এই জলের দেশে যেখানে অঢেল মাছ, সেখানেও এরকম পাবদা দুর্লভ। মাছগুলোর লালচে রুপোলি শরীর এত চকচকে যে মনে হয় পালিশ করা।
অবনীমোহন বললেন, ককুড়ি পাবদা আছে গয়জদ্দি?
গয়জদ্দি বলল, তিন কুড়ি।
দাম কত নেবে?
পাবদাগুলা আপনেরে দিমু না জামাইকত্তা—
কেন?
গয়জদ্দি বলল, উইগুলার অন্য গাহেক (খদ্দের) আছে।
হঠাৎ একটা কথা মনে পড়তে কৌতুকের গলায় অবনীমোহন বললেন, ড্যাঞ্চিবাবুরা নাকি?
গয়জদ্দি একগাল হাসল, হ। ড্যাঞ্চিবাবুরা একেবারেই মূলায় (দরদাম করে) না। যা কই হেই দিয়া যায়। এই সুযুগে দুইখান পহা কইরা লই।
অবনীমোহন বললেন, পাবদা না দাও, কালবোসটা দাও।
কালিভাউসটাও ড্যাঞ্চিবাবুগো লেইগা রাখছি।
অগত্যা ডুলা বোঝাই করে কাজলি মাছই কিনলেন অবনীমোহন।
এখন সুজনগঞ্জের হাটে ‘ড্যাঞ্চি’ বাবুদেরই জয়জয়কার।
.
২.৩০
বোমার ভয়ে কলকাতা থেকে যারা পালিয়ে এসেছে তাদের ছেলেমেয়েরা রাজদিয়ার স্কুল-কলেজে ভর্তি হতে লাগল।
বিনুর ক্লাসেও দশ-বারটা ছেলে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে সব চাইতে চমকদার হল গোঁসাই বাড়ির অশোক। প্রথম দিন স্কুলে এসেই সে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিল। বিনু আর শ্যামল তো রীতিমতো তার ভক্তই হয়ে দাঁড়িয়েছে। হবার মতো যথেষ্ট কারণও রয়েছে।
অশোক স্কুলে আসে সাইকেলে করে। ঝকঝকে নতুন সাইকেল তার। স্কুলের সামনের মাঠটায় বোঁ করে একটা পাক দিয়ে সাইকেলটা যখন সে থামায় সেই বিস্ময়কর দৃশ্যের দিকে অন্য ছেলেরা হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। এত সুন্দর সাইকেল সারা রাজদিয়াতে আর কারোর নেই।
সাইকেলের নানারকম খেলাও জানে অশোক। একটু আগে স্কুলে এসে সে সবও দেখায় সে। হ্যান্ডেল না ধরে অশোক সাইকেল চালাতে পারে। চলন্ত অবস্থায় সিটে বসে জামাকাপড় পরতে পারে।
বিনু আর শ্যামলের চাইতে অশোক বেশ বড়। অন্তত দু’তিন বছরের তো বটেই। ফেরতা দিয়ে কাপড় পরে সে, লম্বা জুলপি রাখে। ঘাড়ের ওপর জামার কলারটা সবসময় খাড়া হয়ে থাকে। বুকের কাছে একটা মোটে বোতাম আটকানো, বাকি দু’টো খোলা। ফলে ভেতরের গেঞ্জি দেখা যায়। ছোকরার ঠোঁটের ওপর সরু শৌখিন গোঁফ। যখন কায়দা করে হাঁটে, পায়ের চটি দু’ফুট আগে আগে চলে। কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে চমৎকার শিস দিতে পারে সে।
একেক দিন একেক রকম করে চুল আঁচড়ে আসে অশোক। একদিন হয়তো ব্যাকব্রাশ করে এল, একদিন এল অ্যালবার্ট কেটে, কিংবা চুলে ঢেউ খেলিয়ে।
কোনও দিন এসে অশোক বলে, কার মতো চুল আঁচড়েছি বল তো?
সারা ক্লাস চারদিক থেকে সাগ্রহে, সমস্বরে শুধোয়, কার মতো?
রবীন বিশ্বাসের।
বিনু ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে, রবীন বিশ্বাস কে ভাই?
