অশোক বলল, ইয়েস—
ব্লাডি আঠা তো তুলতে পারছি না।
অশোক চৌকস ছেলে। বিনুদের দিকে তাকিয়ে বলল, শালাদের ট্যাক থেকে কিছু খসাচ্ছি। তারপর থেমে থেমে, ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে টমিদের উদ্দেশে বলল, আঠা তুলে দিতে পারি, পাঁচ টাকা লাগবে।
ও, ইয়েস– হিপ পকেট থেকে এক মুঠো রেজগি আর নোট বার করে একটা টমি অশোকের হাতে দিল, গুনল না পর্যন্ত।
অবশ্য গুনল–প্রায় সাত টাকার মতো। টাকাটা পেয়েই সে বিনুকে বলল, তোমাদের বাড়ি তো কাছে। শিশিতে করে সরষের তেল নিয়ে এস। একটু বেশি করেই এনো।
সরষের তেল এলে তিন বন্ধু ডলে ডলে টমিদের হাত আর মুখ থেকে কাঁঠালের আঠা তুলে ফেলল।
টমি দুটো বেজায় খুশি। মাথা নেড়ে বলল, থ্যাঙ্ক ইউ, থ্যাঙ্ক ইউ, কাম অন– বলে তিনজনের হাত ধরে কঁকিয়ে কঁকিয়ে কাঁধের জোড় প্রায় আলগা করে ফেলল।
উচ্ছ্বাস খানিকটা স্তিমিত হলে টমি দু’টো বলল, সিট ডাউন। এস, তোমাদের সঙ্গে গল্প করি।
বিনুরা বসল।
দুই টমি জড়ানো জড়ানো উচ্চারণে কত কথা যে বলতে লাগল। ক্লাস নাইনের ইংরেজি বিদ্যেয় তার সামান্যই বুঝতে পারল বিন, বেশিটা দুর্বোধ্য থেকে গেল। অশোক অবশ্য টমিদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সমানে ইয়েস’ নো’ করে যেতে লাগল। তবে একটা কথা জানা গেল, রাজদিয়া আসার আগে টমি দু’টো কলকাতায় ছিল।
অনেকক্ষণ গল্পটল্প করার পর একটা টমি হঠাৎ বলে উঠল, হেঃ গায়—
অশোক জিজ্ঞাসু চোখ তাকাল, ইয়েস–
একটি চোখ কুঁচকে আরেকটা চোখ ইঙ্গিতপূর্ণ করে চাপা গলায় টমিটা বলল, বিবি হাউস মালুম? কলকাতায় থাকার ফলস্বরূপ দু’চারটি হিন্দি শব্দও তারা শিখে এসেছে।
একটু ভেবে অশোক বলল ইয়েস—
ইউ গুড গায়। আমাদের নিয়ে চল—
টেন রুপিজ–অশোক বলল। অর্থাৎ দশটি টাকা দিলে, তবেই বিবি হাউসের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়ে আসবে।
ইয়া ইয়া–হিপ পকেট থেকে আবার এক মুঠো নোট টোট বার করে অশোককে দিল টমিটা।
বিবি হাউসে’র ব্যাপারে টমি দু’টোর প্রচন্ড উৎসাহ। টাকা দিয়েই লাফ দিয়ে উঠে পড়েছে তারা এবং অশোকের হাত ধরে টানাটানি শুরু করেছে।
অগত্যা অশোকদের উঠতেই হল। এই সময় বিনু অশোকের কানে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, বিবি হাউস কী?
অবাক চোখে একটুক্ষণ তাকিয়ে থেকে অশোক বলল, জানো না!
না। বিনু বিমূঢ়ের মতো মাথা নাড়ল।
অশোক বলল, পরে বলব। তারপর আঙুল কামড়াতে কামড়াতে গলাটা নামিয়ে দিল, বিবি হাউস’-এর নাম করে তো দশ টাকা আদায় করলাম। এখন ব্যাটাদের কোথায় নিয়ে যাই? পরক্ষণে কী মনে পড়তে তার চোখের তারা নেচে উঠল, হয়েছে–
বিনু শুধলো, কী?
