সিগারেট দিয়ে তুমি কী করবে?
তুমি যদি আমার কথা না শোন, মাসিমাকে-দাদুকে-দিদা, সবাইকে দেখাব।
কী সাঙ্তিক মেয়ে! বিনুর মনে পড়ল, কুমার সঙ্গে কাউফল পাড়তে গিয়ে মাঠের জলে ডুবে গিয়েছিল। সেই কথাটা মাকে বলে দেবে, এই ভয় দেখিয়ে অনেক দিন ঝিনুক তাকে তটস্থ করে রেখেছে, এক মুহূর্তও সুখে থাকতে দেয় নি।
জলে ডোবার ব্যাপারটা মলিন হয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে সিগারেট বেরুল। আর কী আশ্চর্য, তার যত কুকীর্তি, সবই কিনা ঝিনুকের হাতে ধরা পড়ছে। ভাগ্যিস ঝিনুক ধরেছে। অন্য কারোর হাতে পড়লে কী যে হত, ভাবতে সাহস হয় না।
বিনু আর পীড়াপীড়ি করল না। শুধু বলল, সিগারেটগুলো একটু লুকিয়ে রেখো, কেউ যেন দেখে না ফেলে।
সে তোমাকে বলতে হবে না। এমন জায়গায় রেখেছি, কাতোর সাধ্যি নেই খুঁজে পায়।
একটু চুপ করে থেকে বিনু বলল, আমি তা হলে এখন যাই?
আস্তে আস্তে মাথা ঝাঁকাল ঝিনুক, উঁহু–এইভাবে মাথা ঝাঁকানো তার কতকালের অভ্যাস।
না গিয়ে এখন কী করব?
আমার সঙ্গে ক্যারাম খেলবে।
নদীর পাড়ে, ঝাউবনে কি স্টিমারঘাটের ওধারে মিলিটারি ব্যারাকে কোথায় অশোকদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াবে তা নয়। শুধু বাড়িতে বসে থাকো। করুণ গলায় বিনু বলল, ক্যারাম?
হ্যাঁ। নতুন বন্ধু পেয়ে আজকাল বাড়িতেই থাকো না। এখন আমার সঙ্গে খেলতেই হবে।
জলে ডোবার পর এই নতুন এক মারণাস্ত্র পেয়ে গেছে ঝিনুক। নাঃ, মেয়েটার হাত থেকে কোনও দিন মুক্তি নেই।
বিষণ্ণ মুখে ক্যারাম খেলতে বসে গেল বিনু।
.
২.৩৩
ঝিনুকের কাছে ধরা পড়বার পর অশোকদের এড়িয়ে চলতে লাগল বিনু। আজকাল টিফিনের সময় তাদের ফাঁকি দিয়ে স্কুলের পেছন দিকের সোনাল ঝোপে গিয়ে একা বসে থাকে। ছুটি হলেই চোখকান বুজে বাড়ির দিকে ছোটে।
কিন্তু ক’দিন আর। একদিন ছুটির পর চারদিক দেখে ছুটতে যাবে, তার আগেই অশোকরা ধরে ফেলল।
শ্যামল বলল, কি ভাই, আজকাল যে আমাদের সঙ্গে মিশতেই চাও না।
বিনু আবছা গলায় বলল, না, মানে পরীক্ষা এসে গেল। তাই–
চোখের তারা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অশোক বলল, হঠাৎ গুড বয় হয়ে গেলে যে! পরীক্ষা বুঝি আমাদের নেই?
না, মানে—
বার বার মানে মানে কী করছ? এস—
কোথায়?
বা রে, তুমি দেখছি এ ক’দিনে সব ভুলে গেছ! ছুটির পর আমরা যেখানে যাই সেখানেই যাব। স্টিমারঘাটে, টমিদের ব্যারাকে, ঝাউবনে–
তীব্র আকর্ষণ বোধ করছিল বিনু, আবার ভয়ও লাগছিল। শেষ পর্যন্ত ভয়ের দিকটাই ভারী হয়ে দাঁড়াল। বিনু বলল, তোমরাই যাও ভাই, আমার বাড়িতে একটু কাজ আছে।
কোনও কাজ নেই।
জোর করে বিনুকে টানতে টানতে অশোকরা ঝাউবনে নিয়ে গেল। গাছের আড়ালে বসে অশোক পকেট থেকে সিগারেট বার করল।
দেখেই বিনু হাত নেড়ে ভয়ে ভয়ে বলল, আমি কিন্তু ভাই সিগারেট খাব না।
কেন?
