মারোয়াড়ী, হিন্দুস্থানী, গুজরাটিরা জলের দরে বাড়ি বেচে দিচ্ছে। রেলের আশায় তারা কলকাতায় বসে থাকছে না। স্রেফ পা দু’খানার ওপর ভরসা করে গ্র্যাণ্ড ট্রাঙ্ক রোড ধরে পাড়ি জমাচ্ছে। বাঙ্গলিরা বেশির ভাগ যাচ্ছে গ্রামের দিকে। যাদের অনেক পয়সা তারা মধুপুর, গিরিডি, যশিডিতে গিয়ে টপাটপ বাড়ি কিনছে। প্রাণের মায়া বড় কঠিন মায়া।
ত্রৈলোক্য সেনরা আসার পর বর্মার খবর শুনবার জন্য রাজদিয়াবাসীরা তার কাছে ছুটত। বর্মা সম্বন্ধে উৎসাহ মলিন হয়ে গেছে। এখন কলকাতার খবর শুনতে এখানকার লোকজন নাহাপাড়া, আদালতপাড়া, দত্তপাড়ায় ছুটছে।
সব শুনে অবনীমোহন সুরমাকে বললেন, এখানে জমিজমা কিনে বুদ্ধিমানের কাজই করেছিলাম, কি বল?
সুরমা বলেন, ভাগ্যিস কিনেছিলে! নইলে এ সময়ে কোথায় যে যেতাম!
ঝিনুকও কলকাতা থেকে লোক পালানোর খবর শুনেছিল। এ সব কথা যখন হত, অসীম আগ্রহে। সে গিলতে থাকত।
একদিন সবার আড়ালে ঝিনুক বলল, আচ্ছা বিনুদা—
বিনু বলল, কী?
কলকাতা থেকে লোক তো পালাচ্ছে–
হ্যাঁ।
তা হলে ঝুমারাও এখানে চলে আসবে?
ঝুমাদের কথা অনেকদিন ভাবে নি বিনু। ঝিনুকের কথায় হঠাৎ চকিত হয়ে উঠল। তাই তো, কলকাতা থেকে সবাই চলে আসছে। ঝুমারা তো এখনও এল না!
.
২.২৯
কলকাতা থেকে তোক পালাবার হিড়িক শুরু হয়েছে। ফলে শুধু রাজদিয়াই নয়, আশেপাশে গ্রাম গঞ্জ জনপদ দ্রুত ভরে উঠছে। চারধারের গ্রামগুলোই কি শুধু? সারা জল-বাংলাই হয়তো মানুষে মানুষে ছেয়ে যাচ্ছে।
এতদিন রাজদিয়ার বাড়ি বাড়ি ঘুরে খবর আনছিলেন হেমনাথ। ইদানীং কিছুদিন ধরে আশেপাশের গ্রামগুলোতে যাচ্ছেন। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই বেরিয়ে যান। ফিরতে ফিরতে বিকেল কিংবা সন্ধে। ফিরে কোনও দিন বলেন, আজ দেবীপুরে গিয়েছিলাম। শুধু কলকাতারই লোক। কোনও দিন বলেন আজ গিয়েছিলাম বাজিতপুরে, সেখানেও এক অবস্থা। কোনও দিন বলেন, ভাগ্যিস যুদ্ধটা বেধেছিল আর জাপানি ব্যাটারা বার্মায় বোমা ফেলেছিল, তাই না ঘরের ছেলেরা ঘরে ফিরে এসেছে। যারা কখনও এখানে আসত না, এখানকার পাট চুকিয়ে কলকাতাবাসী হয়েছিল, যুদ্ধের কল্যাণে দেশের বাড়ির জন্যে তাদের প্রাণ কেঁদে উঠেছে।
জিনিসপত্রের দাম আগে থেকেই বাড়ছিল, কলকাতায় ইকুয়েশন শুরু হবার পর হু হু করে আরও চড়ছে। এখন সব জিনিসেরই সকালে এক দর, দুপুরে এক দর, সন্ধেয় আরেক দর। দরটা এখন কিভাবে কতগুণ চড়বে, আগে তার হদিসই পাওয়া যায় না। বাজার এখন বড় অস্থির।
তবু যত দামই বাড়ক, কলকাতার তুলনায় অনেক কম।
আজকাল হাটে গেলে মজার মজার অভিজ্ঞতা হয়। কলকাতার বাবুরা হঠাৎ এই শস্তাগন্ডার দেশে এসে একেবারে অবাক হয়ে গেছেন। যে জিনিস দেখেন তাই কিনে ফেলেন, দরদস্তুর কিছুই করেন না। যা দাম চাওয়া যায়, ঝনাৎ করে ফেলে দেন। আর কথায় কথায় বলেন, আম চিপ—
সেদিন অবনীমোহন আর হেমনাথের সঙ্গে সুজনগঞ্জের হাটে গিয়েছিল বিনু। সেখানে চমকপ্রদ একটা ব্যাপার ঘটল।
একজন মুসলমান ব্যাপারি ক’টা গাছপাকা পেঁপে নিয়ে বসে ছিল। সব চাইতে বড় ফল দু’টো বেছে অবনীমোহন বললেন, দাম কত?
