একটা টমি উৎসাহ দেবার ভঙ্গিতে চেঁচাতে লাগল, গো অন ফাইটিং, ইউ ডগস, স্ন্যাচ ম্যাচ বাইট দ্যাট সোয়াইন–পুশু দ্যাট বাস্টার্ড–
আরেকটা টমি দাঁতমুখ খিঁচিয়ে চিৎকার করে উঠল, ব্লডি ইন্ডিয়ানস–বেগারস, সন্স অফ বিচ–
বাকি টমিগুলো কিছুই বলল না, ক্যামেরা বার করে টকাটক ছবি তুলতে লাগল।
কাড়াকাড়ি করে অনেকগুলো চকোলেট কুড়িয়েছে অশোক। সেগুলো নিয়ে বিনুদের কাছে এসে বলল, আচ্ছা ছেলে তো তোমরা, চুপচাপ হাঁদার মতো দাঁড়িয়ে রইলে! তোমরা কুড়োলে আরও কত চকোলেট পাওয়া যেত।
বিনু হঠাৎ বলে ফেলল, টমিরা কী বলছিল জানো?
কী?
ব্লাডি বেগারস, ডগস, সোয়াইনস–এমনি আরও কত কি। এ সব শুনবার পরও ওদের জিনিস কুড়োতে যাব!
অশোক গ্রাহ্য করল না। গা থেকে গালাগালগুলো ঝেড়ে ফেলে বলল, বলুক গে। গায়ে তো। আর ফোস্কা পড়ছে না। ওদের চকোলেট খেয়ে দেখ, জীবনে এমন জিনিস আর কখনও খাও নি। খাস আমেরিকায় তৈরি। শুধু টমিদের জন্যে জাহাজে করে আসে। বলে একটা বড় চকোলেট এগিয়ে। দিল।
বিনু কিন্তু নিল না।
মিলিটারি ব্যারাকে সেই একদিনই গেল না বিনুরা। অশোক প্রায় রোজই তাদের ধরে নিয়ে যেতে লাগল।
টমিরা তারকাঁটার বেড়ার ওধারে দাঁড়িয়ে রোজ শুধু চকোলেট ছোড়ে না, এক-আধদিন বিস্কুটের টিন, ড্রাই ফুড়ের টিনও ছোড়ে। মাঝে মাঝে মুঠো মুঠো রেজগিও ছুঁড়ে দেয়। পয়সা যেদিন ছড়ায়, মারামারিটা সেদিন সাঙ্ঘাতিক রকমের ঘটে যায়।
প্রথম প্রথম বিনু ওদের কোনও জিনিসই ছুঁত না। অশোকের দেখাদেখি কবে থেকে যে সে কাড়াকাড়ি করতে শুরু করেছে, নিজেই জানে না।
২.৩১-৩৫ আমেরিকান টমি
২.৩১
আমেরিকান টমিদের পেছন পেছন ঘুরে বেড়ানোটা আজকাল বিনুদের নেশায় দাঁড়িয়ে গেছে। টমিদের খোঁজে এখন আর ব্যারাক পর্যন্ত যেতে হয় না। রাজদিয়ার রাস্তায়, স্টিমারঘাটে, নদীর পাড়ে ঝাউবনের দিকটায় সবসময় টমিগুলো টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে।
একদিন বিনুরা দেখতে গেল, তাদের বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে সেই কাঠের পুলটার ওপর দুই টমি একটা প্রকান্ড পাকা কাঁঠাল নিয়ে বসে আছে। খানিকটা দূরে মুসলমান চাষীদের এক জনতা উদগ্রীব দাঁড়িয়ে। মাঝে মাঝে টমি দু’টোকে দেখিয়ে ফিসফিস গলায় নিজেদের ভেতর কী বলাবলি করছে।
বিনুরা প্রথমে চাষীদের কাছে গেল। শ্যামল শুধলল, কী ব্যাপার? কী হয়েছে?
একটি জোয়ান চাষী জনতার ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে বলল, সাহেবগো কাছে আমরা একখান কাঠল (কাঁঠাল) বেচছি। কত দাম নিছি জানেন?
কত?
চাইর ট্যাকা।
তাই নাকি!
