খাওয়া দাওয়ার পর বিশ্রামের সুযোগ মিলল না। তার আগেই রাজদিয়ার এপাড়া ওপাড়া থেকে দলে দলে মানুষ আসতে লাগল। তারা স্নেহলতাকে হেঁকে ধরল। মেয়ে-জামাই দেখাও, নাতিনাতনী দেখাও।
স্নেহলতা সকলের সঙ্গে অবনীমোহনদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। তাদের কেউ প্রণাম করে, কেউ প্রণাম নিয়ে পানের রসে ঠোঁট টুকটুকে করে বিদায় নিল। যাবার আগে সবাই নিমন্ত্রণ করে গেল, তাদের বাড়ি অন্তত একদিন করে যেতেই হবে।
অবনীমোহন অভিভূত হয়ে গিয়েছিলেন। বললেন, শুধু আমাদের দেখবার জন্যে এত লোক এসেছে!
স্নেহলতা হাসলেন, হ্যাঁ। এখানে কারোর বাড়িতে লোকজন এলে রাজ্যের মানুষ ছুটে আসে। এক বাড়িতে উৎসব লাগলে সারা রাজদিয়ায় উৎসব লাগে। কোনও বাড়িতে কেউ মরলে টরলে সবার মন খারাপ হয়ে যায়।
চমৎকার জায়গা তো। অথচ কলকাতায়– বলতে বলতে হঠাৎ থেমে গেলেন অবনীমোহন। তুলনামূলকভাবে কলকাতা নামে এক উদাসীন, আত্মকেন্দ্রিক নগরীর কথা তার মনে পড়ে যাচ্ছিল।
স্নেহলতা মনে করিয়ে দিলেন, কলকাতার কথা কী বলেছিলে অবনী?
অবনীমোহনের দূরমনস্কতা কেটে গেল। বললেন, পাড়া দূরে থাক, এক বাড়িতে তিন ভাড়াটে থাকলে একজনের নাম আরেকজনের জানতে হয়তো বছর কেটে যায়।
বল কি অবনী!
স্নেহলতা বললেন, ওখানকার লোক থাকে কী করে! আমি হলে দম বন্ধ হয়ে মরে যেতাম। সেদিক থেকে রাজদিয়ায় আমরা বেশ আছি।
লোকজনের ভিড় কাটতে কাটতে বেলা পড়ে এসেছিল। আকাশে এখন মেঘ আছে, রোদও আছে–বেলাশেষের নরম সোনালি রোদ। খানিক আগে ঝিরঝির করে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে, এখন ছাটটা জোরাল নয়। কদমফুলের রেণুর মতো বাতাসে গুঁড়ো গুড়ো ইলশেগুঁড়ি উড়ছে।
অবনীমোহনেরা সেই পুবদুয়ারী ঘরটায় আবার আসর জমিয়ে বসেছেন। এ বাড়িতে কেউ চা খায় না, অথচ অবনীমোহনের দুবেলা চা না হলে পৃথিবী অন্ধকার। কাজেই কলকাতার এই চা চাতকদের জন্য খেয়ে উঠেই রাজদিয়ার বাজার থেকে চা নিয়ে এসেছে হিরণ।
পেয়ালায় ধূমায়িত সোনালি তরল সামনে সাজিয়ে গল্প হচ্ছিল। ওবেলা অবনীমোহন সুধা আর হিরণ ছিল শুধু। এ বেলা সুনীতি সুরমা বিনু ঝিনুক স্নেহলতা, এমনকি শিবানীও এসে যোগ দিয়েছেন।
এলোমেলো, অসংলগ্ন নানা কথার পর হিরণের প্রসঙ্গ এসে পড়ল।
অবনীমোহন শুধোলেন, তুমি কোন ইউনিভার্সিটিতে পড় হিরণ?
হিরণ বলল, ঢাকা।
তা হলে তো ঢাকাতেই থাকতে হয়।
আজ্ঞে হ্যাঁ, আমি হোস্টেলে থাকি।
পুজোর ছুটিতে বাড়ি এসেছ বুঝি?
আজ্ঞে হ্যাঁ। ছুটি শেষ হলেই ফিরে যাব। বলে, একটু থেমে হিরণ ফের শুরু করে, ছুটিছাটা পেলেই আমি বাড়ি চলে আসি। ঢাকা আর কতক্ষণের পথ, স্টিমারে ঘন্টা পাঁচেক লাগে।
অবনীমোহন বললেন, তোমার কোন ইয়ার যেন?
