আগে জামাকাপড় পোশাকটোশাকের দিকে নজর থাকত না বিনুর। ছেঁড়া হোক, ময়লা হোক একটা কিছু পরতে পেলেই হত। জুতো পায়ে দেবার বিশেষ বালাই ছিল না। এ সব ব্যপারে একেবারেই উদাসীন ছিল।
অশোক আসার পর সাজটাজের দিকে মন গেছে বিনুর। আজকাল আর ময়লা জামাপ্যান্ট পরতে চায় না। পোশাকটি ধবধবে হওয়া চাই, তাতে কড়া ইস্তিরি থাকা চাই। জুতোটা চকচকে ঝকমকে না হলে আজকাল আর চলে না।
প্রায় কান্নাকাটি করেই একটা ধুতি কিনেছে বিনু। কলারও হাতাহীন পাঞ্জাবি বানিয়েছে। অশোকের মতো কায়দা করে ফেরত দিয়ে আজকাল ধুতি পরে সে। বাড়িতে অবশ্য করে না, রাস্তায় বেরুলেই জামার কলার উলটে দেয়। চটিটা সামনের দিকে ছুঁড়তে ছুঁড়তে হাঁটে।
এ তো গেল পোশাকের কথা। তা ছাড়া, অশোককে আরও নানা দিক থেকে নকল করছে বিন্দু। তার মতো স্টাইল করে চুল আঁচড়ায়, সরু করে শিস দেওয়া প্র্যাকটিশ করে। আর গান তো আছেই। দিনরাত গুন গুন করেই যাচ্ছে সে :
শত জনমের কামনা বাহিয়া।
রূপ ধরে আজ এসেছ কি প্রিয়া?
যত ভালবাসা তত যদি আশা—
বিনুর হঠাৎ পরিবর্তনটা সুধা সুনীতির চোখেও পড়েছে। এত দ্রুত বদলে গেলে না পড়ে উপায় কী। সুনীতি গালে হাত দিয়ে ঘাড় বাঁকিয়ে বলে, ও বাবা, দিন দিন ছেলে কেমন স্টাইল শিখছে দেখ না!
সুধা ঝঙ্কার দিয়ে বলে, ছোঁড়া একেবারে ঝুনো হয়ে উঠেছে। ওই গোঁসাইবাড়ির অশোকটা আসার পরই পাকামো শুরু হয়েছে। হা রে বিনু, লুকিয়ে লুকিয়ে বিড়ি টিড়ি খাচ্ছিস নাকি?
সুধার কথা শেষ হবার আগেই লঙ্কাকান্ড বেধে যায়। বিনু তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঝিনুক অবশ্য অন্য কথা বলে, তুমি অমন গুন গুন কর কেন বিনুদা? গলা ছেড়ে গাইতে পার না? কী সুন্দর গলা তোমার!
যত জ্ঞানের জাহাজ হয়েই আসুক, তার তো শেষ আছে। একদিন সিনেমার গান আর গল্পের ঝুলি ফুরিয়ে গেল অশোকের। ফুরোবার পর আবার নতুন করে সেগুলো শোনাল সে। তারপর আবার, এবং আরও অনেক বার।
শুনতে শুনতে সব গান মুখস্থ হয়ে গেছে বিনুর। যত রোমাঞ্চকর আর যত চমকপ্রদই হোক না, একই গল্প কত বার শুনতে ভাল লাগে! আজকাল যখন অশোক চিত্রতারকার গল্প নিয়ে বসে, বিনু বা শ্যামল ততটা আগ্রহ নিয়ে শোনে না।
ভক্তদের বিস্ময় আর মুগ্ধতা যে কমে আসছে তা লক্ষ করে একদিন অশোক বলল, চল, মিলিটারিদের ব্যারাক থেকে ঘুরে আসি।
মিলিটারির কথায় ভয় পেয়ে গেল বিনু। বলল, না না, ওখানে গিয়ে দরকার নেই। নদীর পাড়ে ব্যারাকগুলো যখন তৈরি হচ্ছিল তখন খুব যেত বিনু। নিগ্রো আর আমেরিকান টমিরা ওখানে আসার পর আর যায় না।
অশোক বলল, যাবে না কেন?
ওরা যদি ধরে রেখে দেয়?