ব্যাপারি বলল, একখান আধুলি লাগব বাবু।
জল-বাংলায় আসার পর প্রথম প্রথম দরদাম করতেন না অবনীমোহন। আজকাল এখানকার হালচাল বুঝে গেছেন। যে জিনিসের দাম চার পয়সা, ব্যাপারি হাঁকে দু’আনা। কজেই দর টর না করলে কি চলে!
অবনীমোহন বললেন, বল কি, ওই দুটো পেঁপের দাম আট আনা!
হ বাবু। সিকি আধলাও কমাইতে পারুম না।
ন্যায্য দাম বল, নিয়ে যাই।
চাউলের মণ বাইশ ট্যাকা, বাইগনের স্যার ছয় পহা, ঝিঙ্গার তিন পহা। দুইটা বড় পাউপার (পেঁপে) দাম আষ্ট আনা চাইয়া অলেহ্য (অন্যায়) কাম করি নাই।
শোন ব্যাপারি, তোমার কথাও থাক, আমার কথাও থাক, ছ’আনা দিচ্ছি। দিয়ে দাও।
ব্যাপারি এবার উত্তর দিল না। মুখ ঘুরিয়ে পাশের মরিচ-ব্যাপারির সঙ্গে গল্প জুড়ে দিল।
অবনীমোহন বললেন, কী হল, আমার কথাটা শুনতে পেলে না?
মুখ না ফিরিয়ে ব্যাপারি বলল, শুনছি।
আমি যা বললাম সেই দামে দেবে কি দেবে না, কিছু বললে না তো?
একটু চুপ করে থেকে ব্যাপারি বলল, আপনের কাম না বাবু—
অবনীমোহন অবাক, কী আমার কাজ নয়?
আমার পাউপা কিনন (কেনা)। আপনের কাছে তো আষ্ট গন্ডা পয়সা চাইছি। ড্যাঞ্চি বাবুরা (ড্যাম চিপ বাবুরা) আইলে এক ট্যাকা দিয়া লইয়া যাইব।
সত্যিই তাই। তাদের কথাবার্তার মধ্যে কলকাতার এক বাবু এসে ছোঁ মেরে পেঁপে দুটো কিনে নিল। দাম বাবদ একটি টাকা আদায় করে গেজেতে পুরতে পুরতে সগর্বে হাসল ব্যাপারি, দেখলেন
এ নিয়ে তর্কাতর্কি ঝগড়াঝাটি বানো যেত। অবনীমোহন কিছুই করলেন না। মুখ লাল করে মাছহাটার দিকে চলে এলেন।
সুজনগঞ্জে এসেই হেমনাথ ধানের আড়তগুলোর দিকে চলে গিয়েছিলেন। অবনীমোহন আর বিনু গিয়েছিল বাড়ির জন্য সওদা করতে।
মাছের বাজারে এসে প্রায় একই রকম অভিজ্ঞতা হল।
এক চেনাজানা মাছ-ব্যাপারি, নাম তার গয়জদ্দি নিকারি, এক কোণে দোকান সাজিয়ে বসেছিল। সুজনগঞ্জে প্রথম যেদিন এসেছিলেন, সেদিন থেকেই গয়জদ্দির কাছে মাছ কিনছেন অবনীমোহন। গয়জদ্দি তার বাঁধা ব্যাপারি।
গয়জদ্দি আজ ভাল ভাল, লোভনীয় মাছ এনেছে। তার সামনে দুটো বড় বড় বেতের চাঙাড়ি। চাঙাড়ির ঢাকনার ওপর পেট-লাল গরমা, কালবোস, কাজলি এবং কুলীন জাতের চকচকে পাবদা মাছ সাজানো।