ফিফথ।
এম, এতে বি. এর মতো রেজাল্ট হবে তো?
উত্তর দিতে গিয়ে সুধার সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল। পরিপূর্ণ উজ্জ্বল দৃষ্টিতে সুধা তাকিয়ে আছে। এক মুহূর্ত। তাড়াতাড়ি অন্য দিকে চোখ ফিরিয়ে সলজ্জ সুরে হিরণ বলল, দেখি।
অবনীমোহন কী বলতে যাচ্ছিলেন, সেই সময়ে ঝুমঝুম বাজনার মতো শব্দ ভেসে এল, তার সঙ্গে ঘোড়র পায়ের খটখট আওয়াজ।
সবাই একসঙ্গে জানালার বাইরে তাকাল। বিনুরা দেখতে পেল, সেই চমৎকার ফিটনটা আবার ফিরে এসেছে। এটায় করেই তারা স্টিমারঘাট থেকে এখানে এসেছিল।
সোজা উঠোনের মাঝখানে এসে গাড়িটা থামল। স্নেহলতা উদগ্রীব হয়ে ছিলেন। বললেন, ভবতোষ মনে হচ্ছে–
ঠিক সেই সময় ফিটনের ভেতর থেকে যিনি নামলেন তাঁকে যুবকও বলা যায় না, আবার প্রৌঢ়ও না। দুইয়ের মাঝামাঝি তার বয়স থমকে আছে।
ঝিনুক হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, বাবা এসেছে, বাবা এসেছে– তারপর ঊর্ধ্বশ্বাসে উঠোনের দিকে ছুটল।
১.০৫ স্নেহলতা ঝিনুকের পিছু পিছু
স্নেহলতা ঝিনুকের পিছু পিছু বড় বড় পা ফেলে ফিটনটার কাছে চলে এলেন। বিনু সুধা হিরণ ছুটে এসেছে। শিবানীও এসেছেন। সুনীতি ফিটন পর্যন্ত আসে নি, ঘর থেকে বেরিয়ে উঠোনে নেমেই থেমে গেছে। অবনীমোহন এবং সুরমা ঘর থেকে বেরোন নি, দরজার কাছাকাছি এসে দ্বিধান্বিতের মতো দাঁড়িয়ে পড়েছেন। সবার দৃষ্টি আগন্তুকের দিকে।
বিনু একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল। এই তবে ঝিনুকের বাবা!
বয়স কত হবে ভবতোষের? চল্লিশোর্ধ্বে, তবে পঞ্চাশের অনেক নিচে। চুল অযত্নে আর অবহেলায় এলোমেলো, কত কাল যে চিরুনি পড়ে নি! সমস্ত মুখ সাদা-কালো অজস্র অঙ্কুরে ছেয়ে আছে। চোখের কোলে ঘন শ্যাওলার মতো কালচে দাগ, কালো মণির চারধারে যে শ্বেত জমি এখন সেখানে লাল রক্ত যেন জমাট বেঁধে আছে। দৃষ্টি উদ্ভ্রান্ত। হঠাৎ দেখলে মনে হয়, এই মাত্র শ্মশান থেকে ফিরলেন। তাঁকে ঘিরে দুর্বহ এক শোক রেখায়িত হয়ে রয়েছে।
ঘুম, বিশ্রাম, নিশ্চিন্ত জীবনযাত্রা–এসবের সঙ্গে বুঝিবা কয়েক যুগ সম্পর্ক নেই ভবতোষের। কেমন এক বিহ্বলতা তাঁকে ঘিরে আছে।
ঝিনুক ছুটে গিয়ে বাবার কোলে উঠেছিল। কলকল করে একসঙ্গে অনেক কথা বলে গেল সে। তার কতক বোঝা গেল, বেশির ভাগ দুর্বোধ্য। তবে বলার সুরে অভিমান আর রাগ যে জড়ানো, সেটুকু অনায়াসে টের পাওয়া গেল।
যেটুকু বোঝা গেছে তা এইরকম। ঝিনুক বলেছে, তুমি বললে মা’কে নিয়ে ডাক্তারের কাছে ঢাকায় যাচ্ছ। যাবে আর আসবে। এক মাস দুমাস হয়ে গেল, তুমি আর আসো না।
