আরও কিছুদিন পর রাজদিয়াবাসীরা দেখল, মিলিটারি ব্যারাকের উলটো দিকে একটা মদের দোকান খোলা হয়েছে। দোকানটার মালিক আর কেউ না, স্বয়ং নিত্য দাস।
নিত্য দাস মদের দোকান খুলেছে, এই খবরটা এল দুপুরবেলা। শুনে তক্ষুনি হেমনাথ ছুটলেন। স্নেহলতা বারণ করলেন, এখন বেরুতে হবে না।
অবাক বিস্ময়ে হেমনাথ বললেন, বেরুব না, বল কী!
বেরিয়ে কী হবে? তার চাইতে দু’দন্ড বিশ্রাম কর।
তোমার কি মাথা টাথা খারাপ হল স্নেহ! মদের দোকান দিয়ে হারামজাদা সারা রাজদিয়াকে জাহান্নামে পাঠাবে, আর ঘরে বসে আমি বিশ্রাম করব!
ভয়ে ভয়ে স্নেহলতা বললেন, ওখানে গিয়ে তুমি কী করবে?
শান্ত অথচ কঠিন গলায় হেমনাথ বললেন, যাতে এখানকার সর্বনাশ না করতে পারে গোড়াতেই তার ব্যবস্থা করব।
কিন্তু—
কী?
এটা ওর ব্যবসা—
যে ব্যবসা মানুষের ক্ষতি করে তা চালাতে দেওয়া উচিত নয়। এ ব্যাপারে আমার কর্তব্য আছে।
হেমনাথকে আটকানো গেল না, দুপুরের সূর্য মাথায় নিয়ে তিনি বেরিয়ে পড়লেন।
বেশ কিছুক্ষণ পর হেমনাথ ফিরে এলেন। এখন আর তার দিকে তাকনো যাচ্ছে না। সমস্ত রক্ত বুঝি মুখে গিয়ে জমা হয়েছে। চোখ দুটো যেন ফেটেই পড়বে।
উদ্বিগ্ন মুখে স্নেহলতা শুধালেন, কী হয়েছে?
হেমনাথ উত্তর দিলেন না।
স্নেহলতা কাছে এগিয়ে এসে আগের স্বরেই আবার জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে, বলছ না কেন?
হেমনাথ এবার বললেন, নিত্য আমাকে অপমান করেছে। অসহ্য আবেগে তার ঠোঁট এবং কণ্ঠস্বর কাঁপতে লাগল।
অপমান!
তা ছাড়া কী? হেমনাথকে অত্যন্ত উত্তেজিত দেখাল, আমি নিত্যকে বললাম দোকান বন্ধ করে দে। কিছুতেই সে শুনল না।
বিনু-ঝিনুক-অবনীমোহন-সুরমা, হেমনাথকে ফিরতে দেখে সবাই ছুটে এসেছিল। কেউ কিছু বলল না। স্নেহলতাও এবার চুপ করে রইলেন।
হেমনাথ আবার বললেন, সারা জীবন মানুষের হিত ছাড়া অহিত চিন্তা করি নি। যাকে যা বলতাম সে তা-ই শুনত, সেইমতো চলত। কিন্তু এই শেষ বয়েসে নিত্য দাস আমার কথাটা রাখল না, আমাকে অমান্য করল। দুঃখে অভিমানে তাঁর গলা বুজে এল।
আবছা গলায় স্নেহলতা বললেন, তখনই তো তোমাকে বললাম, যেও না
উত্তর না দিয়ে হেমনাথ ঘরের ভেতর চলে গেলেন। তারপর দুই হাঁটুর ওপর মুখ রেখে আচ্ছন্নের মতো বসে থাকলেন।
বিনু দাঁড়িয়ে ছিল। আস্তে আস্তে একসময় এগিয়ে গিয়ে উঁকি দিল। কিছুক্ষণের মধ্যে হেমনাথ যেন একবারে ভেঙেচুরে গেছেন। তাকে ক্লান্ত, পরাভূত, মলিন দেখাচ্ছে।
দাদুর অবস্থা খানিকটা অনুমান করতে পারছিল বিনু। রাজদিয়াকে ঘিরে বিশ পঁচিশ মাইলের মধ্যে যত গ্রাম-গঞ্জ-জনপদ, সব কিছুর ওপর ঈশ্বরের মতো ব্যাপ্ত হয়ে আছেন হেমনাথ। তিনি আঙুল তুলে সামান্য একটু ইঙ্গিত করলে চারদিক থেকে হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসে। সবাই তাকে ভালবাসে, শ্রদ্ধা করে।