ব্যাটাদের এক জায়গায় নিয়ে যাব।
কোথায়? চলই না। গেলে বুঝতে পারবে।
অশোক টমিদের নিয়ে দক্ষিণ দিকের রাস্তা ধরল।
পুলের তলায় জনতা এখনও দাঁড়িয়ে আছে। মাঝবয়সী সেই মুসলমানটি ভিড়ের ভেতর থেকে বলে উঠল, বাবু কাঠলের আঠা তোলনের লেইগা কত নিলেন?
অশোক বলল, সাত টাকা।
তাইলে এক কাঠল খাইতে এগার ট্যাকা লাইগা গেল!
উত্তর না দিয়ে অশোক হাসল।
লোকটা আবার শুধলো, সৈন্য দুইটা আরও ট্যাকা দিল না আপনেরে?
দ্বিতীয় বার টাকা দেওয়াও সে তা হলে লক্ষ করেছে। ব্যাপারটা স্বীকার করতেই হল অশোককে।
মধ্যবয়সী বলল, এই টাকাটা পাইলেন কোন খাতে?
খানিক চিন্তা করে অশোক বলল, সে তোমাকে পরে বলব।
অহন ওগো নিয়া চললেন কই?
শ্বশুরবাড়ি দেখাতে।
দক্ষিণ দিকে খানিকটা যাবার পর অশোকরা পুবে ঘুরল। তারপর কোনাকুনি কিছুক্ষণ হেঁটে বাংলো মতো একটা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। বাইরে থেকেই অশোক বলল, যাও, ভেতরে যাও– বলেই পেছন ফিরে বিনুদের নিয়ে দৌড়। মুহূর্তে এর রান্নাঘর, ওর বাগান, তার চেঁকিঘরের ওপর দিয়ে উধাও হয়ে গেল।
বিনুরা থামল একেবারে তাদের পুকুরপাড়ে এসে। ঘাটে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে তিনজন অনেকক্ষণ হাঁপাল।
তারপর বিনু বলল, যেখানে টমি দু’টোকে দিয়ে এলে, ওটা তো পুলিশের বড়সাহেব মিস্টার রজার্সের বাড়ি–
যেন বিরাট এক কীর্তি করেছে, ভুরু নাচিয়ে নাচিয়ে কায়দা করে কিছুক্ষণ হাসল অশোক। তারপর বলল, ইচ্ছে করেই তো দিয়ে এলাম। একটু পর খোঁজ নিলে জানতে পারবে বাছাধনদের হাড় মাংস আলাদা করে রজার্স সাহেব মিলিটারি পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে। উল্লুকরা বাংলা দেশে এসে ‘বিবি হাউস’ খুঁজছে!,
চকিতে সে কথাটা মনে পড়ে গেল বিনুর। বলল, ‘বিবি হাউস’ মানে কী, বললে না তো?
কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে কী বলল অশোক। শুনতে শুনতে নাকমুখ ঝাঁ ঝাঁ করতে লাগল বিনুর, মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।
কলকাতা থেকে জ্ঞানবৃক্ষের অনেক ফল নিয়ে এসেছে অশোক। একটা একটা করে বিনুকে খাওয়াতে শুরু করেছে সে।
.
২.৩২
দিনকয়েক পরের কথা।
বিকেলবেলা স্কুল থেকে ফিরছিল বিনুরা। স্টিমারঘাটের সামনে আসতেই চোখে পড়ল, একটা পান-বিড়ি-সিগারেটের দোকানে ভিড় জমেছে।
কৌতূহলের বশে বড় বড় পা ফেলে কাছে আসতেই বিনুরা দেখতে পেল, একটা টমি একের পর এক সিগারেটের প্যাকেট কিনছে, তারপর সেগুলো খুলে হরিলুটের মতো ছড়িয়ে দিচ্ছে।
চারপাশের মানুষগুলো যেন চোখমুখ শানিয়ে দাঁড়িয়ে আছে; সিগারেট ছড়ালেই ঝাঁপিয়ে পড়ছে।
বিনুরা একপাশে দাঁড়িয়ে মজা দেখতে লাগল।
হঠাৎ টমিটার চোখ বোঁ করে ঘুরে এসে পড়ল বিনুদের ওপর। দেখেই বোঝা গেল, মদে চুর হয়ে আছে সে। তারই মধ্যে হিপ পকেট থেকে চ্যাপটা বোতল বার করে মাঝে মাঝে গলায় ঢালছে।
