সুরমা এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল। শিউরে উঠে বললেন, সুধা সুনীতির কলেজও তো ওদিকে। আমি ওদের আর পাঠাব না। কোন দিন কী বিপদ হয়ে যাবে–
হেমনাথ কী বলতে যাচ্ছিলেন, সেই সময় বাইরের উঠোন থেকে একটা গলা ভেসে এল, হ্যামকত্তা–
হেমনাথ সেদিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, কে রে?
আমি নিত্য–নিত্য দাস—
আয়-আয়–
একটু পর নিত্য দাস পুবের ঘরের দাওয়ার এসে উঠল। সুজনগঞ্জের হাটে আগেই তাকে দেখেছে বিনু। গলায় তিনকন্ঠি তুলসীর মালা, মুখে বসন্তর কালো কালো দাগ। পরনে খাটো ধুতি আর ফতুয়া। দেখতে দেখতে এ চেহারা মুখস্থ হয়ে গেছে বিনুর।
নিত্য দাস দাওয়ার এক ধারে মাটির ওপরেই বসে পড়ল।
হেমনাথ বললেন, তোদের খবরটবর কী?
নিত্য দাস বলল, আপনেগো আশীৰ্বাদে ভালাই।
বাড়ির সবাই কেমন আছে?
ভালা।
একটু ভেবে হেমনাথ এবার বললেন, তারপর এত সকালে কী মনে করে রে?
নিত্য দাস বলল, একখান কামে আইতে হইল। ভাবলাম, রাইজদায় যহন আইলাম, হ্যামকত্তা আর বৌঠাইনের চরণ দশন কইরা যাই।
হেমনাথ হাসতে হাসতে বললেন, তুই কাজের মানুষ। শুধু শুধু যে আসিস নি, বুঝতে পেরেছি। তা কাজটা কী?
এছ.ডি.ও সাহেবের বাংলায় একবার যাইতে হইব।
কেন রে?
ক্রাচিন (কেরোসিন), চিনি আর কাপড় কনটোল হইয়া যাইতে আছে।
হেমনাথ বিস্ময়ের গলায় বললেন, কনট্রোল!
হ–আস্তে আস্তে মাথা নাড়ল নিত্য দাস, তিনটা জিনিস বাইরে আর মিলব না। গরমেন্ট লাইছেন (লাইসেন্স) দিয়া কনটোলের দোকান খুলব। গরমেন্ট মাথাপিছু একটা হিসাব ঠিক কইরা দিব, তার বেশি চিনি টিনি পাওয়া যাইব না। এছ.ডি.ও সাহেবেরে ত্যাল দিয়া দেখি একখান লাইছেন পাই কিনা–
কনট্রোল যে হবে, এ খবর তুই কোথায় পেলি?
কয়দিন আগে ঢাকায় গেছিলাম। সেইখানেই শুইনা আইছি।
কবে নাগাদ কনট্রোল হবে, কিছু জানিস?
দিন তারিখ জানি না, তবে খুব তরাতরিই হইব।
হেমনাথ এবার আর কিছু বললেন না। তার কপালে দুশ্চিন্তার রেখাগুলি গভীরভাবে ফুটে উঠতে লাগল।
নিত্য দাস কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে চাপা গলায় বলল, এছ.ডি.ও সাহেবের কাছে তো যাইতে আছি। শুনছি তেনার জবর খাঁই।
চমকে হেমনাথ শুধোলেন, কিসের খাঁই?
ঘুষের। পরস্পর শুনলাম, বিনা ঘুষে লাইছেন বাইর করন যাইব না। হেহ লেইগা–
কী?
পাঁচ শ’ ট্যাকা আনছি। পাঁচ শ’তে হইব না হ্যামকত্তা?
কী করে বলি? আমি তো আর এস.ডি.ও সাহেবের অন্তর্যামী না।
আপনে কত কী দেখছেন, শুনছেন। কত কী জানেন। এট্টা আন্দাজ যদিন দিতেন–
সে কথার উত্তর না দিয়ে হেমনাথ বললেন, কী এমন লাভের কারবার যাতে পাঁচ শ’ টাকা ঘুষ দিতে চাইছিস?