হ। কাঠলটার দাম বড় জোর আষ্ট আনা। নগদ সাড়ে তিনি ট্যাকা লাভ করলাম। একটা কাঠালে সাড়ে তিন টাকা লাভ করা দ্বিগ্বিজয়ের সমান। গর্বে ছোকরার বুক ফুলে উঠছিল।
আরেকটি মধ্যবয়সী চাষী বলল, শালারা যে কই থিকা (কোত্থেকে) আসছে! যা দাম চাই হেই দিয়া দ্যায়। ট্যাকা-পহার উপুর দয়ামায়া নাই। একখান কাঠল বেইচা চাইর ট্যাকা পাওন যায় বাপের জম্মে অ্যামন কথা শুনি নাই।
আরেক জন বলল, যা দ্যাখে শালারা হেই কিনে (তাই কেনে)। হেই দিন আমি তো আড়াই ট্যাকায় একখান কুমড়া বেচছিলাম।
তারপর দেখা গেল, শুধু কুমড়োই না, অবিশ্বাস্য অকল্পনীয় দামে আরও অনেক অনেক কিছু টমিদের কাছে বিক্রি করেছে।
অশোক এই সময় বলে উঠল, কাঁঠাল তো বেচ্ছে, আবার দাঁড়িয়ে রয়েছ কেন?
সেই জোয়ান চাষীটি বলল, সাহেবরা আমাগো কী জানি কইতে আছে, বুঝতে পারতে আছি না।
মধ্যবয়সীটি বলল, অ্যামন তরাতরি এংরাজি কয় য্যান ছাগলে নাইদা (নেদে) যায়। কার সাইদ্য বোঝে! ভাবখানা এই, তাড়াতাড়ি না বলে ধীরে সুস্থে বললে সে ইংরেজি ভাষাটা অক্লেশে বুঝে ফেলত।
অশোক কী বলতে যাচ্ছিল, সেই সময় টমি দুটো ডাকল, ইউ গায়—
বিনুরা ফিরে তাকাতে টমিরা হাতের ইশারায় ডাকল।
টমিদের সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে ঘুরে সাহস বেড়ে গিয়েছিল। এখন আর তাদের ভয় পায় না বিনুরা। অশোক বলল, চল, ব্যাটারা কী বলছে শুনে আসি।
বিনু শ্যামল আর অশোক, তিনজনে পায়ে পায়ে পুলটার ওপর গিয়ে উঠল। উৎসুক জনতা পেছনে দাঁড়িয়ে থাকল।
একটা টমি শুধোলে, নো ইংলিশ? অর্থাৎ অশোকরা ইংরেজি জানে কি না, সেটাই তার জিজ্ঞাস্য।
অশোক বলল, ইয়েস।
কাঁঠালটা দেখিয়ে এবার টমিটা বলল, উয়াটস দিস?
প্রথমে খুব চাপা গলায় অশোক বাংলায় বলে নিল, ব্যাটারা কী কিনেছে তাই জানে না। তারপর ইংরেজিতে বলল, ফুট।
খায়?
নিশ্চয়ই।
কেমন করে খেতে হয়? বলে দূরের জনতাকে দেখিয়ে টমিরা বলল, ব্লাডিগুলোকে জিজ্ঞেস করছি, কিছু বলছে না।
অশোক বলল, ওরা ইংরেজি জানে না, তাই তোমাদের কথা বুঝতে পারে নি।
দ্যাট মে বি–
এবার কাঁঠালটা ভেঙে খাওয়ার কায়দা দেখিয়ে দিল অশোক। একটা করে কোয়া মুখে পুরতে যেই স্বাদটা টের পাওয়া গেল আর যাবে কোথায়। দুই টমি চার হাতে কোয়া খুলে টপাটপ খেতে লাগল। খাওয়াটা সত্যিই দর্শনীয়। নিশ্বাস ফেলার যেন সময় নেই। বিচিসুদ্ধ কোয়াগুলো মুখ পুরে চিবোতে চিবোতে বিচিগুলো গালের পাশ দিয়ে বার করে দিচ্ছে।
দেখতে দেখতে কাঁঠালটা শেষ হয়ে গেল। পড়ে রইল মাঝখানের মোটা ভুতি আর কর্কশ কাটাওলা ছালটা।
খাওয়া তো হল। তারপরেই দেখা গেল আরেক সমস্যা। কাঁঠালের আঠায় হাত-মুখ, গাল-গলা, নাক, ভুরু, এমনকি জামা পর্যন্ত মাখামাখি হয়ে গেছে। টমিরা যতই ঘষে ঘষে তুলতে চাইছে ততই আঠা লেপটে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত বিরক্ত, বিব্রত হয়ে আবার অশোকের শরণ নিল তারা, এ গায়–
