও দেখেনি বিনু।
হেমনাথ অবনীমোহন স্নেহলতা সুরমা, সবাই বাড়িতেই ছিলেন। মজিদ মিঞা আর বিনুকে এভাবে আসতে দেখে তারা উদ্বিগ্ন মুখে বেরিয়ে এলেন।
হেমনাথ শুধদলেন, কী হয়েছে রে মজিদ?
সংক্ষেপে সব ঘটনা বলে গেল মজিদ মিঞা। শুনতে শুনতে অবনীমোহন সুরমা এবং স্নেহলতার নিশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে এল। অবনীমোহন মাথায় হাত দিয়ে সেখানেই বসে পড়লেন। স্নেহলতা আর সুরমা কিছু বলতে চেষ্টা করলেন, গলা দিয়ে তাদের স্বর বেরুল না। সুধা সুনীতি ফিসফিস করে নিজেদের ভেতর কী বলাবলি করতে লাগল। আর স্তব্ধ মুর্তির মতো একধারে দাঁড়িয়ে রইল ঝিনুক।
হেমনাথ একদৃষ্টে, পলকহীন তাকিয়ে ছিলেন। কথাটা যেন তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। অনেকক্ষণ পর আস্তে করে বললেন, বলিস কী!
হ ঠাউর ভাই। এইর এট্টা বিহিত করেন। মজিদ মিঞা বলতে লাগল, অহনও সোময় আছে। পোলা চৌখের সামনে নষ্ট হইয়া যাইব, এ আমি সইতে পারুম না।
হেমনাথ হঠাৎ যেন খেপে উঠলেন, বিহিতের জন্যে আমার কাছে ধরে এনেছিস কেন, নিজে শাসন করতে পার নি? তুমি ওর কেউ হও না?
অবনীমোহন এই প্রথম কথা বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, আপনি যা ভাল বোঝেন করুন। আমি তো ভাবতেই পারি না, ছেলেটা এত বড় উল্লুক হয়ে উঠেছে!
মজিদ মিঞা আবেগের গলায় বলল, হ, আমারই শাসন করা উচিত আছিল। আমি পরের লাখান কাম করছি। এইবার আপন মাইনষের লাখান কাম করি। বলে উঠোনের এক ধারে একটা খুঁটির সঙ্গে বিনুকে কষে বাঁধল। তারপর কোত্থেকে একটা কাঠের লম্বামতো টুকরো যোগাড় করে এনে সমানে। মারতে লাগল।
একেকটা ঘা পড়ছে আর চামড়া ফেটে ফেটে রক্ত ছুটছে। বিনু আকাশ ফাটিয়ে চেঁচাতে লাগল, আমাকে মেরে ফেলল, আমাকে মেরে ফেলল। আর কক্ষনো ও কাজ করব না।
দেখাদেখি ঝিনুকও কান্না জুড়ে দিল। ফেঁপাতে ফেঁপাতে বলল, বিনুদাকে মেরে ফেললে গো–
স্নেহলতাও ঝিনুকের সঙ্গে সুর ধরলেন, মজিদ, আর ওকে মেরো না।
অবনীমোহন বললেন, মারুন আপনি, মেরে শেষ করে দিন। এরকম ছেলের দরকার নেই আমার।
সুরমাও তা-ই বললেন। হেমনাথ উঠে গিয়ে স্নেহলতা আর ঝিনুককে রান্নাঘরে দিয়ে এলেন।
একসময় মেরে টেরে মজিদ মিঞা চলে গেল।
মারের চোটে কত জায়গায় যে কেটে গেছে। হাত-পায়ের আর কিছু নেই, ফুলে ডুমো ডুমো হয়ে উঠেছে। রক্ত জমাট বেঁধে জায়গায় জায়গায় কালশিটে পড়ে গেছে। ব্যথার তাড়সে সন্ধেবেলায় জ্বর এসে গেল বিনুর। ধুম জ্বর।
জ্বর আসার খানিকক্ষণ পর হাঁড়িভর্তি রসগোল্লা, মোহনবাঁশি কলার ছড়া আর একটা নতুন ফুটবল নিয়ে আবার এল মজিদ মিঞা। বাড়িতে পা দিয়েই বিনুর খোঁজ করল।
হেমনাথ বললেন, ওর জ্বর এসেছে।
জুর! মজিদ মিঞা চমকে উঠল, বিনু কই?
পুবের ঘরে শুয়ে আছে।
পাগলের মতো ছুটে পুবের ঘরে ঢুকল মজিদ মিঞা। তারপর বিনুর মাথার কাছে ফুটবল, মিষ্টির হাঁড়িটাড়ি রেখে, তার সারা গায়ে হাত বুলোতে বুলোতে কাঁদতে লাগল, অয় রে, কী পাষাণ পরান আমার, দুধের শিশুরে মাইরা ফেলাইলাম–