রহস্যময় হেসে নিত্য দাস বলল, লাভ আছে বড়কত্তা, লাভ আছে। যদিন না হইব এই সকালবেলা সুজনগুঞ্জ থিকা লৌড়াইয়া আসুম ক্যান? এছ.ডি.ও’র বাংলায় গিয়া দেখুম আমার আগে আরও কয়জন বইসা আছে। একটু থেমে আবার বলল, আমাগো এইদিকে অহনও কনটোল। হয় নাই, কিন্তুক ইনামগুঞ্জে, রসুলপুরে হইয়া গ্যাছে। কনটোলের দোকান দিয়া একেক জন লাল হয়ে গ্যাল।
লাল কী করে হবে, বুঝতে পারছি না।
তার পথ আছে বড়কত্তা। আপনি তো আর ব্যবসায়ী না। হইলে বুঝতে পারতেন।
হেমনাথ বিমূঢ়ের মতো তাকিয়ে থাকেন।
নিত্য দাস আবার বলল, শুদা কাপড়-চিনি-ক্রাচিনের লাইছেন নিতেই আসি নাই বড়কত্তা। আরও একখান কামেও আইছি–
কী কাজ?
উই যেইখানে মিলিটারিগো থাকনের বাড়িঘর উঠছে, তার উলটা দিকে মদের দোকান খোলনের লাইছেন দিব গরমেন্ট
হেমনাথ চমকে উঠলেন, রাজদিয়াতে মদের দোকান ভোলা হবে।
হ।
তুই তার লাইসেন্স নিবি নাকি?
হেই রকমই ইচ্ছা—
হেমনাথ এবার প্রায় চিৎকার করে উঠলেন, না, কিছুতেই না।
হেমনাথ ধীর, স্থির, অচঞ্চল মানুষ। কোনও ব্যাপারে তাকে অসহিষ্ণু বা বিচলিত হতে দেখা যায় না। হঠাৎ তাকে এরকম চেঁচিয়ে উঠতে দেখে সবাই অবাক, কিছুটা বা চিন্তিত।
নিত্য দাস ভয় পেয়ে গিয়েছিল। কাঁপা গলায় বলল, আইজ্ঞা—
হেমনাথ বলতে লাগলেন, তুই না ধর্মকর্ম করিস! নারায়ণ সেবা না করে জল খাস না! তোর এত অধঃপতন হয়েছে! মদের দোকান খুলে এখানকার মানুষের সর্বনাশ করতে চাইছিস!
কিন্তুক—
কী?
এয়া তো ব্যবসা, ধম্মের লগে এয়ার সম্পক্ক কী?
সম্পর্ক নেই? থাকলেও আমি বুঝতে পারতে আছি না। হে ছাড়া–
আবার কী?
আমি যদিন মদের দোকানের লাইছেন না লই, আর কেউ নিয়া নিব—
যে খুশি নিক, তুই নিতে পারবি না, এই বলে দিলাম—
নিত্য দাস উত্তর নিল না। শীতল চোখে হেমনাথের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মুখ নামাল। একটু পর চলে গেল সে।
.
নিত্য দাস যা বলেছিল, তা-ই। দেখতে দেখতে খোলাবাজার থেকে চিনি কাপড় এবং কেরোসিন উধাও হয়ে গেল। সুজনগঞ্জের দোকানদারদের কাছে ধরনা দিলে জোরে জোরে দু’হাত নেড়ে তারা। শুধু বলে, নাই, নাই–
চিনি না হলে তবু চলে। কিন্তু কেরোসিন আর কাপড় ছাড়া সংসার অচল। রাজদিয়া, কেতুগঞ্জ, ইসলামপুর, ডাকাইতা পাড়া-সারা তল্লাটের লোক কাপড় কেরোসিনের জন্য দিগ্বিদিকে ছোটোছুটি করতে লাগল।
এই ডামাডোলের ভেতর একদিন দেখা গেল, রাজদিয়াতে কাপড়-কেরোসিন-চিনির জন্য তিনটে কনট্রোলের দোকান বসেছে। একটা কেতুগঞ্জের রায়েবালি শিকদারের, একটা ইসলামপুরের অখিল সাহার, আর তৃতীয়টি নিত্য দাসের।
একজন যাতে বার বার কেরোসিন না নিতে পারে সেজন্য পরিবার পিছু রেশন কার্ডও হল। রেশন কার্ড দেখালে তবেই ওই দুর্লভ বস্তুগুলো পাওয়া যায়।