যে মানুষ এতকাল শুধু সম্মানই কুড়িয়েছেন, যাঁর প্রতিষ্ঠা ছিল সম্রাটের মতো, জল-বাংলার এই জায়গাটুকু জুড়ে সহস্র হৃদয়ে যার সিংহাসন পাতা, জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে সেই হেমনাথ আজ প্রচন্ড আঘাত পেয়েছেন। নিত্য দাস অবাধ্য হবে, হেমনাথের পক্ষে, তা ছিল অকল্পনীয়। এই একটি আঘাত তাকে একেবারে চুরমার করে দিয়েছে।
অবনীমোহনরা এখনও বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। স্নেহলতা হঠাৎ ফিসফিস গলায় বললেন, কী লক্ষ্মীছাড়া যুদ্ধ যে বাধল! মানুষকে একেবারে বদলে দিচ্ছে। ওই নিত্য দাস আগে আগে এ বাড়িতে পড়ে থাকত। একটা পয়সা ছিল না তার। তোমার মামাবাবু টাকা দিয়ে ব্যবসায় বসিয়ে দিলে। সেই থেকে তার উন্নতি। এখন তার আড়তে সবসময় দু’তিন শ’ মণ ধান মজুত থাকে, যখন তখন দশ বিশ হাজার টাকা বার করে দিতে পারে। যার জন্যে এত, তার কথাটাই রাখল না নিত্য দাস!
অবনীমোহন কিছু বললেন না, বিষণ্ণ মুখে তাকিয়ে থাকলেন।
.
২.২৮
দিনকয়েক পর সন্ধের সময় যথারীতি খবরের কাগজ পড়ার আসর বসেছে। ইচু মণ্ডল, হাচাই পালরা অন্ধকার নামতে না নামতেই এসে হাজিরা দিয়েছে।
অবনীমোহন পড়ছিলেন, রেঙ্গুনের পতন। মাত্র কয়েকদিন আগে সিঙ্গাপুর অধিকার করিবার পর জাপবাহিনী আজ রেঙ্গুন দখল করিয়াছে। মিত্র সৈন্যরা সাফল্যের সহিত পশ্চাদপসরণ করিতেছে।
জাপানী আক্রমণের আতঙ্কে কলিকাতা সন্ত্রস্ত। মহানগরী ত্যাগ করিয়া বহু লোকের নানা দিকে পলায়ন–
হঠাৎ পড়া থামিয়ে অবনীমোহন বললেন, কলকাতায় ইকুয়েশন শুরু হয়ে গেল মামাবাবু–
এর ভেতর সেদিনের সেই আঘাতটা অনেকখানি সামলে নিয়েছেন হেমনাথ। বললেন, তাই তো দেখছি। আমার মনে হয়, রাজদিয়ার লোক যারা কলকাতায় থাকে, তারাও চলে আসবে।
হেমনাথ যা অনুমান করেছেন তা-ই। দু’একদিনের ভেতর দেখা গেল স্টিমার বোঝাই হয়ে। রাজদিয়ার প্রবাসী সন্তানেরা জাপানি বোমার ভয়ে কলকাতা থেকে চলে আসছে। দেখতে দেখতে নাহাপাড়া, গুহপাড়া, দত্তপাড়া, আদালতপাড়া, কলেজপাড়ার ফাঁকা বাড়িগুলো ভরে গেল।
কলকাতা থেকে যারা এসেছে তাদের মুখে চমকপ্রদ সব খবর পাওয়া যাচ্ছে। জলোচ্ছ্বাসের দিশেহারা ঢলের মতো কলকাতার লোকেরা নাকি যে যেদিকে পারছে পালাচ্ছে। রেলওয়ে বুকিং অফিসগুলোতে দু’মাইল লম্বা কিউ’ পড়েছে, কিন্তু টিকিট মিলছে না। ন্যায্য দামের সঙ্গে দ্বিগুণ তিনগুণ ঘুষ দিয়েও না। হাওড়া আর শিয়ালদা স্টেশনে ঢুকবার উপায় নেই। একেক ট্রেনে দশটা ট্রেনের যাত্রী উঠছে। বেঞ্চির তলায় পা রাখবার জায়গা নেই। সেখানেও মানুষ। ল্যাট্রিন, পা-দানি, এমনকি ছাদের ওপর উঠেও মানুষ পালাচ্ছে। ছাদে যারা ওঠে তাদের মধ্যে কত লোক যে ওভারব্রিজে ধাক্কা খেয়ে মরছে, হিসেব নেই।