ঝিনুকের কাছে যে ধরা পড়ে গেছে তা আর জানায় না বিনু। শুধু বলল, এমনি।
একদৃষ্টে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আঙুলের ডগায় বিনুর থুতনিটা নাড়তে লাগল অশোক। ঠাট্টার গলায় বলল, সিগারেট তো খাবে না, তা হলে কী খাবে? ডুডু? কচি খোকা! বলতে বলতে একটা সিগারেট বিনুর ঠোঁটের ফাঁকে গুঁজে দিয়ে ফস করে দেশলাই ধরাল।
.
কয়েক দিনের জন্য ঝিনুক বিনুকে ফিরিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু অশোকদের টান এত প্রবল, নিষিদ্ধ জিনিসের আকর্ষণ এত তীব্র যে আবার সে ভেসে যেতে লাগল।
অশোকদের সঙ্গে ফের ঘুরতে শুরু করেছে বিনু, আবার লুকিয়ে সিগারেট খাচ্ছে। যুদ্ধ লাগবার পূর্ব বাংলার হৃদয়ের গভীরে লুকানো এই মায়াবী রাজদিয়াকে ঘিরে যে উদভ্রান্ত ঘূর্ণি ঘুরে চলেছে তা যেন হাজার হাতে তাকে টানতে লাগল। বিনুকে ফেরাতে পারে তেমন শক্তি ঝিনুকের ক্ষুদ্র দুর্বল বাহুতে নেই।
অশোকদের পাল্লায় পড়ে সিগারেট টানে বটে, তবে আগের চাইতে অনেক বেশি সাবধান হয়ে গেছে বিনু। বাড়ি ফেরার সময় ভাল করে পেয়ারা পাতা চিবিয়ে নেয়, যাতে মুখে গন্ধ না থাকে। পকেট টকেটগুলো অনেক বার করে দেখে উলটে পালটে।
মোটমুটি এইরকম চলছিল।
হঠাৎ একদিন অঘটন ঘটে গেল। সেদিন আর ঝাউবনে বসে সিগারেট খাচ্ছিল না বিনুরা। সাহস দেখাবার জন্য বড় রাস্তা দিয়ে তিন বন্ধু বুক ফুলিয়ে হাঁটছিল, তাদের ঠোঁটের একধারে সিগারেট ঝুলছে। ভাবখানা এই, কাউকে পরোয়া করি না।
ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে যখন তারা আদালতপাড়ার কাছে এসেছে, সেই সময় বিনু টের পেলে একটা কর্কশ শক্ত হাত কানে সাঁড়াশির মতো চেপে বসেছে।
চমকে পেছনে ফিরতেই বিনু দেখতে পেল–মজিদ মিঞা। মুখ থেকে সব রক্ত যেন নিমেষে নেমে গেল, ঠোঁট থেকে সিগারেট খসে পড়ল। ভয়ে চোখের তারা স্থির, হাত-পা একেবারে জমে গেছে।
মজিদ মিঞাকে চেনে না অশোক। একটি অপরিচিত মুসলমানকে বিনুর কান ধরতে দেখে প্রথমটা হকচকিয়ে গিয়েছিল সে। তার পরেই রুখে উঠল, আপনি ওর কান ধরছেন যে?
মজিদ মিঞা বলল, বেশ করছি।
আপনি কি ওর গার্জেন?
গার্জেন-গুর্জেন উই হগল এংরাজি বুঝি না। অর কানটা যদিন ছিড়াও ফেলাই কেউ কিছু কইব। কানটা তো পেরথমে ছিড়মই। হের পর ভাইবা দেখুম, আর কী করন দরকার– বলে বিনুর কানে প্রচন্ড এক মোচড় দিল মজিদ মিঞা।
অশোক এবার ধমকের গলায় বলল, ভাল চান তো শিগগির ওর কান ছেড়ে দিন।
ছামরা তর কথায় নিকি?