ভীতু কোথাকার! আমরা কলকাতায় কত মিলিটারির সঙ্গে মিশেছি। কই আমাদের তো ধরত।
বিনু বলল, কলকাতায় এখন বুঝি খুব মিলিটারি!
অশোক মাথা নাড়ল, মিলিটারি ছাড়া কলকাতায় এখন আর কিছু নেই। রাস্তায় রাস্তায় মিলিটারি ট্রাক আর জিপ। লালমুখো আমেরিকান টমি আর নিগ্রো সোলজার। লেকের দিকে কখনও গেছ?
অনেক বার।
সেখানে এখন মিলিটারিদের ছাউনি পড়েছে। ওদিকে যেতে কেউ সাহস পায় না। কিন্তু বন্ধুদের নিয়ে আমি ঠিক চলে যেতাম–বলে সগর্বে তাকাল অশোক।
বিনু আর শ্যামল অবাক হয়ে গেল।
অশোক আবার বলল, শুধু যেতামই না, ওদের সঙ্গে ভাব জমিয়ে চকোলেট, টফি, ড্রাই ফুড, টিনের মাছকত কী আদায় করতাম।
বিনুরা সবিস্ময়ে ফিসফিসিয়ে বলল, তাই নাকি!
অশোক বলল, এই হুঁ হুঁ–তারপর হঠাৎ কী মনে পড়তে তাড়াতাড়ি আবার বলে উঠল, ধরে রাখার কথা বললে না তখন
হ্যাঁ।
ধরে তোমাকে ঠিকই রাখবে। যদি—
যদি কী?
তুমি মেয়ে হতে।
মেয়ে হলে ধরে রাখবে কেন?
ঠোঁট টিপে চোখ কুঁচকে কিছুক্ষণ বিনুকে দেখল অশোক। তারপর কানের কাছে মুখ এনে ফিস ফিস করে কী বলল।
সঙ্গে সঙ্গে মুখ লাল হয়ে উঠল বিনুর, কান ঝা ঝা করতে লাগল।
হাসতে হাসতে অশোক বলল, তুমি একটা ভোদা। তোমাকে মানুষ করতে অনেক সময় লাগবে। বলে একরকম টানতে টানতে মিলিটারি ব্যারাকের দিকে নিয়ে গেল।
.
ব্যারাকের সীমানা তারকাঁটা দিয়ে ঘেরা। কয়েক মাইল জুড়ে এই সীমানা। অবশ্য মাঝে মাঝে কাঠের গেট রয়েছে। সেখানে মিলিটারি পুলিশ রাইফেল কাঁধে পাহারা দিচ্ছে।
বিনুরা যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছল, প্রথম গেটটা থেকে কিছু দূরে তারকাটার ওপর একটা করে পা রেখে পাঁচ ছটা লালমুখো টমি দাঁড়িয়ে আছে। সীমানার বাইরে একদল আধ-ন্যাংটো, কালো ক্ষুধার্ত মানুষ জড়ো হয়েছে। তাদের লুব্ধ, করুণ চোখ টমিগুলোর দিকে। মনে হয়, ওরা প্রায়ই এখানে আসে। টমিগুলোর সঙ্গে তাদের পরিচয় আছে।
অশোক বিনুদের নিয়ে বাইরে জনতার কাছে এসে দাঁড়াল। তারপর বলল, এখানে দেখছি অনেক খদ্দের। এই কালো কালো জানোয়ারগুলো এসে জুটেছে। কলকাতায় আমরা দু চারজন মোটে যেতাম। বলেই টমিদের দিকে ফিরে বলল, হ্যালো জো—
টমিরা ভুরু বাঁকিয়ে তাকাল, কিছু বলল না।
অশোক আবার বলল, ইউ আর ভেরি কাইন্ড। প্লিজ গিভ আস চকোলেট, টফি। হ্যালো জো–
টমিরা নিজেদের ভেতর কী বলাবলি করল না। তারপর পকেট থেকে মুঠো মুঠো চকোলেট আর টফি বার করে ছুঁড়তে লাগল। নিমেষে বাইরে জনতার ভেতর চিৎকার চেঁচামেচি মারামারি কাড়াকাড়ি শুরু হয়ে গেল। অশোকও তার মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বিনু আর শ্যামল অবশ্য দাঁড়িয়ে রইল।
