আচমকা টমিটা চেঁচিয়ে উঠল, ইউ ব্লাডি সোয়াইন—
বিনুরা ভয় পেয়ে গেল।
টমিটা ছুটে এসে অশোকের কলার চেপে ধরে চেঁচাল, ইউ আর স্ট্যান্ডিং–
অমন যে তুখোড় ছেলে অশোক, সেও একেবারে তোতলা হয়ে গেল, ইয়ে-এ-এ-এস স্যার—
ওয়াই?
ফর নাথিং স্যার, ফর নাথিং—
টমি গর্জে উঠল, নো–
মাতালটা ঠিক কী বলতে চায়, বুঝতে না পেরে চুপ করে রইল অশোক। ভয়ে তার হাত-পা কাঁপতে লাগল। চোখের তারা যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসবে।
হঠাৎ টমিটা ধাক্কা দিয়ে অশোককে দশ হাত দূরে সরিয়ে দিল। তারপর সিগারেট কিনে ছড়াতে ছড়াতে বলল, টেক টেক–
এতক্ষণে বোঝা গেল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখলে চলবে না, সবার সঙ্গে কাড়াকাড়ি করে হরির লুটের সিগারেট নিতে হবে। কী আর করা, সিগারেট কুড়োতেই হল।
বিনু আর শ্যামল দাঁড়িয়ে ছিল। টমির ভয়ে তাদেরও সিগারেট কুড়োতে হল। কুড়িয়ে যদি মুক্তি পাওয়া যেত! দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে টমিটা চিৎকার করল, ইউ ব্লাডি স্মোক।
বিনু ভাবল, একদিন আশু দত্ত রুস্তম আর পতিতপাবনের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। এই নদীর পাড়ে স্টিমারঘাটের আশে পাশে এমন কেউ নেই যে তাকে বাঁচাতে পারে।
সিগারেট খাওয়ার কথা ভাবাই যায় না। গলার ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছিল বিনুর। হাতের আঙুলগুলো থরথর করছিল। মনে হচ্ছিল, মাথাটাথা ঘুরে পড়েই যাবে।
টমির আরেকটা হুঙ্কারে সিগারেট ধরিয়ে টান লাগাল বিনু।
.
সেই যে একটা নিষিদ্ধ রাজ্যের দরজা খুলে গিয়েছিল, তারপর থেকে নদীর পাড়ে লুকিয়ে ঝাউবনের ভেতর ঢুকে দুই বন্ধুর সঙ্গে সিগারেট খেতে লাগল বিনু। সিগারেট টমিরাই বেশি যোগাত, মাঝে মাঝে তারা নিজেরাও কিনত।
এ ব্যাপারে ভয় আছে, পাছে কেউ দেখে ফেলে। তবু লুকিয়ে লুকিয়ে নিষিদ্ধ কিছু করার ভেতর বিচিত্র এক উত্তেজনাও রয়েছে। সিগারেট টানতে টানতে বিনুর মনে হতে লাগল, সে যেন আর বাচ্চাদের দলে নেই, সিগারেটের ধোঁয়ায় চড়ে হঠাৎ অনেক বড় হয়ে গেছে।
সিগারেট খেয়ে চোরের মতো বাড়ি ফেরে বিনু। চনমন করে সবাইকে লক্ষ করে, সহজে কারোর কাছে ঘেঁষতে চায় না। তার আশঙ্কা, বুঝিবা তার মুখ থেকে কেউ সিগারেটের গন্ধ পেল।
মোটামুটি এইভাবে চলছিল।
হঠাৎ এক ছুটির দিনের বিকেলবেলা বিনু বেরুচ্ছে, ঝিনুক কাছে এসে দাঁড়াল। বলল, বেড়াতে যাচ্ছ?
শ্যামল আর অশোক স্টিমারঘাটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকবে। বিনু সংক্ষেপে উত্তর দিল, হ্যাঁ– বলেই ব্যস্তভাবে উঠোনে নেমে গেল।
পেছন থেকে ঝিনুক ডাকল, বিনুদা—
বেরুবার মুখে বাধা পড়ায় বিনু বিরক্ত। পেছন ফিরে রুক্ষ গলায় বলল, কী বলছ?