রবীন বিশ্বাসের কথা জানে না, এমন ছেলে হয়তো এই প্রথম দেখল অশোক। অবাক বিস্ময়ে সে বিনুর দিকে তাকিয়ে থাকে। বলে, রবীন বিশ্বাসকে চেনো না!
রবীন বিশ্বাসকে না চেনার লজ্জায় মাথা আপনা থেকেই নুয়ে পড়ে বিনুর।
অশোক আবার বলে, স্টাইল যদি শিখতে হয় রবীন বিশ্বাসের সিনেমা দেখতেই হবে।
বিনু এতক্ষণে বুঝতে পারে, রবীন বিশ্বাস একজন ফিল্মস্টার।
কোনও দিন এসে অশোক বলে, আজ ছবি মজুমদারের স্টাইলে চুল আঁচড়েছি।
কোনও দিন বলে, আজ জহর ব্যানার্জির মতো আঁচড়েছি।
জামাও অশোক একরকম পরে না। বেশির ভাগ দিনই কলারওলা অথবা হাতাহীন পাঞ্জাবি পরে আসে। বলে, কী একটা বইয়ে মনে পড়ছে না, অমলেশ বড়ুয়া এইরকম জামা পরেছিল।
ছোটদি আর বড়দির মুখে অমলেশ বড়ুয়ার নাম শুনেছে বিনু। কাজেই তার সম্বন্ধে আর জিজ্ঞেস করে না।
কিন্তু এ সব অতি সামান্য ব্যাপার। ছেলেদের নিশ্বাস বন্ধ করে দেবার মতো আরও অনেক কিছু জানে অশোক। হেন সিনেমা নেই যা সে দেখেনি। শুধু সিনেমা দেখাই নাকি, ছায়ালোকের তাবৎ কিন্নর-কিন্নরীকেও সে চেনে। অশোক বলে, স্টার চিত্রতারকা। কলকাতায় থাকতে সে নাকি তাদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াত। সে লীলারানীকে দেখেছে, কনকবালাকে দেখেছে, ছবি মজুমদারকে দেখেছে। জহর ব্যানার্জি, অমলেশ বড়ুয়া, মহীন্দ্র গাঙ্গুলি, কাকে না চেনে সে? কাকে না দেখেছে?
ক্লাসে, ক্লাসের বাইরে সারক্ষণ সিনেমার নানা গল্প করে যায় অশোক। ফাঁকে ফাঁকে গান। কত গানই না সে জানে।
এসো যৌবন,
এসো যৌবনমত্তা ওগো।
মধুমাস এলো কি–
সাগরের কল্লোল শুনি তব বক্ষে
বিজলির ঝিলিমিলি আনিয়াছ চক্ষে।
কিংবা
তাহারে যে জড়াতে চায় দুটি বাহুলতা–
কে শুনেছে মোর কামনার নীরব ব্যাকুলতা।
কিংবা
আমার ভুবনে এল বসন্ত তোমারই তরে।
আঁখি দুটি তব রাখ, রাখ মোর আঁখির পরে।
ছায়ালোকের অজস্র জ্ঞানে বোঝাই হয়ে যে এসেছে তার ভক্ত না হওয়াটাই তো আশ্চর্যের।
ক্লাসের সব ছেলেই অশোকের ভক্ত, তবু তাদের মধ্যে বিনু আর শ্যামলের তুলনা হয় না। অশোকের দিকে সর্বক্ষণ তারা মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে। অশোক যা বলে অভিভূতের মতো শুনে যায়। একই কথা বার বার শুনেও ক্লান্তি নেই। অশোককে একবার পেলে তার সঙ্গ ছাড়তে চায় না। গুড়ের গায়ে মাছির মতো বিনু আর শ্যামল তার গায়ে লেগেই আছে।
এমন ভক্ত পেলে কে না খুশি হয়! অশোকও সবার ভেতর থেকে বিনুদের বেছে বার করেছে। তাদের সঙ্গেই সে বেশি মেশে, বেশি গল্প করে, বেশি ঘোরে। মোট কথা, তাদের ওপরেই অশোকের বেশি অনুগ্রহ।