তোমার সঙ্গে কথা আছে।
পরে শুনব।
না, এক্ষুনি।
লম্বা লম্বা পা ফেলে ঝিনুকের কাছে ফিরে এল বিনু। চোখটোখ কুঁচকে বলল, কী বলবে, তাড়াতাড়ি বল–
ঝিনুক হাসল, অত তাড়া কেন? বন্ধুরা বুঝি দাঁড়িয়ে আছে?
শ্যামল আর অশোক যে তার সব সময়ের সঙ্গী, এ কথা জানতে আর কারোর বাকি নেই। বিনু কিছু বলল না, তার চোখ আরও কুঁচকে যেতে লাগল।
ঝিনুক একটু ভেবে বলল, তুমি আজকাল একটা জিনিস খাচ্ছ?
কী?
তুমিই বল না—
বুঝতে পারছি না।
চারদিক ভাল করে দেখে নিয়ে খুব চাপা গলায় ঝিনুক বলল, সিগারেট।
পলকে মুখখানা একেবারে কাগজের মতো সাদা হয়ে গেল। ভাল করে কথা বলতে পারল না বিনু। তোতলাতে তোতলাতে কোনও রকমে বলল, মিথ্যে কথা।
মিথ্যে? বিনুর চোখের দিকে তাকিয়ে, মাথা ঝাঁকিয়ে বলল ঝিনুক।
নিশ্চয়ই–বিনু খুব জোর দিয়ে বলতে চাইল বটে, কিন্তু গলার ভেতর থেকে দুর্বল একটা আওয়াজ বেরুল মাত্র।
তা হলে তোমার পকেট থেকে সিগারেট বেরুল কেমন করে?
আমার পকেট থেকে?
আজ্ঞে হ্যাঁ, মশাই।
বিনু কিছু বলতে চেষ্টা করল, পারল না। তার বুকের ভেতরটা ঢাকের আওয়াজের মতো গুর গুর করতে লাগল।
ঝিনুক আবার বলল, ধোপাবাড়ি পাঠাবার জন্যে মাসিমা আমাকে তোমার ময়লা জামা আনতে বলেছিল। পকেট টকেটগুলো দেখে নিচ্ছিলাম, যদি পয়সাকড়ি কিছু থাকে। পয়সার বদলে ও মা, একেবারে সাপ বেরিয়ে পড়ল–
বিনুর এবার মনে পড়ে গেল, সেদিন টমিদের কাছ থেকে থেকে অনেকগুলো সিগারেট যোগাড় করেছিল। ঝাউবনে বসে কয়েকটা টেনেছিল, ক’টা রেখেছিল পকেটে। ভেবেছিল, পরে ফেলে দেবে। অসাবধানে ফেলে দিতে ভুলে গেছে।
শ্বাস আটকে আসছিল বিনুর। নাকের ডগাটা ঝি ঝি করছিল। সমস্ত শরীর যেন অসাড় হয়ে আসছে। কোনও রকমে সে বলতে পারল, মাকে সিগারেট দেখিয়েছ নাকি?
আস্তে আস্তে মাথা হেলিয়ে দিল ঝিনুক, হুঁ—
বিনুর হৃৎপিন্ডটা লাফ দিয়ে গলার কাছে উঠে এল যেন, সত্যি?
একদৃষ্টে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল ঝিনুক। তারপর মাথাটা ধীরে ধীরে দু’ধারে নাড়ল। অর্থাৎ বলে নি।
সত্যি বলছ?
হুঁ—
আমাকে ছুঁয়ে বল।
বিনুর গায়ে আঙুল ঠেকিয়ে বলল, হল তো?
এতক্ষণে সহজভাবে শ্বাস টানতে পারল বিনু। একটু হেসে বলল, বাঁচালে।
এই প্রথম, এই শেষ। এর পর খেলে আর বাঁচাব না। ঠিক মাসিমাকে বলে দেব।
আর খাবই না।
শ্যামলদা আর অশোকদার সঙ্গে মিশে মিশে তুমি খারাপ ছেলে হয়ে যাচ্ছ।
বিনু এ কথার উত্তর না দিয়ে বলল, সিগারেটগুলো কোথায়?
ঝিনুক বলল, আমার কাছে।
বিনু মুখ কাঁচুমাচু করে অনুনয়ের গলায় বলল, আমাকে দিয়ে দাও না—
ঝিনুক বলল, উঁহু—
দাও না, দাও না—
না। ওগুলো আমার কাছে থাকবে।
